আসমা সাদিয়া
আসমা সাদিয়া

মামলায় অভিযোগ

দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার পরিকল্পনায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকাকে হত্যা

কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ দপ্তরে শিক্ষক আসমা সাদিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন তাঁর স্বামী। এতে ঘটনার সময় তাঁর অফিসকক্ষ থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার কর্মচারী ফজলুর রহমানকে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া আসমার সহকর্মী দুই শিক্ষক ও এক সহকারী রেজিস্ট্রারকেও আসামি করা হয়।

মামলায় আসামি ওই দুই শিক্ষক হলেন সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার ও হাবিবুর রহমান। শ্যাম সুন্দর আগে আসমা সাদিয়ার বিভাগের সভাপতি ছিলেন। অপর আসামি বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস উম্মুল মোমেনিন আয়েশা সিদ্দিকা হলের সহকারী রেজিস্ট্রার। কিছুদিন আগে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে তাঁকে সেখানে বদলি করা হয়।

বুধবার দিবাগত রাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় ওই মামলা করেন আসমার স্বামী মুহা. ইমতিয়াজ সুলতান। এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, ওই দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও নির্দেশে কর্মচারী খন্দকার ফজলুর রহমান আসমা সাদিয়াকে হত্যা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদেরও আসামি করা রয়েছে। তবে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।

মামলার বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন কুষ্টিয়া পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) ফয়সাল মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘মামলায় চারজন আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আসামিদের ধরতে ও আইনি পদক্ষেপ নিতে পুলিশ কাজ করছে।’

গত বুধবার বিকেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ দপ্তরে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা (৩৫) নিহত হন। একই সময় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমানকে ওই কক্ষ থেকে (৩৫) গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তাঁকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্চা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার আসমার লাশ কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

মামলায় যা উল্লেখ করেছেন বাদী

২০১৮ সালে ফজলুর রহমান সমাজকল্যাণ বিভাগের বিভাগীয় তহবিল থেকে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পান। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আসমা সাদিয়া বিভাগের সভাপতি হন। আগের সভাপতি শ্যাম সুন্দর তাঁর সময়ের বিভাগের আয়-ব্যয়ের হিসাব আসমাকে বুঝিয়ে দেননি। সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার আসমা সাদিয়াকে বলেন, তাঁরা যেভাবে বলবেন এবং কাগজ সামনে ধরবেন, সেখানে তাঁকে শুধু স্বাক্ষর করতে হবে। সে সময় আসমা বিভাগের টাকা স্বচ্ছতার ভিত্তিতে খরচ ও অপব্যবহার করা যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তখন থেকেই আসমার সঙ্গে বিশ্বজিৎ ও শ্যাম সুন্দরের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফজলুসহ তিনজন মিলে বিভাগের অর্থ আত্মসাৎ ও অপব্যবহার করতেন। আসমাকে বিভিন্ন সময়ে ফজলুর অসহযোগিতা ও হেনস্তা করতে থাকে। এরপর শিক্ষক হাবিবুর রহমানের সামনে আসমাকে ফজলুর অপমানজনক শব্দ ও অশালীন আচরণ করেন; কিন্তু হাবিবুর কোনো প্রতিবাদ করেননি।

মামলায় আরও বলা হয়, এসব ঘটনা সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন রোকসানা মিলিকে বিষয়টি মৌখিকভাবে অবহিত করেন আসমা। এ নিয়ে ডিনের নির্দেশে বিভাগে সভাও হয়েছিল। একপর্যায়ে কয়েক মাস আগে ডিনের নির্দেশে বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও বিভাগীয় সভাপতিকে অসহযোগিতা করায় ফজলুরকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিক্ষক হাবিবুর। তিনি ফজলুরকে পুনরায় সমাজ্যকল্যাণ বিভাগে আনতে আসমাকে চ্যালেঞ্জ ছোড়েন। অন্যদিকে বিভাগের অর্থ তছরুপের ঘটনায় বিশ্বজিৎকে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বদলি করা হয়। এর পর থেকে আসমাকে সবাই মিলে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকেন। দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার সরাসরি প্ররোচনায় এবং নির্দেশনায় ফজলুর ধারালো ছুরি নিয়ে আসমার অফিসকক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেন এবং হত্যা করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব ঘটনা প্রায়ই স্বামীকে সাদিয়া জানাতেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গের সামনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিহত শিক্ষক আসমা সাদিয়ার স্বজনেরা

লিখতে পারছেন ফজলুর

বুধবার দিবাগত গভীর রাতে ফজলুর রহমান সাড়া দেন। পুলিশ ও হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁকে ডাকলে সাড়া দিচ্ছেন। চোখ মেলে তাকাচ্ছেন। কিছু জানতে চাইলে কলম দিয়ে লিখতে পারছেন। রাতেই পুলিশের কর্মকর্তারা দুই পাতার লিখিত বক্তব্য নিয়ে গেছেন। লিখিত বক্তব্যে ফজলুর জানিয়েছেন, বিভাগীয় প্রধান (সাদিয়া) তাঁকে (ফজলুর) বদলি করায় এবং বেতন বন্ধ করে দেওয়ায় তাঁর মনে ক্ষোভ তৈরি হয়। জীবন নিয়ে হতাশায় ভুগতে থাকেন। দীর্ঘ আট–নয় বছর যে বিভাগে থেকেছেন, সেখান থেকে তাঁকে বদলি করা এবং বেতন না দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ মনে দেখা দেয়। এ থেকেই ফজলুর হত্যার পরিকল্পনা করেন।

যা বলছেন অভিযুক্ত দুই শিক্ষক

সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এক সহকর্মী মারা গেছেন, এটা নিয়ে আমরা খুবই শোকাহত। তাঁর সঙ্গে আমাদের এমন কোনো খারাপ সম্পর্ক ছিল না যে আমরা হত্যার নির্দেশদাতা। বিষয়টি তদন্তাধীন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু ক্লিয়ার হয়ে যাবে। একজন মানুষ স্বজনহারা হয়েছেন। আমরা তো শিক্ষক, কখনো মানুষকে হত্যা করতে পারি?’
আসমা সাদিয়ার জানাজায় শিক্ষক হাবিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি একজন মানুষ হিসেবে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। যদি আমি নিজেও এর সঙ্গে জড়িত থাকি, তাহলে আমি নিজেরও শাস্তি চাই।’ আসমা সাদিয়াকে উদ্ধারের পর বুধবার রাতে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে গিয়েছিলেন হাবিবুর। সেখানে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে তিনি ওই দুজনকে উদ্ধারের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছিলেন।

ময়নাতদন্তে যা পাওয়া গেল

ময়নাতদন্তে আসমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো বস্তুর ২০টির বেশি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্ত করেন কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমাম। সঙ্গে ছিলেন চিকিৎসা কর্মকর্তা রুমন রহমান ও সুমাইয়া জান্নাত।

আরএমও হোসেন ইমাম প্রথম আলোকে বলেন, নিহত শিক্ষকের গলার নিচে সজোরে আঘাত করা হয়েছে। এতে গভীর ক্ষত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বুক, পেট, হাত–পাসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২০টি আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। তাতে মনে হয়েছে, ঘটনার সময় ধস্তাধস্তি হয়েছে। বাঁচার জন্য শিক্ষক হাত দিয়ে ঠেকাতে গেছেন, এতে হাতেও আঘাত লেগেছে।

ঈদগাহ মাঠে জানাজা

বৃহস্পতিবার জোহরের নামাজের পর কুষ্টিয়া ঈদগাহ মাঠে আসমার জানাজা হয়। সেখানে কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ, সহ–উপাচার্য ইয়াকুব আলীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

জানাজা শুরুর আগে আসমার স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান বলেন, ‘আমার স্ত্রী ছয় দিনের বাচ্চা রেখে সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এর পর গত দেড় বছরে এক দিনের জন্যও দায়িত্বে অবহেলা করেননি। তাঁকে ক্ষমা করে দেবেন।’

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসমা সাদিয়াকে হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আজ বৃহস্পতিবার সকালে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

শিক্ষক আসমাকে হত্যার বিচারের দাবিতে বৃহস্পতিবার সকালে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনকারীরা ৯ দফা দাবি জানান। দাবিগুলো হলো হত্যাকারীর ফাঁসি জনসমক্ষে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করা, হত্যার নেপথ্যের কেউ থাকলে জবাবদিহিতে এনে তাঁর বিচার নিশ্চিত করা, ক্যাম্পাস, হল ও ডিপার্টমেন্টে সিসি ক্যামেরা নিশ্চিত করা এবং তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষণ, স্মার্ট আইডি কার্ড ছাড়া কাউকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে না দেওয়া, দৈনিক মজুরিভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের নামসংবলিত আলাদা পোশাকের ব্যবস্থা করা এবং তাঁদের বেতন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে দেওয়ার ব্যবস্থা করা; বিভাগীয় আয়–ব্যয়ের হিসাব পরিষ্কার রাখা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসা এবং ক্যাম্পাসে বহিরাগত ব্যক্তিদের ঢোকা নিষিদ্ধ করা।