কুড়িগ্রামে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে রাশিয়ার বাইকুনুর জাতের আঙুর চাষে সফল হয়েছেন দুই কৃষি উদ্যোক্তা। দুই বিঘা জমির বাগান থেকে এ বছর প্রায় ১ হাজার ৮০০ কেজি আঙুর উৎপাদনের আশা করছেন তাঁরা। খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৯ লাখ টাকা লাভ হতে পারে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
ফুলবাড়ী উপজেলার গঙ্গারহাট বাজারসংলগ্ন আজোয়াটারী গ্রামে এই আঙুরবাগান গড়ে তুলেছেন উদ্যোক্তা হাসেম আলী ও তাঁর ভাগনে রুহুল আমীন। বাগানে রয়েছে ৪৬০টি বাইকুনুর জাতের আঙুরগাছ। রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে সংগ্রহ করা চারা দিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন স্থানীয় কৃষকদের কাছেও আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
উদ্যোক্তারা জানান, ২০১৭ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ৫০টি চারা রোপণ করেন তাঁরা। শুরুতে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করলেও আট মাসের মাথায় গাছে ফল আসতে শুরু করে। পরে ধাপে ধাপে বাগান সম্প্রসারণ করা হয়। ২০২২ সালে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ২০০ কেজি আঙুর বিক্রি করেন তাঁরা। পরের বছর উৎপাদন বেড়ে হয় ৪০০ কেজি। ২০২৪ সালে ৬০০ কেজি এবং গত বছর ৮০০ কেজি আঙুর সংগ্রহ করা হয়। চলতি মৌসুমে নতুন আরও ১০টি গাছসহ বর্তমানে ৬০টি গাছে ফল ধরেছে।
বর্তমানে বাগানে জুপিটার, কার্নিভ্যাল, হেলিওডর, শাইন মাসকাট, ব্ল্যাক রুবি, ফ্লেম সিডলেস ও লাম্বোরগিনিসহ প্রায় ২০টি জাতের আঙুরের চারা রয়েছে। উদ্যোক্তারা জানান, প্রতিটি চারা ৩০০ টাকা থেকে কয়েক হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
উদ্যোক্তা হাসেম আলী বলেন, ইউক্রেনে থাকা এক বন্ধুর কাছ থেকে প্রথম আঙুর চাষের ধারণা পান তিনি। পরে ভাগনে রুহুল আমীনের সঙ্গে আলোচনা করে যৌথভাবে বাগান গড়ে তোলেন। তিনি বলেন, ‘অনেক বাধা ছিল। কিন্তু এখন সফলতা পেয়ে ভালো লাগছে। এ বছর খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৯ লাখ টাকা লাভ হবে বলে আশা করছি।’
রুহুল আমীন বলেন, দুই বিঘা জমিতে বাগান গড়ে তুলতে এখন পর্যন্ত ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে। তবে চারা ও ফল বিক্রির মাধ্যমে ইতিমধ্যে সেই খরচ উঠে এসেছে।
রংপুর থেকে আঙুরবাগান দেখতে আসা কৃষি উদ্যোক্তা হারুন অর রশিদ ও তাঁর স্ত্রী বলেন, ফেসবুক ও ইউটিউবে আঙুরবাগানের ভিডিও দেখে এখানে এসেছেন। কয়েকটি আঙুর খেয়ে তাঁদের বিদেশি আঙুরের মতোই স্বাদ লেগেছে। তাঁরা বাড়ির জন্য এক কেজি আঙুর কিনেছেন এবং ছাদবাগানে আঙুর চাষ শুরু করার ইচ্ছার কথা জানান।
স্থানীয় কৃষক আবদুস সামাদ বলেন, কুড়িগ্রামের মাটিতে আঙুর চাষ হবে—এটি প্রথমে বিশ্বাস করেননি। পরে মামা-ভাগনের বাগানের সফলতা দেখে এবার ২০টি চারা কিনে নিজেও আঙুর চাষ শুরু করেছেন।
কৃষিবিদেরা বলছেন, আঙুর চাষে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা এড়াতে উঁচু বেড তৈরি এবং সঠিক পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পর্যাপ্ত রোদ ও বাতাস চলাচলের সুযোগ রেখে চাষ করতে হবে। পাশাপাশি উপযোগী জাত নির্বাচন, পানি সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, জৈব সার ব্যবহার ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।
ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াছমিন বলেন, বেলে-দোআঁশ মাটিতে বাইকুনুর জাতের আঙুর চাষ করে হাসেম আলী ও রুহুল আমীন উপজেলার কৃষকদের মধ্যে নতুন ধারণার জন্ম দিয়েছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে রোগ দমন ও ভালো ফলনের জন্য প্রযুক্তিগত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিতে নতুন ফসল ও বহুমুখীকরণের প্রয়োজন বাড়ছে। কুড়িগ্রামে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে আঙুরের মতো উচ্চমূল্যের ফল চাষ হচ্ছে। তবে আবহাওয়া ও জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে তারপর এই চাষে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।