গ্যালারিতে তিলধারণের জায়গা নেই। মাঠের চারপাশে দাঁড়িয়ে আছেন শত শত মানুষ। গোলের সুযোগ তৈরি হলেই একসঙ্গে উঠে আসে হাজারো কণ্ঠের চিৎকার, আর বল গোলপোস্টের দিকে যেতেই উল্লাসে কেঁপে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। কেউ বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে, কেউ গ্যালারির রেলিং ধরে, আবার কেউ উঁচু জায়গায় উঠে খেলা দেখছেন।
বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জামালপুর স্টেডিয়াম যেন পরিণত হয় মানুষের আবেগের এক বিশাল মিলনমেলায়। জামালপুর জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল দেখতে আসা দর্শকদের এ ঢল আর উন্মাদনাই বলে দিচ্ছিল—ফুটবল এখনো বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের আবেগের জায়গা।
আজ রোববার দুপুর থেকেই জামালপুরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। বিকেলের দিকে বৃষ্টির তীব্রতা কমতেই ফুটবলপ্রেমীদের ঢল নামতে শুরু করে বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আবদুল হাকিম স্টেডিয়ামে। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দুপুরের পর থেকেই দলে দলে মানুষ আসতে থাকেন ফাইনাল খেলা দেখতে। খেলা শুরু হওয়ার অনেক আগেই ১৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। গ্যালারিতে আর জায়গা না পেয়ে অসংখ্য দর্শক মাঠের ভেতরে ঢুকে দাঁড়িয়ে খেলা দেখেন। ফুটবল খেলা দেখতে মানুষের এই উপচে পড়া ভিড় যেন বলে দিচ্ছিল—জামালপুরে ফুটবল এখনো মানুষের আবেগেরই আরেক নাম।
বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ফাইনাল খেলা শুরু হয় জেলার মেলান্দহ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার মধ্যে। এ ম্যাচে নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ায়, তখন ফুটবল ম্যাচের উত্তেজনা এবং নাটকীয়তা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। আর টাইব্রেকারে বল যখন জালে জড়াচ্ছিল, উল্লাসে কেঁপে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। টাইব্রেকারে এই খেলায় সরিষাবাড়ী উপজেলা ৪-৩ গোলে বিজয়ী হয়েছে।
মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর এলাকা থেকে খেলা দেখতে এসেছিলেন তরুণ মুহাম্মদ বাকী বিল্লাহ। দুই দলের খেলা ও দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় দেখে মুগ্ধ হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দুই দলের খেলাই আমাকে মুগ্ধ করেছে। তবে এর চেয়েও বেশি অভিভূত হয়েছি দর্শকদের দেখে। জামালপুরের কোনো মাঠে এর আগে এত মানুষ একসঙ্গে খেলা দেখতে এসেছেন বলে আমার মনে পড়ে না। আজ আবার মনে করিয়ে দিল—ফুটবল মানুষের কতটা প্রিয় খেলা।’
জামালপুর পৌর শহরের মুকুন্দবাড়ী এলাকার বাসিন্দা রাজু আহাম্মেদ বলেন, ‘আজ স্টেডিয়ামে এসে মনে হলো, জামালপুরে ফুটবলের সেই পুরোনো আবেগ এখনো হারিয়ে যায়নি। এত মানুষ শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ দেখতে এসেছেন—এটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। গোলের সুযোগ হলেই চারপাশ থেকে যে চিৎকার উঠছিল, মনে হচ্ছিল পুরো স্টেডিয়াম একসঙ্গে খেলাটার সঙ্গে মিশে গেছে। এমন দৃশ্য সত্যিই অনেক দিন পর দেখলাম।’
জামালপুর শহরের বানিয়া বাজার এলাকার বাসিন্দা তুহিন মিয়া বলেন, ‘আজকের ম্যাচে একমুহূর্তের জন্যও চোখ সরানোর উপায় ছিল না। দুই দলই একের পর এক আক্রমণ করেছে। গোলের সুযোগ তৈরি হলেই গ্যালারিতে হাজারো মানুষ একসঙ্গে উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন। মনে হচ্ছিল, মাঠের ২২ জন খেলোয়াড়ের সঙ্গে গ্যালারির হাজারো মানুষও যেন খেলাটার অংশ হয়ে গেছেন।’
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক এ কে এম আবদুল্লাহ-বিন-রশিদ বলেন, প্রায় ৫০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই খেলার মধ্য দিয়ে জামালপুর জেলার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
জামালপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুপ আলী বলেন, ‘শুধু একটি ফুটবল ম্যাচকে ঘিরে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও আশাব্যঞ্জক। এটি জামালপুরের ক্রীড়াঙ্গনের নতুন করে জেগে ওঠারও একটি শক্তিশালী বার্তা।’
জেলা প্রশাসন, জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে ২৩ আগস্ট থেকে জামালপুর স্টেডিয়ামে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হয়। এতে জামালপুর সদর উপজেলা, জামালপুর পৌরসভা, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা, বকশীগঞ্জ উপজেলা, ইসলামপুর উপজেলা, মেলান্দহ উপজেলা, মাদারগঞ্জ উপজেলা ও সরিষাবাড়ী উপজেলা অংশ নেয়। আজ ফাইনাল ম্যাচ ছিল।
পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী, জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান, জামালপুর-৪ (সরিষাবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য ফরিদুল কবির তালুকদার ও জামালপুর-২ (ইসলামপুর) আসনের সংসদ সদস্য সুলতান মাহমুদ।
চুয়াডাঙ্গায় পৌরসভা একাদশ জয়ী
চুয়াডাঙ্গায় শুরু হয়েছে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৬। আজ বিকেলে চুয়াডাঙ্গা পুরাতন স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
খেলার নির্ধারিত সময়ে দুই সহোদর শাকিল ও মহিবুলের দেওয়া জোড়া গোলের সুবাদে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা একাদশ দর্শনা পৌরসভা একাদশকে ২-০ গোলে হারিয়ে শুভ সূচনা করে। এদিন চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা দলের শাকিলকে ম্যান অব দ্য ম্যাচ ঘোষণা করা হয়। আগামীকাল সোমবার বিকেলে একই মাঠে মুখোমুখি হবে আলমডাঙ্গা উপজেলা ও জীবননগর উপজেলা একাদশ।
বিকেল চারটায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন, বেলুন উড্ডয়ন ও কবুতর অবমুক্তকরণের মধ্য দিয়ে টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করা হয়। পরে শাহ আলমের লেখা ও সুরে এবং হাসিবুল ইসলাম ও জান্নাতুল ফেরদৌস নেরিপার কণ্ঠে গাওয়া থিম সংয়ের সঙ্গে নৃত্যশিল্পীদের মনোমুগ্ধকর নৃত্য ও ডিসপ্লে দর্শকদের হৃদয়ে জয় করে। নৃত্য পরিচালনা করেন জাহিদ হাসান ও সৌম্যজিতা শ্রুতি।
খেলাধুলার মাধ্যমে তরুণদের মাঠমুখী করা এবং মাদক, বাল্যবিবাহ ও উত্ত্যক্তের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির বার্তাও উঠে আসে এই আয়োজনে। আর মাঠে দর্শকদের উচ্ছ্বাস বলছে, চুয়াডাঙ্গায় ফুটবলের সেই পুরোনো উন্মাদনা এখনো অটুট।
জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নেওয়াজ হালিমা আরলি, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবির খান, সিভিল সার্জন হাদী মো. জিয়াউদ্দিন ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. শরিফুজ্জামান। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তিথি মিত্রের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বি এম তারিক উজ জামান।
জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এই টুর্নামেন্টে জেলার চারটি উপজেলা ও চারটি পৌরসভার দল অংশ নিচ্ছে। আয়োজকদের আশা, টুর্নামেন্টের মাধ্যমে জেলার ক্রীড়াঙ্গনে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে এবং তরুণদের মধ্যে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়বে।