
ঠাকুরগাঁও–১ (সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী) আসনের উপনির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ফুলের তোড়া হাতে পরাজিত প্রার্থীর বাড়ি গেলেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন। আজ শুক্রবার দুপুরে ঠাকুরগাঁওয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের বাড়ি গিয়ে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান মির্জা ফয়সল আমীন। এ সময় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কোলাকুলি করেন, পরস্পরকে মিষ্টিমুখ করান এবং এলাকার উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। রাত পৌনে ১০টার দিকে ফলাফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম। এতে ২ লাখ ২৭ হাজার ৯১৭ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন পান ৯৬ হাজার ৫১৩ ভোট।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার আগেই অনিয়ম, জাল ভোট ও পোলিং এজেন্টদের মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয় জামায়াতে ইসলামী। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ দুপুর পৌনে ১২টার দিকে দেলাওয়ার হোসেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে তাঁর হাজীপাড়ার বাসায় যান মির্জা ফয়সল আমীন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মামুন উর রশিদ, পৌর বিএনপির সহসভাপতি আতাউরসহ দলীয় নেতা–কর্মীরা।
জামায়াতে ইসলামীর ওই প্রার্থীর বাড়ি পৌঁছানোর পর উভয়ই কোলাকুলি করেন। মির্জা ফয়সলকে অভিনন্দন জানিয়ে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, ‘বেস্ট অব লাক (শুভকামনা)।’ এরপর দুজনের মধ্যে এলাকার উন্নয়ন ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে কথা হয়।
অন্যদিকে দেলাওয়ার হোসেনের উদ্দেশে মির্জা ফয়সল আমীন বলেন, ‘আমরা একে অপরকে সম্মান দিয়ে আগামী দিনের কাজগুলো এগিয়ে নেব। কারণ, তুমিও জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমাদের দুজনেরই নির্বাচনের সময় জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আছে। তুমি আমার কাজে সাহায্য করবে, আমিও তোমার সহযোগিতা চাই। আমার ছায়া হয়ে তুমি থাকবে।’ জবাবে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, ‘অবশ্যই। ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নে সব সময় আমি আপনার পাশে থাকব।’
একপর্যায়ে মির্জা ফয়সল আমীন বলেন, ‘আমি যদি কোনো ভুল করি, তুমি সরাসরি আমাকে জানাবে।’ নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীরও জয়ী প্রার্থীর সঙ্গে মিলেমিশে এলাকার উন্নয়নে কাজ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। এ সময় দেলাওয়ার হোসেনের হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেন মির্জা ফয়সল আমীন। পরে তাঁরা পরস্পরকে মিষ্টিমুখ করান।
সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের মির্জা ফয়সল আমীন বলেন, ‘গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত হলো পরমতসহিষ্ণুতা। আমরা যদি সব সময় ঝগড়া করি, তাহলে তো হবে না।
আমি জয়ী প্রার্থীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। এলাকার উন্নয়নে তাঁর সঙ্গে থাকার প্রস্তাব নিয়ে তিনি আমার বাড়ি এসেছেন, এতে আমি গর্বিত। তিনি আমার ও দলের নেতা–কর্মীদের খোঁজখবর নিয়েছেন।দেলাওয়ার হোসেন, ঠাকুরগাঁও–১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী
ঠাকুরগাঁওয়ের স্বার্থে তিনি আমাকে সহযোগিতা করবেন বলে আশা করি। তাঁর কাছে সহযোগিতা চাইতেই আমি এসেছি। আমরা একসঙ্গে কাজ করব, এটাই আমার প্রস্তাব।’
দেলাওয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি জয়ী প্রার্থীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। এলাকার উন্নয়নে তাঁর সঙ্গে থাকার প্রস্তাব নিয়ে তিনি আমার বাড়ি এসেছেন, এতে আমি গর্বিত। তিনি আমার ও দলের নেতা–কর্মীদের খোঁজখবর নিয়েছেন।’
জামায়াতে ইসলামীর এই পরাজিত প্রার্থী বলেন, ‘আমাদের এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি অব্যাহত থাকবে বলে মনে করি। এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠা উচিত, যেখানে নির্বাচন থাকবে, দল থাকবে। কিন্তু পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কও বজায় থাকবে।’
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁরা পরস্পরের বিরোধী হলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কে সেই বিরোধ জিইয়ে রাখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চান। সে কারণেই জামায়াতের প্রার্থীর বাড়িতে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে গিয়েছিলেন।মির্জা ফয়সল আমীন, বিএনপির প্রার্থী
দেলাওয়ার হোসেনের বাড়ি থেকে ফিরে মির্জা ফয়সল আমীন প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁরা পরস্পরের বিরোধী হলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কে সেই বিরোধ জিইয়ে রাখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চান। সে কারণেই জামায়াতের প্রার্থীর বাড়িতে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে গিয়েছিলেন।
বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় ভোটার ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ঠাকুরগাঁও জেলা সভাপতি আবদুল লতিফ বলেন, ‘সহিংসতার রাজনীতি পেছনে ফেলে আমরা ঠাকুরগাঁওয়ে নতুন ধারার রাজনীতি শুরু করতে চাই। রাজনৈতিক ভেদাভেদ দলীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমিত রেখে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার রাজনীতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।’