রাজশাহীর একমাত্র নারী প্রার্থী হাইকোর্টে রিট করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে এখন প্রচারণা চালাচ্ছেন একাই। রোববার বিকেলে রাজশাহী নগরের কাশিয়াডাঙ্গা এলাকায়
রাজশাহীর একমাত্র নারী প্রার্থী হাইকোর্টে রিট করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে এখন প্রচারণা চালাচ্ছেন একাই। রোববার বিকেলে রাজশাহী নগরের কাশিয়াডাঙ্গা এলাকায়

রাজশাহীর একমাত্র নারী প্রার্থীর একাকী লড়াই

অটোরিকশার হুড থেকে ঝালর খসে পড়ছে। দেখে মনে হচ্ছে ভাঙা ঘরের চালা। তার ভেতর থেকে একজন নারী করুণ দৃষ্টিতে বাইরে চেয়ে আছেন। পথচারী দেখলে তাঁর হাতে ফুটবল প্রতীকের একটি প্রচারপত্র দিয়ে ভোট চাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে আর কেউ নেই।

এই প্রার্থীর নাম মোছা. হাবিবা বেগম। তিনি রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহীর একমাত্র নারী প্রার্থী তিনি। রোববার বেলা দুইটার পরে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় জেলার পবা উপজেলার কাশিয়াডাঙ্গা পশ্চিমপাড়ার ফেততার মোড়ে।

হাবিবা এর আগে মোহনপুর উপজেলার ঘাসিগ্রাম ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী আসনে ও উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁকে অপসারণ করা হয়। তখনই তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচন করবেন। তিনি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত হওয়ার পর উপজেলার কেশরহাট পৌর এলাকায় একটি চায়ের দোকান করেছিলেন। পরে তাঁর স্বামী সেই দোকান চালাতেন। সেটাই ছিল তাঁদের আয়ের একমাত্র উৎস। তাঁর অভিযোগ, চাঁদা না দেওয়ায় গত বছর কোরবানির ঈদের এক মাস পর তাঁর সেই দোকান ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

মোছা. হাবিবা বেগম জানান, লড়াই করে ছয় দিন পরে প্রতীক পেয়েছেন। তাই প্রচারে পিছিয়ে পড়েছেন। প্রচারে একটু গতি বাড়ানোর জন্য রোববার সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন, যাতে দ্রুত ভোটারদের কাছে যেতে পারেন। মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন তাঁর স্বামী মাসুদ রানা ওরফে হেলাল। মাথায় হেলমেট ছিল না। ভ্রাম্যমাণ আদালত বাইক আটকে দেন। গাড়ি ছাড়াতে সেখান থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে রাজশাহীর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আসেন, ট্রাফিক পুলিশের কার্যালয়ে যান। তবু তিনি গাড়ি ছাড়াতে পারেননি। অবশেষে একটি অটোরিকশা নিয়েই বেলা দুইটার পর থেকে একাই প্রচার শুরু করেছেন।

দেখা হতেই এক নিঃশ্বাসেই সব সমস্যার কথা শুনিয়ে হাবিবা বেগম বললেন, ‘দেখেন ভাইয়া, একা একা আর কত লড়াই করব? ছয় দিন পরে হাইকোর্ট থেকে প্রতীক পেলেও আজ আর মোটরসাইকেলটা ছাড়াতে পারলাম না। বাইকটা হলে প্রচারে একটু গতি বাড়ত। অন্য প্রার্থীর লোকজন ঠিকই খুশিমতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেই সমস্যা। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোট করাই কঠিন। স্বতন্ত্র গন্ধ পেয়েই গাড়িটা আটকে দিল।’

কাশিয়াডাঙ্গায় কথা হয় আকরাম আলী নামের একজন ঠিকাদারের সঙ্গে। হাবিবার নাম শুনেছেন কি না জানতে চাইলে আকরাম আলী বললেন, তাঁর সম্পর্কে জানেন। তাঁরা ফুটবলের ভোট নিজের খরচেই করবেন। প্রচারটা আরেকটু আগে থেকে হলে আরও ভালো হতো। সেখানেই পাওয়া গেল আরেক ব্যবসায়ী রজব আলীকে। তিনিও একই কথা বললেন। তাঁরা ফুটবলের ভোট করছেন।

উপজেলার দামকুড়া বাজারে গিয়ে দেখা গেল, অটোরিকশায় মাইকে হাবিবার রেকর্ড করা প্রচার চলছে, আর হাবিবা বাজারের মধ্যে গিয়ে মানুষের হাতে প্রচারপত্র তুলে দিচ্ছেন। সেখানেও তাঁর সঙ্গে কেউ নেই। দেখা গেল, তিনি নারী ভোটারদের একটু সময় নিয়ে বোঝাচ্ছেন। একজন নারী বলছেন, তিনি এখানকার ভোটার নন, তাঁর বাড়ি হরিপুর ইউনিয়নে। তিনি সেখানে ভোট দেবেন। ওই ইউনিয়নও যে রাজশাহী-৩ আসনের মধ্যে, সেটা বোঝাতে হাবিবাকে অনেকটা বেগ পেতে হলো। একটা ভ্যানের নারী যাত্রীদের বোঝাতে গিয়েও তাঁকে সময় দিতে হলো। তবে ভ্যানের চালক ‘আমি আপনাকে আগেও দেখেছি’ বলে হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে তাঁর প্রচারপত্র নিলেন।

হাবিবার রিকশাচালক রাস্তার ওপরে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বললেন, রাত আটটা পর্যন্ত তাঁর গাড়িটি হাবিবা ৮০০ টাকায় ভাড়া নিয়েছেন।

মোটরসাইকেল ফেরত পেয়েছেন কি না তা জানার জন্য শনিবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে হাবিবা বলেন, তখনো তিনি বাইক পাননি। ট্রাফিক অফিস থেকে বলেছিল যে গাড়ির ব্যবস্থা হলে তাঁকে ফোন করে জানানো হবে। তখনো তাঁকে ফোন করা হয়নি। তিনি একাই গণসংযোগ করছেন।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হাবিবার নামে ছয়টি মামলা হয়। তাঁকে সাতবার কারাগারে যেতে হয়েছে। তিনি আত্মরক্ষার্থে পুলিশের হাতে কামড় দিয়ে আলোচিত হয়েছিলেন। এখনো দুটি মামলা আছে। তিনি উপজেলা কৃষক লীগের সাবেক নারীবিষয়ক সম্পাদক। তাঁর দাবি, সব মামলা হয়রানিমূলক।

একা একা প্রচারণা চালানোর ব্যাপারে হাবিবা বেগম বলেন, ‘আমার সঙ্গে কেউ প্রচারণা চালাতে আসলেই আওয়ামী লীগ ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। এতে আমার সমর্থকদের ঝামেলা হতে পারে ভেবে কাউকে সঙ্গে না নিয়ে একাই প্রচারণা চালাচ্ছি।’