
কক্সবাজারের উখিয়ার মধুরছড়া আশ্রয়শিবির। শিবিরের মধ্যে বড় মাঠে চলছে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। মাঠের চারপাশে কয়েক হাজার দর্শক বসে দেখছিলেন। উত্তেজনায় সবাই যেন ফেটে পড়বে। কারণটা যে কেবল ম্যাচটিকে ঘিরে নয়, তা বোঝা গেল কিছুক্ষণ পর। আকাশি নীল জার্সি পরে একজন মাঠে নামতেই সবাই ফেটে পড়ল উল্লাসে। ওজিল, ওজিল ধ্বনিতে প্রকম্পিত পুরো মাঠ।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে প্রীতি ফুটবল ম্যাচে মাঠে নেমে এভাবেই সবাইকে উচ্ছ্বাসে মাতালেন জার্মানির বিশ্বকাপজয়ী দলের সাবেক তারকা ফুটবলার মেসুত ওজিল। স্মরণীয় করে রাখলেন মধুরছড়া শিবিরের ছোট মাঠটাকে। ম্যাচে কিছুক্ষণের জন্য রোহিঙ্গা তরুণ ফুটবল খেলোয়াড়েরা ওজিলকে পেয়েছিলেন। প্রিয় তারকাকে দেখে মাঠেই খেলা ফেলে খেলোয়াড়দের অনেকে জড়িয়ে ধরেন তাঁকে। মুঠোফোনে সেলফি তুলতেও ভোলেননি অনেকে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজার শহর থেকে সড়ক পথে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শনে আসেন তারকা ফুটবলার ওজিল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ছেলে নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ান। আশ্রয়শিবির পরিদর্শনের ফাঁকে তাঁরা মধুরছড়া খেলার মাঠে আরাকান রোহিঙ্গা ফুটবল ফেডারেশন (এআরএফএফ) আয়োজিত রোহিঙ্গা খেলোয়াড়দের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ দেখেন। খেলায় কিছু সময়ের জন্য অংশ নেন মেসুত ওজিলও।
রিয়াল মাদ্রিদ ও আর্সেনালের সাবেক ফুটবলার মেসুত ওজিল ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের শিরোপাজয়ী জার্মানি দলের সদস্য ছিলেন। ২০১৮ সালে জাতীয় দলকে বিদায় বলে দেন তিনি। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ওজিল খেলেছেন ৬৪৫ ম্যাচ, গোল করেছেন ১১৪টি।
ওজিল মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গে মাঠ ঘিরে বসা দর্শকেরা আনন্দে ফেটে পড়েন। ওজিলও হাসিমুখে তাঁদের হাত নেড়ে অভিবাদন জানান। মাঠে নেমে বল নিয়ে সোজা গোলপোস্টের দিকে অগ্রসর হন এই তারকা ফুটবলার। কয়েকজন খেলোয়াড় তাঁকে ঘিরে ধরে বল কেড়ে নিতে চাইলেও কাজ হয়নি। ওজিলের লক্ষ্যভেদী শট গোললাইন অতিক্রম করে জালে জড়ায়। মুহূর্তে গোলের উদ্যাপনে ফেটে পড়েন দর্শকেরা।
খেলা শেষে বিজয়ী দলের অধিনায়কের হাতে বিশ্বকাপের আদলে তৈরি ট্রফি তুলে দিন ওজিল।
রোহিঙ্গাদের এই প্রীতি ফুটবল ম্যাচ উপভোগ করেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমানসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তারা। তুর্কি সরকারের সহযোগী সংস্থা ‘টার্কিশ কো-অপারেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন এজেন্সি’ (টিকা) আশ্রয়শিবিরে ২০১৭ সালের পর রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন মানবিক সেবা দিয়ে আসছে। আজকের ফুটবল প্রীতি ম্যাচেরও আয়োজন করে টিকা।
আরআরআরসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গাদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচটি মেসুত ওজিলের কারণে জমজমাট ছিল। ওজিলকে কাছে পেয়ে রোহিঙ্গারা মহাখুশি।
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, উখিয়ার আশ্রয়শিবিরে তুরস্ক সরকারের অর্থায়নে বর্তমানে ৯টি স্কুল চালু রয়েছে। আরও স্কুল চালু করা দরকার। দাতাগোষ্ঠীর অর্থসহায়তা বন্ধ থাকায় কয়েক মাস ধরে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩ আশ্রয়শিবিরে অন্তত দুই হাজার লার্নিং সেন্টার (শিশু শিক্ষাকেন্দ্র) বন্ধ রয়েছে। জাতিসংঘের ইউনিসেফের অর্থায়নে চালু আছে দুই হাজারের বেশি শিক্ষাকেন্দ্র।
আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা থেকে বিশেষ উড়োজাহাজে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ানের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের প্রতিনিধিদলটি। বিমানবন্দরে প্রতিনিধিদলের সদস্যদের স্বাগত জানান কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ও পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান।
কক্সবাজার থেকে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা যান শহরের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ে। সেখানে তাঁদের স্বাগত জানান আরআরআরসি ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত প্রায় ৪০ মিনিটের বৈঠক শেষ করে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সড়কপথে ৪০ কিলোমিটার দূরের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের উদ্দেশে রওনা দেন।
তুর্কি সরকারের সহযোগী সংস্থা টিকার একটি প্রকল্পের অধীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ডা. মুর্তজা মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়নের কাজ চলছে। এই প্রকল্পে ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকার সহায়তা দিয়েছে তুর্কি সরকার। প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের জন্যই ঢাকায় আসেন বিলাল এরদোয়ান ও মেসুত ওজিল।
আরআরআরসি কার্যালয়ে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ান। তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালের রোহিঙ্গা–সংকটের শুরু থেকেই তুরস্ক সরকার রোহিঙ্গাদের পাশে ছিল এবং আছে। আমার মা-বাবাও রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ান। তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।’ রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে ধন্যবাদ জানান নেকমোদ্দিন এরদোয়ান।