
শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ৬৩ জন। কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পেয়েছেন ১২ জন।
নিয়োগ পাওয়া তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ৭৫ জন এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী অন্তত ১০০ জন।
গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে নানা বিতর্ক ছিল। কখনো বিজ্ঞপ্তির বাইরে নিয়োগ, কখনো দলীয় বিবেচনা, আবার কখনো স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। এখন বর্তমান প্রশাসনের দেওয়া নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষকদের একটি পক্ষ।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার। একই সময়ে দায়িত্ব নেন দুই সহ-উপাচার্য। দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৫ মাসে বর্তমান প্রশাসন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে অন্তত ২৫০ জনকে নিয়োগ দিয়েছে। আরও অন্তত ৩০৪ জনকে নিয়োগ দিতে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৪১ জনের নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে, যা আজ শুক্রবার বেলা ১১টায় অনুষ্ঠেয় সিন্ডিকেট সভায় চূড়ান্ত হওয়ার কথা। তাঁদের মধ্যে শিক্ষক ৪৭ জন ও কর্মকর্তা-কর্মচারী ৯৪ জন।
নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে তড়িঘড়ি করে। মূলত একটি গোষ্ঠীর লোক নিয়ে দল ভারী করা হচ্ছে। সাধারণ নিয়োগপ্রার্থীরা সুযোগ পাচ্ছেন না। বিষয়গুলো ইউজিসির খতিয়ে দেখা উচিত।জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান চৌধূরী
এসব নিয়োগ স্বজনপ্রীতি ও নিজেদের দল ভারী করার প্রক্রিয়া বলে অভিযোগ করে উপাচার্যকে চিঠি দিয়েছে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার বলেন, ‘আমরা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করছি। এখন লিখিত, মৌখিক ও প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে নিয়োগ হচ্ছে।’ বিপুলসংখ্যক নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, গত দেড় বছরে অনেকেই চাকরি ছেড়েছেন।
যেভাবে নিয়োগ
বর্তমান প্রশাসন গত ১৫ মাসে বিভিন্ন পদে ৫৫১ জনকে নিয়োগ দিতে অন্তত ২৫টি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। সব বিজ্ঞপ্তির নিয়োগপ্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। এর মধ্যে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ৬৩ জন। কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পেয়েছেন ১২ জন। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ৭৫ জন এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী অন্তত ১০০ জন। সব মিলিয়ে নিয়োগপ্রাপ্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫০।
আরও অন্তত ৩০৪ জনকে নিয়োগ দিতে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৪১ জনের নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে।
নিয়োগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮টি বিভাগে ৬৩ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্যে তিনজন যোগ দেননি। আর দুজন ডোপ টেস্টে আটকে গেছেন। এর মধ্যে পদার্থবিদ্যা, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স, প্রাণিবিদ্যা, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট উল্লেখযোগ্য।
নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলা বিভাগের সভাপতি আনোয়ার সাঈদ গত বছরের ২৮ আগস্ট লিখিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন, ওই বিভাগে নতুন শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজন নেই। তবু ওই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর সাতটি পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) এক চিঠিতে বলা হয়েছে, পদ অনুমোদনের আগেই বিভাগটিতে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। চিঠিতে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ জানানো হয়।
এর আগে গত বছরের ১৯ এপ্রিল ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে শিক্ষক নিয়োগে দুই পদের বিপরীতে বিজ্ঞপ্তি দেয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের বিজ্ঞপ্তির আগে বিভাগের পরিকল্পনা কমিটির অনুমোদন নেওয়ার কথা থাকলেও তা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন বিভাগের সভাপতি আলতাফ হোসেন। এ ছাড়া পরীক্ষার পর ওই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর শিক্ষক পদে নিয়োগপ্রত্যাশী তিন প্রার্থী সংবাদ সম্মেলন করে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তোলেন।
জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান চৌধূরী প্রথম আলোকে বলেন, নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে তড়িঘড়ি করে। মূলত একটি গোষ্ঠীর লোক নিয়ে দল ভারী করা হচ্ছে। সাধারণ নিয়োগপ্রার্থীরা সুযোগ পাচ্ছেন না। বিষয়গুলো ইউজিসির খতিয়ে দেখা উচিত।
আগের উপাচার্যদের আমলে কত নিয়োগ
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন ছয়জন উপাচার্য। তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি উপাচার্যের আমলেই নিয়োগের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য।
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত উপাচার্য ছিলেন আবু ইউসুফ। প্রায় দেড় বছরে তাঁর আমলে ৮৮ জন নিয়োগ পান। এরপর ২০১০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক মো. আলাউদ্দিনের আমলে ছয় মাসের কিছু বেশি সময়ে নিয়োগ দেওয়া হয় ৪০ জনকে।
২০১১ সালের জুন থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল আজিমের আমলে চার বছরে নিয়োগ দেওয়া হয় ৫৯৯ জনকে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। এরপর ২০১৫ সালের জুন থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত অধ্যাপক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর মেয়াদে নিয়োগ দেওয়া হয় ৫৩২ জনকে। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উপাচার্য অধ্যাপক শিরীণ আখতার প্রায় পাঁচ বছরে নিয়োগ দেন ৩১৬ জন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রসঙ্গে ইউজিসির চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে বিষয়টি তাঁরা খতিয়ে দেখবেন। তবে নিয়ম মেনে নিয়োগ দিতে বাধা নেই।