
বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলায় গভীর নলকূপের পানিতেও অস্বাভাবিক লবণাক্ততা ধরা পড়ছে। এতে হুমকিতে পড়েছে জনস্বাস্থ্য ও কৃষি।
দক্ষিণাঞ্চলে উপকূলের অনেক নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা সহনীয় সীমা ছাড়িয়ে গেছে আগেই। এখন গভীর নলকূপের পানিতেও অস্বাভাবিক লবণাক্ততা ধরা পড়ছে। ফলে একসময় যে পানি ছিল জীবনের উৎস, এখন সেই পানিই মানুষের শরীরে বয়ে আনছে নীরব বিপদ। একই সঙ্গে বাড়ছে কৃষিজমির লবণাক্ততা, কমছে ফসল উৎপাদন; যা উপকূলের জনজীবন ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত লবণযুক্ত পানি পান ও ব্যবহারের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির জটিলতা, গর্ভকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং নারীদের জরায়ু ও প্রজননতন্ত্রের নানা রোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘ সময় কাজ করা মানুষেরা চর্মরোগ ও সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছেন। গবেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, নিরাপদ পানির সংকট এবং লবণাক্ততার বিস্তার ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দক্ষিণাঞ্চলে স্বাস্থ্য ও জীবিকার সংকট আরও গভীর হতে পারে।
নদীর পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছেই
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের গবেষকেরা জানান, ২০২১ সালের মার্চে পটুয়াখালীর গলাচিপাসংলগ্ন তেঁতুলিয়া নদীর পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা ছিল শূন্য দশমিক ৮৭ ডিসি/এম (ডেসিসিমেন পার মিটার)। চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে হয়েছে ১ দশমিক ৭৫ ডিসি/এম। বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানিসংলগ্ন বলেশ্বর নদে ২০২১ সালের এপ্রিলে লবণাক্ততা ছিল ৪ দশমিক ৫৬ ডিসি/এম। সেখানে ২০২৫ সালের এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮৮ ডিসি/এম। একই সময়ে জেলার পায়রা নদীর লবণাক্ততা ১ দশমিক ৮ থেকে ৩ দশমিক ৯০ ডিসি/এম পর্যন্ত বেড়েছে।
নদীর পানির সহনীয় লবণাক্ততার মাত্রা শূন্য দশমিক ৭ ডিএস/এম। তবে দক্ষিণাঞ্চলের সব নদীর পানির লবণাক্ততার মাত্রা এর চেয়ে অনেক বেশি।এ এফ এম মামুন, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বরিশাল আঞ্চলিক মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট
ভোলার বোরহানউদ্দিন-সংলগ্ন মেঘনা নদীতে ২০২২ সালের এপ্রিলে লবণাক্তার মাত্রা ছিল শূন্য দশমিক ৬৮ ডিসি/এম। সেখানে ২০২৪ সালের এপ্রিলে তা ২৫ দশমিক ৩১ ডিসি/এমে পৌঁছায়। লবণাক্তার এই মাত্রা উজানের প্রায় ৭০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। অবশ্য পটুয়াখালীর কলাপাড়ার আন্ধারমানিক নদে ২০২১ সালের মার্চে লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল ২২ দশমিক ২০ ডিসি/এম। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে ১৫ দশমিক ২১ ডিসি/এমে এসেছে।
ভূগর্ভস্থ উৎসেও অস্বাভাবিক লবণাক্ততা
চলতি বছরের মার্চে উপকূলের বেশ কয়েকটি এলাকার গভীর নলকূপের পানি (১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ ফুট গভীর) পরীক্ষা করেন এসআরডিআইয়ের গবেষকেরা। পরীক্ষায় ভূগর্ভস্থ পানিতে অস্বাভাবিক লবণাক্ততা পাওয়া গেছে।
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বদরপুরে গভীর নলকূপের পানিতে ১ দশমিক ২৭ ডিসি/এম, উপজেলার পানপট্টি এলাকায় গভীর নলকূপে ১ দশমিক ৩৩ ডিসি/এম, মির্জাগঞ্জের পায়রাকুঞ্জ এলাকায় ১ দশমিক শূন্য ২ ডিসি/এম, নিউমার্কেট এলাকায় শূন্য দশমিক ৯২ ডিসি/এম, কলাপাড়া উপজেলার টিয়াখালীতে ১ দশমিক ৩৩ ডিসি/এম লবণাক্ততার উপস্থিতি পাওয়া যায়।
বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সর্বশেষ ২০২৪ সালে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, বিভাগে চাষযোগ্য ৮ লাখ ২ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে ৪ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর বা ৫২ শতাংশ লবণাক্ততায় আক্রান্ত। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত সাগরপারের জেলা পটুয়াখালী। সেখানে ১ লাখ ৫৫ হাজার ১৮০ হেক্টর বা ৩৯ শতাংশ জমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত। বরগুনা ও ভোলায় ২৪ শতাংশ জমি লবণাক্ততার কবলে পড়েছে। এ ছাড়া পিরোজপুরে ৯ শতাংশ, বরিশালে ৩ শতাংশ ও ঝালকাঠিতে ১ শতাংশ জমি লবণাক্ততার কবলে পড়েছে।
বরগুনার তালতলীর চরপাড়া গ্রামে গভীর নলকূপে ২ দশমিক ৩৫ ডিসি/এম, সদরের বরইতলা এলাকায় ১ দশমিক ৬০ ডিসি/এম এবং বেতাগী পৌর এলাকায় ২ দশমিক শূন্য ৪ ডিসি/এম লবণাক্ততা পাওয়া যায়।
জনস্বাস্থ্য প্রকৗশল অধিদপ্তর বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমরান তরফদার প্রথম আলোকে বলেন, খাওয়ার পানির গ্রহণযোগ্য লবণাক্ততার মাত্রা ৫০০ মিলিগ্রাম/লিটার। তবে উপকূলীয় এলাকায় সর্বোচ্চ সহনীয় সীমা হিসেবে এক হাজার মিলিগ্রাম/লিটার। প্রায় এক হাজার মিলিগ্রাম/লিটার লবণাক্ততা সমান ১ দশমিক ৫৬ ডিসি/এম। তিনি আরও বলেন, উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির দুষ্প্রাপ্যতার কারণে এটাকে সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা বলা হলেও, এটা মন্দের ভালো। কারণ, দীর্ঘদিন এই মাত্রার লবণাক্ত পানি পান করলে স্বাস্থ্যগত নানা ঝুঁকি তৈরি হয়।
বরিশাল আঞ্চলিক মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এফ এম মামুন প্রথম আলোকে বলেন, নদীর পানির সহনীয় লবণাক্ততার মাত্রা শূন্য দশমিক ৭ ডিএস/এম। তবে দক্ষিণাঞ্চলের সব নদীর পানির লবণাক্ততার মাত্রা এর চেয়ে অনেক বেশি। এক দশক আগেও নদীগুলোতে লবণাক্ততার মাত্রা এতটা ছিল না। বিশেষ করে এতটা উজানে লবণাক্তা ছিলই না। এর প্রভাবে ভূগর্ভস্থ পানির উৎসেও অসহনীয় মাত্রার লবণাক্ততা পাওয়া গেছে, যা এ অঞ্চলের জনস্বাস্থ্যের জন্য অশনিসংকেত।
আমরা খাবার, গোসল থেকে শুরু করে সব কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহার করি। এমনকি মাসিকের সময় যে কাপড় ব্যবহার করি, তা-ও লবণাক্ত পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করি।আমেনা বেগম, ছোট অংকুজানপাড়ার বাসিন্দা, আমতলী, বরগুনা
লবণাক্ততায় হুমকিতে জনস্বাস্থ্য
তালতলী উপজেলার বঙ্গোপসাগরতীরের গ্রাম ছোট অংকুজানপাড়া। গ্রামটি প্রমত্তা পায়রা নদীর ভাঙনে আয়তনে ছোট হয়ে আসছে। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে এই গ্রামে প্রায় ৪৫ জন মারা যান।
গত ১০ মে গ্রামটি ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের অনতি দূরেই পায়রা নদীতে অনেক কিশোরী ও বিভিন্ন বয়সের নারী ছোট ছোট নেট জাল দিয়ে কোমরপানিতে চিংড়ির রেণু ধরছেন। সেখানে কোহিনুর বেগম (৩০) নামের এক নারী জানান, তাঁরা বছরের ছয় মাস নদীতে পোনা ধরে। তিন থেকে চার ঘণ্টা কোমরসমান লবণাক্ত পানিতে থাকতে থাকতে তাঁদের হাত-পা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায় বাধ্য হয়ে তাঁদের নদীতে নামতে হয়।
উপকূলের বেশির ভাগ জমিতে শুধু বৃষ্টির মৌসুমে বছরে আমন ধান হয়। এই ধান কৃষকেরা ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে কেটে ঘরে তোলেন। এরপর শুষ্ক মৌসুমে জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় এবং সেচযোগ্য পানির দুষ্প্রাপ্যতার কারণে প্রায় সাত মাস কোনো ফসল ফলানো সম্ভব হয় না।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামটি ঘুরে অন্তত ৩৫ নারীর সঙ্গে কথা হয়, যাঁদের বয়স ২১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। তাঁরা সবাই জরায়ুসংক্রান্ত জটিলতা, মাসিকের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যায় ভুগছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত আটজনের অস্ত্রোপচার করে জরায়ু ফেলে দেওয়া হয়েছে। একজন গুরুতর সমস্যায় ভুগলেও বিয়ে না হওয়ায় পরিবার সেই ঝুঁকি নিতে চাইছে না। একই সঙ্গে কিডনির সমস্যায়ও ভুগছেন বেশ কয়েকজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাছ ধরার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোমরসমান লবণাক্ত পানিতে থাকা বা গোসল করা একজন নারীর প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং স্বাভাবিক মাসিক চক্রকে প্রভাবিত করতে পারে।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক শিখা রানী সাহা প্রথম আলোকে বলেন, এসব এলাকার নারীরা শৌচাগারে অপরিষ্কার পানি ব্যবহার করায় এই সমস্যাকে আরও ত্বরান্বিত করছে। তাঁরা মনে করেন, খাওয়ার জন্যই কেবল বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে হয়, শৌচকর্মে প্রয়োজন হয় না। ফলে তাঁদের শরীরে নানা ধরনের ইনফেকশন (সংক্রমণ) হয়। পাশাপাশি তাঁদের অপুষ্টি থাকায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। ফলে পরিচ্ছন্নতা না মানার কারণে জরায়ুর নানা সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এ জন্য সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
গবেষণায় দেখা যায়, জমির ১ হাজার ১০০ ফুট থেকে ১ হাজার ২০০ ফুট গভীরের পানি লবণাক্ত নয় এবং তা সেচযোগ্য। আর সাবমার্সিবল পাম্পের সাহায্যে ১ হাজার ১০০ ফুট বা তার নিচের পানি উত্তোলন করা সম্ভব। পাম্পটি কিনতে এবং বসাতে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। এ ধরনের একটি পাম্প দিয়ে ২০ থেকে ২৫ বিঘা জমিতে অনায়াসে রিলে প্রযুক্তিতে গমসহ অন্য রবি ফসলের চাষাবাদ করা যায়।
ছোট অংকুজানপাড়া গ্রামের দুলাল হোসেন (৫৫) দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন। সম্প্রতি তাঁর শরীরে আরও কিছু জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, তাঁর কিডনিতে সমস্যা হয়েছে।
দুলাল হোসেন বলেন, ‘আগে নদীতে মাছ ধরতাম। শরীর খারাপ হওয়ায় মাছের ছোট ব্যবসা করে কোনো রকমে সংসার চালাতাম; কিন্তু কিডনির জটিলতা হওয়ায় এখন চিকিৎসা করাব না সংসার চালাব, কিছুই ভাবতে পারছি না।’
দুলালের স্ত্রী কুলসুম বেগম দীর্ঘদিন সমস্যায় ভোগার পর অস্ত্রোপচার করে তাঁর জরায়ু ফেলে দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, এই সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। নারীদের অনিয়মিত মাসিক, মাসিকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, সাদা স্রাব, চুলকানিসহ নানা জটিলতা দিন দিন বাড়ছে। এসব স্বাস্থ্য সমস্যা নারীরা নানা কারণে প্রথম দিকে প্রকাশ করতে চান না। ফলে তা জটিল আকার ধারণ করার পর জরায়ু ফেলে দেওয়া ছাড়া পথ থাকে না।
জরায়ু কেটে ফেলেছেন আরেক নারী আমেনা বেগমও (৩৪)। তিনি বলেন, ‘আমরা খাবার, গোসল থেকে শুরু করে সব কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহার করি। এমনকি মাসিকের সময় যে কাপড় ব্যবহার করি, তা-ও লবণাক্ত পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করি।’
নারীদের স্বাস্থ্য সমস্যা প্রকট হচ্ছে
উপকূলে লবণাক্ততার ফলে নারীদের স্বাস্থ্যে যে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে, তা উঠে এসেছে একটি গবেষণায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিটি হেলথ অ্যান্ড হাইজিন বিভাগ ২০১৮ সালের জুনে এ নিয়ে একটি গবেষণা চালায়।
এসব এলাকার নারীরা শৌচাগারে অপরিষ্কার পানি ব্যবহার করায় এই সমস্যাকে আরও ত্বরান্বিত করছে। তাঁরা মনে করেন, খাওয়ার জন্যই কেবল বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে হয়, শৌচকর্মে প্রয়োজন হয় না। ফলে তাঁদের শরীরে নানা ধরনের ইনফেকশন (সংক্রমণ) হয়।অধ্যাপক শিখা রানী সাহা, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত
গবেষণায় কলাপাড়া উপজেলার টিয়াখালী ও বালিয়াতলী ইউনিয়ন থেকে ১০০ নারীকে (যাঁদের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুসন্তান রয়েছে) নিয়ে প্রথমে সমীক্ষা হয়। ওই এলাকার গভীর নলকূপ, পুকুর-খালের পানি এবং সমীক্ষায় অংশ নেওয়া নারীদের প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, ৫৮ শতাংশ নারী প্রতিদিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত মানের চেয়ে দুই গ্রামের বেশি সোডিয়াম গ্রহণ করছেন। এটি নারীদের প্রস্রাব ও রক্তচাপে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলেছে।
উচ্চ মাত্রার লবণাক্ততার প্রভাবে স্বাস্থ্যগত সমস্যা সম্পর্কে গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের মধ্যে কোনো সচেতনতা নেই। কেবল গ্যাস্ট্রিক, চর্মরোগ, বাতব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ—এসব স্বাস্থ্য সমস্যার কথার কথা জানেন তাঁরা। তবে কিছু উত্তরদাতা প্রশ্নোত্তরে মূত্রথলির জ্বালা, বেদনাদায়ক প্রস্রাব, স্ত্রীরোগজনিত সমস্যা, রক্তপাত ও অকাল গর্ভপাত, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (হৃদ্রোগ ও রক্তনালির রোগ), হাঁপানি, অ্যালার্জিসহ বেশ কিছু স্বাস্থ্য সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন।
‘সিডরের পর আমাগো জাগায় কোনো ফসল অইত না। ক্যামনে অইবে? খালি নুন আর নুন। তিন বছর আগে বাঁধ অওনে এহন একটা ফসল অয়, আমন ধান। হ্যারপর জমি খালি থাকে। কৃষিকাম কইর্যা এহন আর জীবন চলে না, কিন্তু ছাড়তেও পারি না।’ইদ্রিস হাওলাদার, উপজেলার শারিকখালী ইউনিয়নের নলবুনিয়া গ্রামের কৃষক
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিটি হেলথ অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক লিটন চন্দ্র সেন প্রথম আলোকে বলেন, লবণাক্ততার প্রভাবে উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-একলাম্পসিয়ার মতো আরও অনেক স্বাস্থ্যগত সমস্যা উপকূলে প্রকট হচ্ছে—গবেষণায় এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বাড়ছে অনাবাদি জমি
এসআরডিআই বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের ২০০৯ সালের জরিপ অনুযায়ী, অতিমাত্রার লবণাক্ততার কারণে বরগুনা জেলায় ১৭ হাজার ৪৪০ হেক্টর, পটুয়াখালীতে ৩৬ হাজার ৩৯০ হেক্টর, ভোলায় ১২ হাজার ৭৭০ হেক্টর ও ঝালকাঠি জেলায় প্রায় ১ হাজার হেক্টর আবাদি জমি কমে গেছে। এতে দক্ষিণের শস্যভান্ডারখ্যাত এই চার জেলায় ফসল উৎপাদনের অনুপযোগী জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৭ হাজার ৬০০ হেক্টর।
গত ১৬ বছরে লবণাক্ত জমির পরিমাণ আরও বেড়েছে। বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সর্বশেষ ২০২৪ সালে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, বিভাগে চাষযোগ্য ৮ লাখ ২ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে ৪ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর বা ৫২ শতাংশ লবণাক্ততায় আক্রান্ত। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত সাগরপারের জেলা পটুয়াখালী। সেখানে ১ লাখ ৫৫ হাজার ১৮০ হেক্টর বা ৩৯ শতাংশ জমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত। বরগুনা ও ভোলায় ২৪ শতাংশ জমি লবণাক্ততার কবলে পড়েছে। এ ছাড়া পিরোজপুরে ৯ শতাংশ, বরিশালে ৩ শতাংশ ও ঝালকাঠিতে ১ শতাংশ জমি লবণাক্ততার কবলে পড়েছে।
কয়েক বছর আগেও বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ভোলা জেলার মাটি ও পানিতে বেশি লবণাক্ততা ছিল। গত দুই বছরে বরিশালের মাটি ও পানিতেও লবণাক্ততা পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন পটুয়াখালীর লেবুখালীতে অবস্থিত আঞ্চলিক উদ্যান তত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আলিমুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলায় তাঁদের গবেষণা প্লটে সম্প্রতি উচ্চমাত্রার লবণাক্ততার উপস্থিতি পেয়েছেন। এ ছাড়া ঝালকাঠিতে বেশ কয়েকটি এলাকায় অতিমাত্রার লবণাক্ততার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
‘কৃষিকামে এহন বাঁইচ্চা থাহাই দুষ্কর’
উপকূলের বেশির ভাগ জমিতে শুধু বৃষ্টির মৌসুমে বছরে আমন ধান হয়। এই ধান কৃষকেরা ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে কেটে ঘরে তোলেন। এরপর শুষ্ক মৌসুমে জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় এবং সেচযোগ্য পানির দুষ্প্রাপ্যতার কারণে প্রায় সাত মাস কোনো ফসল ফলানো সম্ভব হয় না।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এক দশক আগে কৃষি বিভাগের প্রণোদনায় আউশের আবাদ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অসময়ে ভারী বৃষ্টি, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে সেই উদ্যোগে খুব একটা সফলতা আসছে না।
দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে বরগুনার তালতলী উপজেলার গাবতলা গ্রামের কৃষক আবদুল মন্নান বয়াতি বলেন, ‘নুনের কারণে মোগো জাগাজমিতে ধান অয় না। আমন ধানের ফলনও কইম্মা গ্যাছে। ক্ষতি পোষাইতে এহন আউশ ধান করি। ঝড়-বইন্যা অইলে হেইয়্যাও ঘরে আনতে পারি না। কৃষিকামে এহন আর লাভ তো দূরে থাউক, বাঁইচ্চা থাহাই দুষ্কর।’
কৃষি কার্যালয় সূত্র জানায়, তালতলীতে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ১৬ হাজার ৪৪১ হেক্টর। তবে শুকনা মৌসুমে পানির অভাবে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমিতে ফসল আবাদ করা সম্ভব হয় না।
উপজেলার শারিকখালী ইউনিয়নের নলবুনিয়া গ্রামের কৃষক ইদ্রিস হাওলাদার বলেন, ‘সিডরের পর আমাগো জাগায় কোনো ফসল অইত না। ক্যামনে অইবে? খালি নুন আর নুন। তিন বছর আগে বাঁধ অওনে এহন একটা ফসল অয়, আমন ধান। হ্যারপর জমি খালি থাকে। কৃষিকাম কইর্যা এহন আর জীবন চলে না, কিন্তু ছাড়তেও পারি না।’
‘রিলে পদ্ধতিতে’ আশার আলো
উপকূলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লবণাক্ত পতিত জমিতে ফসল ফলানোর লক্ষ্যে অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চের (এসিআইএআর) সহায়তায় ২০১৭ সাল থেকে গবেষণা শুরু করেন একদল গবেষক। ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া এবং পভার্টি ইরাডিকেশন প্রকল্পের আওতায় সাত বছর ধরে মাঠপর্যায়ে গবেষণার পর লবণাক্ত জমিতে বিনা চাষে গম আবাদের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়। গবেষকেরা দেখতে পান, গমজাতীয় ফসলে অল্প সেচ দিয়েই ভালো উৎপাদন সম্ভব এবং ফসল হিসেবে গম প্রকৃতিগতভাবেই কিছুটা লবণসহিষ্ণু। তাই ‘রিলে পদ্ধতিতে’ গম ও মুগ ফসলের প্রযুক্তি উদ্ভাবনে নিবিড় গবেষণায় মনোযোগ দেন গবেষকেরা। উল্লেখ্য, ‘রিলে ক্রপিং’ এমন একটি চাষাবাদ কৌশল, যেখানে একই জমিতে আগের ফসল শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী ফসল আংশিকভাবে বপন করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, জমির ১ হাজার ১০০ ফুট থেকে ১ হাজার ২০০ ফুট গভীরের পানি লবণাক্ত নয় এবং তা সেচযোগ্য। আর সাবমার্সিবল পাম্পের সাহায্যে ১ হাজার ১০০ ফুট বা তার নিচের পানি উত্তোলন করা সম্ভব। পাম্পটি কিনতে এবং বসাতে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। এ ধরনের একটি পাম্প দিয়ে ২০ থেকে ২৫ বিঘা জমিতে অনায়াসে রিলে প্রযুক্তিতে গমসহ অন্য রবি ফসলের চাষাবাদ করা যায়।
উপকূলীয় অঞ্চলে ৪ লাখ ৩৯ হাজার হেক্টর জমি শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততার কারণে পতিত থাকে। রিলে পদ্ধতি সম্প্রসারিত করা গেলে বছরে ১৩ লাখ টন গম উৎপাদন করা সম্ভব।
২০২২ সালে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পূর্ব দৌলতপুর গ্রামের কয়েকজন কৃষককে এ প্রযুক্তির বিষয়ে ধারণা দিয়ে গমের চাষ করানো হয়েছিল। ওই বছর সামান্য জমিতে আবাদ করে সফলতা পাওয়া যায়। সেই সূত্র ধরে তালতলীর শারিকখালীর নলবুনিয়া গ্রামে গত বছর প্রথম গমের আবাদ করেন কৃষকেরা।
জানতে চাইলে গবেষকদলের প্রধান ও কৃষিবিজ্ঞানী মৃন্ময় গুহ নিয়োগী প্রথম আলোকে বলেন, লবণাক্ত জমিকে আবাদের আওতায় আনতে রিলে প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেন তাঁরা। এতে সফলতাও এসেছে। এখন এই প্রযুক্তির সম্প্রসারণ করা গেলে উপকূল অঞ্চলে কৃষকেরা শুষ্ক মৌসুমে অতিরিক্ত একটি ফসল ঘরে তুলতে পারবেন। উপকূলীয় অঞ্চলে ৪ লাখ ৩৯ হাজার হেক্টর জমি শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততার কারণে পতিত থাকে। এই প্রযুক্তি সম্প্রসারিত করা গেলে বছরে ১৩ লাখ টন গম উৎপাদন করা সম্ভব।
দরকার টেকসই পানি সরবরাহব্যবস্থা
সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক জলাধার সংস্কারসহ উপকূলজুড়ে টেকসই পানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জাতীয় পানি সম্পদ সুরক্ষা কমিটির বরিশাল বিভাগীয় সদস্য রফিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, সংকটাপন্ন এলাকায় স্থানীয় জলাধারগুলোর সুরক্ষা এবং মিঠাপানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। খাবার পানির জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, উপরিভাগের পানি শোধনাগার নির্মাণ এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ছাড়া সরকারি পুরোনো রিজার্ভ পুকুরগুলো পুনঃখনন এবং নতুন পুকুর খননের মাধ্যমে সুপেয় পানির আধার গড়ে তোলা যেতে পারে।
বরগুনার পাথরঘাটায় ২০২৪ সাল থেকে অক্সফাম-এর সহায়তায় বেসরকারি সংস্থা এনএসএস ভূ-উপরিস্থ পানি পরিশোধন করে আড়াই হাজার পরিবারে সরবরাহ করছে। এই পানি সরবরাহ, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা দায়িত্বে রয়েছেন সুবিধাভোগী নারীরাই। সুবিধাভোগীরা লিটার প্রতি ৩০ পয়সা মূল্যে প্রতি পরিবারে দৈনিক ৫ থেকে ১০ লিটার পানি এখান থেকে কিনে নেন। মাস শেষে বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খরচ মিটিয়ে যে টাকা থাকে তা আবার সুবিধাভোগীদের মধ্যে ভাগ দেওয়া হয়। এতে এসব পরিবারের ৮ হাজার সদস্য সুপেয় ও নিরাপদ পানির সুবিধার আওতায় এসেছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক শাহাবুদ্দিন পান্না প্রথম আলোকে বলেন, এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা পাচ্ছে। পাশাপাশি সুপেয় পানি সংকটের টেকসই সমাধান এনে দিয়েছে। প্রকল্পটি চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে। তবে দ্বিতীয় ধাপে উন্নীত না হলে প্ল্যান্টগুলো সুবিধাভোগী নারীদের নিয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হবে।