বাড়িটি যেকোনো সময় বাঙালি নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। গত রোববার উপজেলার সীমাবাড়ি ইউনিয়নের ঘাসুড়িয়া গ্রামে তোলা
বাড়িটি যেকোনো সময় বাঙালি নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। গত রোববার উপজেলার সীমাবাড়ি ইউনিয়নের ঘাসুড়িয়া গ্রামে তোলা

বগুড়ায় বাঙালি নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম, বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব অনেক পরিবার

বাঙালি নদীর পাড়ে চুপচাপ বসে ছিলেন চকখানপুর গ্রামের বাসিন্দা চৈতন্য সরকার (৭৫)। দীর্ঘক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল পানি। সামনে নদীর উত্তাল স্রোত, আর সেই স্রোতের গর্ভে হারিয়ে গেছে নিজের গ্রাম।

দীর্ঘক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে থাকার পর ভারাক্রান্ত কণ্ঠে চৈতন্য সরকার বললেন, ‘কষ্ট কইরা এই গ্রাম গড়ছিলাম। একসময় ইহিনে (এখানে) ১৩০টি বাড়ি ছিল। নদী একে একে সব নিয়া গেছে। বাড়ি হারাইয়া মানুষও গ্রাম ছাইড়া চইলা গেছে। নদী আমাগারে নিঃস্ব কইরা দিছে। এই কষ্ট আর সহ্য হয় না।’

চৈতন্য সরকার বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের চকখানপুর গ্রামের হাওলাদার পাড়ার বাসিন্দা। এই পাড়ার প্রায় সবাই মৎস্যজীবী পরিবারের। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালি নদীতে মাছ ধরেই তাঁদের জীবিকা চলেছে। কিন্তু সেই নদীই এখন তাঁদের বসতভিটা গ্রাস করছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত ১৫ বছরে অন্তত ১১০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। বর্তমানে মাত্র ২০টি পরিবারের বসতঘর টিকে আছে। তাঁদের আশঙ্কা, চলতি বছরের ভাঙনে সেগুলোর অনেকগুলোও নদীতে চলে যাবে।

নদীর পাড়ে বসে আছেন চকখানপুর গ্রামের বাসিন্দা চৈতন্য সরকার। গতকাল সোমবার তোলা

শুধু চৈতন্য সরকার নন, একই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে রায়চরণ হাওলাদার, সাধনা রানী হাওলাদার, জীতেন হাওলাদার, নীলকান্ত হাওলাদারসহ পুরো হাওলাদার পাড়ার মানুষের। তাঁদের অনেকেই একাধিকবার বসতভিটা সরিয়েছেন। এখন আর সরিয়ে নেওয়ার মতো জায়গাও নেই।

গত রোববার ও গতকাল সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে এ বছর বাঙালি ও করতোয়া নদীর পানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তীব্র স্রোতের কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীতীর ভাঙতে শুরু করেছে। এতে বসতবাড়ির পাশাপাশি বিস্তীর্ণ ফসলি জমিও নদীতে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

এ পর্যন্ত তিনবার ভাঙনের কারণে বাড়ি সরাইছি। এবার ভাঙলি নতুন বাড়ি বানানের জাগা নাই। দিনে–রাতে ঝপ ঝপ করে বাড়ির সামনে থাকা জায়গাটুকু নদীতে ভেঙে পড়ে।
সাধনা রানী হাওলাদার, ভুক্তভোগী

খানপুর ইউনিয়নে বাঙালি নদীর ডান তীরে বড়ইতলী উত্তর পাড়া গ্রামে প্রায় ২৫০ মিটার, চকখানপুর গ্রামের হাওলাদার পাড়ায় প্রায় ৪০০ মিটার এবং দহখানপুর পাড়ায় প্রায় ১৫০ মিটার এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। একইভাবে সুঘাট ইউনিয়নে পরিষদের পাশে সুঘাট বাজার এলাকায় বাঙালি নদীর বাঁ তীরে প্রায় ৫০০ মিটার, মধ্যভাগ গ্রামে ১৫০ মিটার, বিনোদপুর গ্রামের সাহেববাড়ি এলাকায় ডান তীরে প্রায় ৬০০ মিটার এবং চকপাহাড়ি গ্রামে প্রায় ৩০০ মিটার এলাকায় ভাঙন চলছে।

এ ছাড়া সীমাবাড়ি ইউনিয়নের ঘাসুরিয়া গ্রামে প্রায় ৩০০ মিটার, নলুয়া গ্রামে প্রায় ২০০ মিটার, খামারকান্দি ইউনিয়নে বাঙালী নদীর বাঁ তীরে প্রায় ১০০ মিটার এবং ঝাজর উত্তর পাড়া গ্রামে ডান তীরে প্রায় ২০০ মিটার এলাকায় ভাঙন হয়েছে।

নদীর পানিতে যেন বাড়ির শিশুরা না পড়ে যায়, তাই কাপড় দিয়ে নদীপাড়ে বেড়া দেওয়া হয়েছে। গত রোববার উপজেলার সীমাবাড়ি ইউনিয়নের ঘাসুড়িয়া গ্রামে তোলা

করতোয়া নদীতেও পানি বাড়ার কারণে গাড়িদহ ইউনিয়নের ফুলবাড়ী ঘাটপার সেতু-সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১৫০ মিটার, কালশিমাটি স্কুল-সংলগ্ন এলাকায় বাঁ তীরে প্রায় ২০০ মিটার এবং মির্জাপুর ইউনিয়নের কাশিয়াবালা গ্রামে ডান তীরে প্রায় ২০০ মিটার এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় বসতবাড়ি ও আবাদি জমি হুমকির মুখে আছে।

চকখানপুর গ্রামের সাধনা রানী হাওলাদার বললেন, ‘এ পর্যন্ত তিনবার ভাঙনের কারণে বাড়ি সরাইছি। এবার ভাঙলি নতুন বাড়ি বানানের জাগা নাই। দিনে–রাতে ঝপ ঝপ করে বাড়ির সামনে থাকা জায়গাটুকু নদীতে ভেঙে পড়ে। এই চিন্তায় রাইতে ঘুম আসে না।’

নতুন অর্থবছরে এখনো কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বরাদ্দ পাওয়ার পর এই ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাহমুদ হাসান, বগুড়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী

সীমাবাড়ি ইউনিয়নের ঘাসুরিয়া গ্রামের দিনমজুর দুই ভাই আবদুস সাত্তার ও আবদুস সালামের বাড়ির কিছু অংশ নদীতে চলে গেছে। রান্নাঘরের অর্ধেক নদীতে, বাকি অর্ধেকে ঝুঁকি নিয়ে রান্না করেন পরিবারের নারীরা। যেকোনো সময় পুরো বাড়ি নদীতে বিলীন হতে পারে। তাঁরা বলেন, দুই বছর আগে তাঁদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া বাঙালি নদী খনন করা হয়। খননের পর থেকেই নদীভাঙন বেড়েছে। গত বছর তাঁদের বাড়ি নদীতে বিলীন হয়। এরপর কিছুটা দূরে নতুন ঘর তুললেও এবার সেটিও নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে নলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের একটি অংশ ভেঙে গেছে। বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বলেন, বিদ্যালয়ের খেলার মাঠও ভাঙনের কবলে পড়েছে। ইতিমধ্যে মাঠের অন্তত ৪০ মিটার নদীতে বিলীন হয়েছে।

নদীতে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায় এক গ্রাম। খানপুর ইউনিয়নের চকখানপুর গ্রামের হাওলাদার পাড়ার চিত্র

খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান পিয়ার উদ্দিন, খামারকান্দি ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাজেদুর রহমান এবং গাড়িদহ ইউপির চেয়ারম্যান তবিবুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে তাঁরা জানান, বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনও বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) বিষয়টি জানিয়েছে।

বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন। তিনি ভাঙন রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট পাউবোকে বলেছেন।

এ বিষয়ে বগুড়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, এই নতুন অর্থবছরে এখনো কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বরাদ্দ পাওয়ার পর এই ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।