রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) এক চেয়ারম্যানকে অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ করেছেন এনসিপির নেতা–কর্মীরা।
অবরুদ্ধ বেতগাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান মোহাইমিন ইসলাম (মারুফ) নৌকা প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বেতগাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর সহিংসতার মামলায় আসামি হওয়ায় তাঁকে চেয়ারম্যান পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মোহাইমিন ইসলাম গ্রেপ্তার হয়ে কিছুদিন কারাগারে ছিলেন। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। গত ৩১ মার্চ রংপুর জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত এক পত্রে তাঁকে পুনরায় চেয়ারম্যান পদে বহাল করা হয়।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের প্রস্তুতিমূলক সভায় অংশ নিতে উপজেলা পরিষদে আসেন বেতগাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান মোহাইমিন ইসলাম। সভা শেষে ইউএনওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তাঁর কক্ষে গেলে এনসিপির নেতা–কর্মীরা সেখানে উপস্থিত হয়ে দরজার সামনে অবস্থান নেন। এতে এক ঘণ্টার বেশি সময় তিনি ইউএনও কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা প্রথম আলোকে বলেন, ইউএনও কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে এনসিপির উপজেলা কমিটির সাবেক প্রধান সমন্বয়কারী রিফাত চৌধুরীর নেতৃত্বে সাবেক যুগ্ম সমন্বয়কারী জীবন, জাহানুর, তৈয়ব এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির সদস্য রাদিদ, আহাদসহ অন্যরা চেয়ারম্যানকে দ্রুত অপসারণ ও গ্রেপ্তারের দাবি জানান। এ সময় তাঁরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গেও যোগাযোগ করেন। একপর্যায়ে ইউএনও জেসমিন আক্তার তাঁদের সঙ্গে কথা বলে অন্য একটি সভায় যোগ দিতে চলে যান। পরে চেয়ারম্যান কার্যালয় থেকে বের হলে এনসিপির নেতা–কর্মীরা ইউপি চেয়ারম্যানকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে উভয় পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। এ সময় উপস্থিত বেদগাড়ী ইউপি সদস্যরা চেয়ারম্যানকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যান।
মোহাইমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এনসিপির গুটিকয় ছেলে আমার সঙ্গে মিসবিহেভ করেছে। ওরা আমাকে খুব হুমকি–ধমকি দিছে। ইউএনও স্যারের রুমের সামনে বসে ওখান থেকে খুব চিল্লাপাল্লা করেছে।’
মোহাইমিনের দাবি, গত ১ ফেব্রুয়ারি তিনি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন ও সব কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি নেন। পরে তিনি বিএনপিতে যোগদান করেন।
জানতে চাইলে রিফাত চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘উনি (মোহাইমিন) একটা হত্যা মামলার আসামি। উনি একটা সময় পলাতক ছিল, পরে কিছুদিন জেলেও ছিল। তো উনি ওখান থেকে এসে আবার স্বাভাবিকভাবে সবকিছু নিচ্ছেন। এখন অনেকেই যুক্তি দেখাচ্ছে, উনি বিএনপি সদস্য, নতুন করে সদস্য হইছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, উনি তো নৌকা মার্কার চেয়ারম্যান। ১০ দিন আগে গঙ্গাচড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি গ্রেপ্তার হয়েছে। আর একটা হত্যা মামলার আসামি ওপেনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা–ও আবার নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান—এটা আসলে অভ্যুত্থানের পর আমাদের কাছে মেনে নেওয়াটা অনেক বেশি কষ্টের।’
ইউপি চেয়ারম্যানকে অবরুদ্ধ করার বিষয়ে রিফাত চৌধুরীর ভাষ্য, ‘আমরা প্রশাসনকে বারবার জানানোর পরও প্রশাসন বিষয়টা আমলে নেয়নি। ইভেন আজকেও তাঁরা আমাদের কোনোভাবেই সহযোগিতা করেনি। সেই জায়গা থেকে আমাদের কাছে মনে হয়েছে, তাঁকে অবরুদ্ধ করে যদি গ্রেপ্তার করানো যায়। সেই জায়গা থেকেও প্রশাসন আমাদের সহযোাগিতা করার থেকে তাঁকে বেশি সহযোগিতা করেছে।’
ঘটনার সময় ইউএনও কার্যালয়ে ছিলেন গঙ্গাচড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এনসিপির দাবি হলো, হয় চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করতে হবে, না হয় তাঁদের গ্রেপ্তার করতে হবে। এই নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।’
আইয়ুব আলীর দাবি, মোহাইমিন ইসলামের বিএনপিতে যোগদানের বিষয়টি জানেন না তিনি। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া ও সিটির একাংশ) আসনের বিএনপির প্রার্থী মোকাররম হোসেনের বাড়িতে তাঁকে ফুল নিয়ে ঢুকতে দেখেছেন।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আখতার প্রথম আলোকে বলেন, ‘অবরুদ্ধ করা বিষয়টা আমার আছে পরিষ্কার না। ঘটনা হচ্ছে, বেদগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাইমিন ইসলামকে গত ৩১ মার্চ বহাল করা হয়েছে। সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী কিছু ছাত্র এসে সেটার বিষয়ে প্রতিবাদ করে।’