রাজশাহীর পুঠিয়ার রাজবাড়ির এই পালঙ্কটি এখন ব্যবহার করছেন মৎস্যচাষি বাশার। মঙ্গলবার বিকেলে রাজবাড়ী এলাকায়
রাজশাহীর পুঠিয়ার রাজবাড়ির এই পালঙ্কটি এখন ব্যবহার করছেন মৎস্যচাষি বাশার। মঙ্গলবার বিকেলে রাজবাড়ী এলাকায়

পুঠিয়া রাজবাড়ির পালঙ্কে ঘুমান মৎস্যচাষি বাশার

রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ির দিঘির পাড়ে বসবাস করেন ৬৫ বছর বয়সী মৎস্যচাষি ইকবালুল বাশার। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দিঘিটি ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করছেন। তাঁর শোবার ঘরে আছে একটি পালঙ্ক, যা একসময় রাজবাড়িতে ব্যবহৃত হতো। তাঁর দাবি, রাজবাড়ির পালঙ্কটি তিনি প্রায় ৩৫ বছর আগে রাজপরিবারের উত্তরাধিকারীর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকায় কিনে নিয়েছেন।

পুঠিয়া রাজবংশ মোগল সম্রাট আকবরের সময় প্রতিষ্ঠিত হয়। এ বংশের শেষ রানি হেমন্ত কুমারী দেবী ১৮৯৫ সালের দিকে পুঠিয়ার রাজবাড়ি নির্মাণ করেন। তিনি ১৯০১ সালে ‘রানি’ এবং ১৯২০ সালে ‘মহারানি’ উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে সারা দেশে জমিদারিপ্রথার বিরুদ্ধে গণজাগরণ ঘটলে ক্রমেই পুঠিয়া রাজবংশেরও বিলোপ ঘটে বলে জাতীয় তথ্য বাতায়নে উল্লেখ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১০০ একর রাজবাড়ির সীমানার মধ্যে যাঁরা বাড়িঘর করেছেন, তাঁদের অনেকের বাড়ি থেকেই রাজবাড়ির জিনিস পাওয়া গেছে। এখনো অনেকেই সেসব জিনিস ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ স্বেচ্ছায় কিছু কিছু জিনিস রাজবাড়ির জাদুঘরে দিয়েছেন।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গত রোববার রাজবাড়ির সীমানায় অবস্থিত রাজপরিবারের দারোয়ানের বাড়ি ভাঙা হয়। এই বাড়িতে বর্তমানে আছেন পুঠিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মনিরুল ইসলাম। এ ব্যাপারে পুঠিয়া রাজবাড়ি জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান হাফিজুর রহমান গতকাল মঙ্গলবার পুঠিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

বাড়িটি ভাঙার সময় ঐতিহ্যবাহী একটি ড্রেসিং টেবিল সরিয়ে নিতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। তাঁদের ধারণা, আসবাবটি রাজবাড়ি ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন হতে পারে। তবে মনিরুল ইসলামের দাবি, ড্রেসিং টেবিলটা পুরোনো, তবে রাজপরিবারের কোনো অংশ নয়।

এদিকে ড্রেসিং টেবিলের বিষয়ে খোঁজখবর করার সময় পুকুর ইজারাদার ইকবালুল বাশারের বাড়িতে রাজবাড়ির ব্যবহৃত পালঙ্ক থাকার তথ্য দেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য গত সোমবার সন্ধ্যায় পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিয়াকত সালমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি মঙ্গলবার পুঠিয়াতে আসার জন্য বলেন। সেদিন দুপুরে কার্যালয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। সে সময় রাজবাড়ি জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান হাফিজুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।

ইউএনওর সঙ্গে আলাপের পর কাস্টোডিয়ান হাফিজুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ইকবালুল বাশারের বাসায় যান এই প্রতিবেদক। রাজবাড়ির গোবিন্দসাগর দিঘির পাড়ে তিনি বাড়ি নির্মাণ করেছেন। বাড়ি থেকে সিঁড়ি নেমে এসেছে দিঘির পানিতে। বিশাল আকারের এই দিঘির চারপাশে অনেকগুলো প্রাচীন ঘাট আছে। তবে ইকবালুল বাশারের ঘাটটি নিজের মতো করে নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন।

পালঙ্কেটির পায়াগুলো ইগলের মুখের আদলে তৈরি করা। পালঙ্কের তিন দিকে এবং পায়ের দিকে একটি বিশেষ নকশা করা আছে

বাড়িটিতে বসে কথাবার্তার এক পর্যায়ে পালঙ্কের প্রসঙ্গ তুললে ইকবালুল বাশার স্বীকার করেন, তাঁর কাছে একটা পালঙ্ক আছে। মহারানি হেমন্ত কুমারী দেবীর পালঙ্ক। তবে সেটির রং তিনি পরিবর্তন করে ফেলেছেন। তাঁর শোবার ঘরে গিয়ে দেখা যায়, পালঙ্কটি তিনি নিয়মিত ব্যবহার করেন।

ইকবালুল বাশার পালঙ্কের কোন কোন অংশ পরিবর্তন করেছেন, তা দেখালেন। বললেন, ওপরের স্ট্যান্ডগুলো এখন নেই। কীভাবে, কোথায় স্ট্যান্ডগুলো লাগানো ছিল, সেই চিহ্নগুলো তিনি দেখান। পালঙ্কটি কলকাতায় নির্মাণ করা এবং কোন কোম্পানি পালঙ্কটি নির্মাণ করে দিয়েছিল, একটা ধাতব পাতে তা লেখা ছিল। কিন্তু এখন নেই, হারিয়ে গেছে। তবে তিনি খুঁজলে জানতে পারবেন, এটি কত সালে নির্মাণ করা হয়।

কীভাবে ইকবালুল বাশার খাটটি পেয়েছিলেন, তা জানতে চাইলে বলেন, পুঠিয়ার চারআনা রাজার উত্তরাধিকার কোমর বেগমের মেয়ে রেজিনা জামালের কাছ থেকে ১৯৯১ সালে তিনি ১০ হাজার টাকা দিয়ে পালঙ্কটি কিনে নেন।

উল্লেখ্য, রেজিনা জামালের মা কোমর বেগম দাবি করতেন, রাজা নরেশ নারায়ণ পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁকে বিয়ে করেছিলেন। এই কোমর বেগমের অন্য পক্ষের সন্তান হচ্ছেন রেজিনা জামাল। চারআনা রাজবাড়ি চত্বরে কোমর বেগম ও তাঁর মেয়ে রেজিনা জামালের কবর আছে।

ইকবালুল বাশারের দাবি, তাঁর এক আত্মীয় পালঙ্কটি এক লাখ টাকায় কিনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি বিক্রি করেননি। এই পালঙ্কের প্রতিটি অঙ্গ সেই আমল থেকে অবিকল আছে। তিনি শুধু আগের অ্যান্টিক রং পরিবর্তন করেছেন। পালঙ্কের পায়াগুলো ইগলের মুখের আদলে তৈরি করা। পালঙ্কের তিন দিকে এবং পায়ের দিকে একটি বিশেষ নকশা করা আছে। পালঙ্কে ওঠার কোনো সিঁড়ি ছিল না বলে দাবি তাঁর।
পালঙ্কটি দেখে রাজবাড়ির বলে মত দেন সহকারী কাস্টোডিয়ান হাফিজুর রহমান। তিনি পুঠিয়া রাজবাড়ির জাদুঘরটি সমৃদ্ধ করার জন্য ইকবালুল বাশারের সহযোগিতা চান। আর কারও বাড়িতে কোনো প্রত্নবস্তু থাকলে তার সন্ধান দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। পাশাপাশি পালঙ্কটি যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য দেখেশুনে ব্যবহার করার পরামর্শ দেন।

জাদুঘরের পক্ষ থেকে নিতে চাইলে পালঙ্কটি দেবেন কি না—তা জানতে চাইলে ইকবালুল বাশার প্রথম আলোকে হাসতে হাসতে বলেন, এটা তাঁর শখের জিনিস। তিনি শখ করে কিনেছেন। তারপরও দেবেন কি না জানতে চাইলে তিনি শুধু বলেন, ‘না।’