কক্সবাজারের চকরিয়ার সাহারবিল রেলওয়ে স্টেশন। রাতের বেলায় এই স্টেশন পার হচ্ছিল কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামগামী সৈকত এক্সপ্রেস ট্রেন। হঠাৎ ট্রেনের খাবার বগিতে বাইরে থেকে ছুটে আসে একটি পাথর। কাচ ভেঙে যায়। আহত হন ভেতরে থাকা এক ব্যক্তি।
চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের এ ঘটনা ঘটে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর রাত ১১টায়। গত ২০ দিনের ব্যবধানে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে তিনবার। এতে শিশুসহ আহত হয়েছেন তিনজন।
সর্বশেষ গত শনিবার বিকেলে ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে বাইরে থেকে ছোড়া পাথরে আহত হয়েছে ৯ বছর বয়সী এক শিশু। যদিও তার আঘাত গুরুতর ছিল না। এর আগে বাইরে থেকে ছোড়া পাথরে যাত্রী নিহত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। অনেকের মাথায় আঘাত লাগে। এমন হতাহতের ঘটনা রোধে বিভিন্ন সময়ে প্রচারাভিযান ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হয়, এরপর তা কমে আসে।
চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের কারণে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। রেলের আর্থিক ক্ষতি হলেও যাত্রীদের জানমালের ক্ষতি হয় বেশি। এই কারণে রেলের নিরাপদ যাত্রী সেবা বিঘ্নিত হয়।মোহাম্মদ সফিকুর রহমান, প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা, রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল।
রেলওয়ে ও রেল পুলিশের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা খেলাচ্ছলে এবং ভবঘুরে লোকজন পাথর ছুড়ে মারেন। চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা রোধে রেললাইনের পাশের এলাকায় নিয়মিত প্রচারণা চালানো হয়। তবে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে জানান নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
৮ জানুয়ারি সকালে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায় বিরতিহীন সুবর্ণ এক্সপ্রেস। কুমিল্লার ময়নামতি স্টেশনের আগে চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। এতে মাথা ফেটে যায় এক যাত্রীর। ট্রেনেই আহত যাত্রীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। সুবর্ণ এক্সপ্রেস যাত্রাপথে কোনো স্টেশনে থামে না, কিন্তু ওই দিন থামাতে হয়।
এর আগে ২৮ ডিসেম্বর ট্রেনের বগিতে ভাসমান ডিম বিক্রেতাকে ডিম বিক্রি করতে নিষেধ করেন এক যাত্রী। মনসুর আলম নামের ওই ডিম বিক্রেতা ট্রেন থেকে নেমে পাথর ছুড়ে মারেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে খাবার বগির কাচ ভেঙে পাথরটি ভেতরে থাকা এক ব্যক্তির শরীরে লাগে।
বাইরে থেকে এলোপাতাড়ি পাথর নিক্ষেপের কারণে ট্রেনের যাত্রী মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। ২০১৩ সালের ১১ আগস্ট মারা গিয়েছিলেন প্রকৌশলী প্রীতি দাশ। ওই দিন রাতে স্বামীর সঙ্গে ট্রেনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাচ্ছিলেন প্রীতি। রাত ১১টা ২০ মিনিটে সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারির ভাঙা ব্রিজ এলাকায় পৌঁছানোর পর বাইরে থেকে জানালা লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করা হয়।
এরপর শনিবার পর্যটক এক্সপ্রেসের যাত্রী ৯ বছর বয়সী শিশু বাইরে থেকে ছোড়া পাথরের আঘাতে আহত হয়। এই তিন ঘটনার মধ্যে চকরিয়ার ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হলেও অন্য দুটিতে কাউকে শনাক্ত করা যায়নি, তবে তিনটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করা সম্ভব হয়নি।
বিদায়ী বছরে কী পরিমাণ পাথর ছুড়ে মারার ঘটনা ঘটেছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে রেলওয়ে এবং রেল পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা একেবারেই বন্ধ হচ্ছে না। প্রতি মাসেই গড়ে ৭ থেকে ৮টি ঘটনা ঘটে, অর্থাৎ বছরে প্রায় ১০০ বার এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুট এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের চিনকি আস্তানা, ফাজিলপুর ও সীতাকুণ্ড অংশে ঝুঁকি বেশি। চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের কারণে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। রেলের আর্থিক ক্ষতি হলেও যাত্রীদের জানমালের ক্ষতি হয় বেশি। এই কারণে রেলের নিরাপদ যাত্রী সেবা বিঘ্নিত হয়।
রেলওয়ে ও রেল পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, রেলওয়ের প্রায় সব রুটে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে, তবে পাথর নিক্ষেপের বেশি ঘটনা ঘটছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনে। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের চিনকি আস্তানা, ফাজিলপুর ও সীতাকুণ্ড অংশে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। এই অংশ দিয়ে চলাচল করে অন্তত ১৬ জোড়া যাত্রীবাহী ট্রেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে প্রতিদিন গড়ে ৪ জোড়া (৮টি) ট্রেন আসা-যাওয়া করে।
চট্টগ্রাম রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুন রাত ৯টায় কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। কেউ হতাহত না হলেও বগির কাচ ভেঙে যায়। ভেতরে থাকা এক যাত্রীর মুঠোফোন নষ্ট হয়। কক্সবাজারের চকরিয়ায় এ ঘটনা ঘটেছিল।
এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চকরিয়ার দুই বাসিন্দা পেয়ার মোহাম্মদ ও আবদুল্লাহ আল নোমান নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করেছিল রেলওয়ে পুলিশ। এ ঘটনার চার দিন পর আবারও চকরিয়া এলাকায় ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছিল।
বাইরে থেকে এলোপাতাড়ি পাথর নিক্ষেপের কারণে ট্রেনের যাত্রী মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। ২০১৩ সালের ১১ আগস্ট মারা গিয়েছিলেন প্রকৌশলী প্রীতি দাশ। ওই দিন রাতে স্বামীর সঙ্গে ট্রেনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাচ্ছিলেন প্রীতি। রাত ১১টা ২০ মিনিটে সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারির ভাঙা ব্রিজ এলাকায় পৌঁছানোর পর বাইরে থেকে জানালা লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করা হয়।
চাকরিসূত্রে কক্সবাজারে থেকে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় যাওয়া-আসা করতে হয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা শিহাব জিশানকে। এ জন্য ট্রেনকে প্রাধান্য দেন তিনি। কিন্তু পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় আতঙ্কিত এই চাকরিজীবী বলেন, কখন কোন সময় নিজেই এর ভুক্তভোগী হন, তা নিয়ে আতঙ্ক রয়েছেন।
ট্রেনের যাত্রীদের পাথর ছুড়ে আহত করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান আছে। রেলওয়ে আইন ১৮৯০-এর ১২৭ ধারায় বলা হয়েছিল, যাত্রীদের ক্ষতি হতে পারে জেনেও কেউ যদি পাথর ছোড়ে, তাহলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে বা সর্বনিম্ন ১০ বছরের জেল দেওয়া হবে। তবে চলন্ত ট্রেন লক্ষ্য করে প্রায় সময় পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটলেও এ আইনের কোনো প্রয়োগ দেখা যায় না।
ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে রেলওয়ে পুলিশের চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার (এসপি) তহুরা জান্নাত প্রথম আলোকে বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে রেললাইনের পাশে যেসব বস্তি রয়েছে, ওখান থেকে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা খেলাচ্ছলে পাথর ছুড়ে মারে। ভবঘুরে লোকজনও একই ধরনের কাজ করেন। পুরোপুরি না হলেও তাঁরা চেষ্টা করছেন এ ধরনের ঘটনা কমিয়ে আনতে।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি দেলোয়ার মজুমদার বলেন, এ ধরনের ঘটনা অন্যতম কারণে হচ্ছে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে দ্বিধাবোধ করে না।