অভিযুক্ত রিপন টুডুকে গ্রেপ্তার ও নিহত শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ
অভিযুক্ত রিপন টুডুকে গ্রেপ্তার ও নিহত শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ

নিখোঁজের সাড়ে ৩ মাস পর জানা গেল হত্যার পর লাশ গুম করা হয় শিশুটির, মা–সহ গ্রেপ্তার ৩

বিয়ের আশ্বাসে মোছা. জিন্নাতুনকে তাঁর চার বছরের মেয়ে রাকিবা আক্তারসহ নিজ বাড়িতে নিয়ে যান রিপন টুডু (৪৫)। পরে বিয়ের কথা বললে জিন্নাতুনকে প্রায়ই মারধর করতেন রিপন। মারধর করা হতো রাকিবাকেও। একদিন শিশুটিকে জানালার সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়। এতে শিশুটির মৃত্যু হলে মরদেহ বাড়ির পাশের একটি বাগানে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

দিনাজপুর সদর উপজেলার জামতলী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রায় সাড়ে তিন মাস আগের ওই ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। আজ মঙ্গলবার ভোরে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর বেলা দুইটায় পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে জানানো হয়।

এ ঘটনায় রিপন টুডু ও জিন্নাতুনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া লাশ গুমে সহায়তা করায় রিপনের ভাগনে সুজন টুডুকেও (২০) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিন্নাতুনের করা লিখিত অভিযোগ মামলা হিসেবে নিয়ে তাঁদের এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

জিন্নাতুনের বাড়ি সদর উপজেলার খোসালপুর গ্রামে। ১৭ সেপ্টেম্বর তিনি পার্শ্ববর্তী গ্রামের সাঁওতাল সম্প্রদায়ের যুবক রিপন টুডুসহ সাতজনকে আসামি করে কোতোয়ালি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এতে তাঁকে মারধর ও রাকিবাকে হত্যার অভিযোগ করেন জিন্নাতুন।

রিপন টুডু (৪৫) জামতলী এলাকার মৃত নেপাল টুডুর ছেলে। পেশায় দিনমজুর। স্থানীয় লোকজন তাঁর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ করেছেন।

রাকিবাকে হত্যার খবর জানাজানি হলে রিপন বাবার বাড়ি থেকে জিন্নাতুনকে তুলে নিয়ে যান বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর দুজনই আত্মগোপনে চলে যান। তাঁদের গ্রেপ্তারের দাবিতে গত রোববার স্থানীয় লোকজন রিপনের বাড়িতে ভাঙচুর করেন। পরে বাড়ির আসবাবপত্র বের করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

গতকাল সোমবার পুলিশ রিপুন ও জিন্নাতুনকে আটক করে। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আজ ভোরে জামতলী এলাকায় রিপনের বাড়ির পাশে নারকেলবাগান থেকে রাকিবার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে কাহারোল উপজেলার দশমাইল পূর্বসাদিপুর গ্রামের রুবেল ইসলামের সঙ্গে বিয়ে হয় জিন্নাতুনের। তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় রাকিবা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় ২০২৫ সালের শেষ দিকে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। এরপর মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে আসেন জিন্নাতুন।

পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, চলতি বছরের মার্চের দিকে সাঁওতাল যুবক রিপন টুডুর সঙ্গে জিন্নাতুনের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে মে মাসে জিন্নাতুন ও তাঁর মেয়েকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান রিপন। পরে জিন্নাতুন বিয়ের জন্য চাপ দিলে রিপন মা-মেয়ে দুজনকে প্রায়ই মারধর করতেন। গত ৫ জুন মারধরের এক পর্যায়ে রাকিবার মৃত্যু হয়। পরে মরদেহ বাড়ির পাশের নারকেলবাগানে পুঁতে রাখা হয় বলে পুলিশের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রিপন জানান।

দিনাজপুর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) আনোয়ার হোসেন বলেন, শিশুটির মায়ের অভিযোগ পাওয়ার পর থেকেই থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা কাজ করছিলেন। গতকাল তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় দুজনকেই আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রিপন এ হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুম করার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, জিন্নাতুন পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন অথচ পুলিশ দেখে পালিয়ে গেছেন। রিপনের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ করেছেন, আবার তাঁর সঙ্গেই আত্মগোপনে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। যেহেতু দুজনই আটক হয়েছেন, অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদে প্রকৃত বিষয়টি জানা যাবে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।