
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় সংসদ সদস্য ও পুলিশের উপস্থিতিতে চার গ্রামের মাতুব্বরেরা সংর্ঘষে না জড়ানোর শপথ নিয়েছেন। এ সময় ঢাল, কাতরার মতো দেশি অস্ত্রও জমা দেওয়া হয়। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় উপজেলার হামিরদী ইউনিয়ন পরিষদ ভবনসংলগ্ন মুনসুরাবাদ মাদ্রাসা মাঠে।
ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলা) আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল হামিরদী ইউনিয়নের মুনসুরাবাদ, খাপুরা, মাঝিকান্দা ও সিংগারিয়া গ্রামের আট মাতুব্বরকে সংঘর্ষে না জড়ানোর শপথ করান।
এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভাঙ্গা সার্কেল) রেজওয়ান দীপু ও ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান উপস্থিতি ছিলেন। পাশে সংঘর্ষে ব্যবহার করা ৩৫টি ঢাল ও ৫টি কাতরার বাঁশ নিজ হাতে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেন সংসদ সদস্য। টিনের তৈরি ছয়টি ঢাল পোড়ানো সম্ভব না হওয়ায় সেগুলো থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
শপথ পড়ানোর পর সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আপনারা বলেন, আল্লাহকে হাজির-নাজির রেখে বলছি—আমরা নিজেরা নিজেরা আর কাইজ্জা-ফ্যাসাদ করব না। আমরা সবকিছু আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করব। আইন কাউকেই ছাড় দেবে না—এমপি, মন্ত্রী সবার জন্যই আইন সমান। এরপর যে যা করবেন, আল্লাহর ওয়াস্তে হিসাব করে করবেন—কাইজ্জা-ফ্যাসাদ। ভালো কাজের সঙ্গে আমি আছি, কাইজ্জা-ফ্যাসাদের সঙ্গে আমি নাই—পরিষ্কার কথা।’
শহিদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আপনারা ভবিষ্যতে কোনো কাইজ্জা-ফ্যাসাদ করে আমার কাছে তদবিরে আসতে পারবেন না। ছেলে কথা শোনে না—এটা বলবেন না। যে কথা শুনবে না, বুঝবেন সেটা গেছে। তাকে আমাদের দায়িত্বে দিয়ে দেন, পুলিশের কাছে দিয়ে দেন—সরকারি খাবার খাক (জেলখানায়)। তা ছাড়া তো পথ নেই।’ কম পরিমাণে দেশি অস্ত্র জমা দেওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা ঢাল-কাতরা দিতে চেয়েছেন, দেননি। এই যে যেগুলো দিয়েছেন, এগুলোও, কথা ঠিক রাখেননি আপনারা। তার মানে আপনাদের মনে এখনো আছে—ভবিষ্যতে দরকার হলে মাঠে নামবেন। সংসারে চলতে গেলে ঠোকাঠুকি হয়। তার জন্য মুরুব্বিরা আছেন, গণ্যমান্য ব্যক্তিরা আছেন, চেয়ারম্যান, মেম্বার, এমপি—সবই আছে।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন। বিবদমান চার গ্রামের পক্ষে বক্তব্য দেন বাবর আলী, সাধু মাতুব্বর, মিজানুর রহমান, ফারুক হোসেন প্রমুখ। তাঁরা অস্ত্র উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়ায় সংসদ সদস্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং ভবিষ্যতে আর সংঘর্ষে জড়াবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলী মোল্লা, ভাঙ্গা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কাউসার ভুঁইয়া, ঘারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মুনসুর আহম্মেদ, আলগী ইউপির চেয়ারম্যান ম ম সিদ্দিক, হামিরদী ইউপির চেয়ারম্যান খোকন মিয়া প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, গত শুক্র ও শনিবার চার গ্রামের মানুষ ৬ ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে জড়ান। হামিরদী ইউনিয়নের মুনসুরাবাদ বাজারের তিন রাস্তার মোড়ে পূর্ব বিরোধের জের ধরে লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে দুই পক্ষের অন্তত ৬০ জন আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। শনিবার সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে আহত হন পুলিশ সদস্যরা। এ ঘটনায় রোববার ভাঙ্গা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কবির হোসেন মোল্লা বাদী হয়ে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে ওই চার গ্রামের ৬৩ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৪০০ থেকে ৫০০ জনের বিরুদ্ধে ভাঙ্গা থানায় একটি মামলা করেন। এজাহারভুক্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ভাঙ্গা থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, ‘এমপি সাহেবের উদ্যোগে আমরা ওই এলাকা থেকে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছি। চেষ্টা করছি সমস্ত অস্ত্র উদ্ধার করে সংঘর্ষ কীভাবে এড়ানো যায় সেটা করার। এ ব্যাপারে এলাকাবাসীরও সাড়া পাওয়া গেছে।’ মামলার ব্যাপারে ওসি বলেন, ‘মামলার ব্যাপারে তো আমাদের কিছু করার নেই। সেটাই আইনগতভাবেই সমাধান হবে।’