
ওপারে সারি সারি পাহাড়, নিচ থেকে চূড়া পর্যন্ত সবুজে ঢাকা। আকাশে থমকে আছে শ্রাবণের ঘন কালো মেঘ। দল বেঁধে ভেসে চলা মেঘ যেন এই বুঝি ঘাস ছুঁতে নেমে আসবে মাঠে!
এপারের ছোট সবুজ মাঠে গরু, মহিষ চরাচ্ছেন রাখাল। চারপাশে বুনো গন্ধ। পাশেই তিরতির করে বয়ে চলা নদীতে জলকেলিতে মেতেছে সাদা আর ছাইরঙা হাঁসেরা।
চলতি শ্রাবণের এক বিকেলে এমন দৃশ্য দেখা গেল সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার এক সীমান্তে, শূন্যরেখার ঠিক পাশে। ভারত সীমান্ত লাগোয়া বাংলাদেশ অংশের ওই এলাকার নাম মিনাটিলা।
মিনাটিলায় যেতে খুব বেশি কাঠখড় পোহাতে হয় না। সিলেট-তামাবিল আঞ্চলিক মহাসড়ক ধরে ৪ নম্বর বাংলাবাজার এলাকায় গিয়ে ডান পাশে একটি কাঁচা রাস্তা চলে গেছে; প্রথমে সোজা, পরে এঁকেবেঁকে। বাংলাবাজার থেকে দেড় কিলোমিটারের পথ। কখনো ইটের, কখনো কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে ঝিঙ্গাবাড়ি গ্রাম হয়ে পৌঁছাতে হয় মিনাটিলায়।
গ্রামের যেখানে শেষ, সেখান থেকে কয়েক শ গজ দূরেই ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ (শূন্যরেখা)। অবারিত সৌন্দর্যের কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক পর্যটক জায়গাটিকে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ বলেও উল্লেখ করছেন।
ফেসবুক-টিকটকে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এটি ‘ভাইরাল মাঠ’ নামেও পরিচিতি পেয়েছে। ওই অপূর্ব জায়গার বাঁ পাশে রাংপানি নদ। ডান দিকে গ্রাম, সবুজ গাছপালা, সবজিখেত আর বীজতলায় সদ্য গজানো ধানগাছের চারা।
সরেজমিন দেখা গেছে, সীমান্ত পিলারের ওপারে ভারতীয় অংশে সবুজে ঢাকা সারি সারি পাহাড় যেন সুউচ্চ প্রাকৃতিক বেষ্টনী তৈরি করে রেখেছে। এর পাদদেশে তারকাঁটার বেড়া। ভারতের ছাগলখাউরি নদ প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে এসে রাংপানি নাম ধারণ করেছে। রাংপানি নদে বারকি নৌকায় বালু পরিবহন করছিলেন শ্রমিকেরা। ভারত অংশের শেষ সীমান্তে মিকিরবস্তি গ্রাম। এর পাশেই ছাগলখাউরি নদ পারাপারে আছে ঝুলন্ত সেতু।
এদিকে বাংলাদেশের মিনাটিলা অংশের ছোট মাঠে আছে দুটি ফুটবল বার। আরেক পাশে নদের তীর ঘেঁষে গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। মাঠের এক কোণে বাঁশ-কাঠ দিয়ে বসার জন্য অস্থায়ী বেঞ্চও বানানো হয়েছে। এখানে বসে কিছু কিশোর-যুবক আড্ডা দিচ্ছিলেন। ওপারে তারকাঁটা লাগোয়া সড়ক ধরে হেঁটে চলছেন কয়েকজন মানুষ।
মিনাটিলার পাশেই আসামপাড়া গ্রাম। সে গ্রামের ক্রীড়া সংগঠক শাহ আবদুল জব্বার বলেন, আগে এখানে স্থানীয় মানুষ ছাড়া কেউ আসত না। এখন প্রতি ছুটির দিনে আশপাশের জেলার অনেকেই ছবি তুলতে আসেন। এখানে সৌন্দর্য আছে, কিন্তু শৌচাগার, রাস্তাসহ পর্যটনবান্ধব পরিবেশ নেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ। মিনাটিলা থেকে ফেরার আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবিটি মুঠোফোনে জানানো হয় জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুনন্দা রায়কে। তিনি বলেন, জায়গাটি এখনো পর্যটকদের কাছে খুব বেশি পরিচিত নয়। তবে এরপরও অনেকেই মিনাটিলায় বেড়াতে যান। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় কিছুটা বাধ্যবাধকতা আছে; তবে জায়গাটিকে কীভাবে পর্যটকবান্ধব করা যায়, এর পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ফেরার পথে বিকেলের আলো ফিকে হয়ে আসে। পাহাড়ের গায়ে মেঘ আরও ঘন হয়ে নামে। রাংপানির স্রোত তখনো একই ছন্দে বয়ে চলে।