
কক্সবাজার সদর উপজেলার ভারুয়াখালী এলাকার লবণের মাঠে কালো পলিথিন বিছানোর কাজ করছিলেন লবণচাষি মমতাজ মিয়া। বৃষ্টিতে মাঠে স্তূপ করে রাখা বেশির ভাগ লবণই নষ্ট হয়ে গেছে। যতটুকু আছে, সেসব বাঁচাতে কালো পলিথিন দিয়ে ঢাকছিলেন তিনি।
এ বছর লাভ কেমন থাকবে, জানতে চাইলে মমতাজ মিয়া তিক্ত কণ্ঠে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলে ওঠেন, আবার লাভ। লবণ বেচে সংসার চালানো দূরের কথা, ঋণ শোধও হবে না। তিনি বলেন, লবণ চাষের জন্য জমি ইজারা নিতে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এটি তিনি উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে জোগাড় করেছেন। এখন টানা বৃষ্টিতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া দামের জন্য লোকসান তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে লবণ বিক্রি করে লাভের আশা নেই। ঋণ শোধও হয় কি না, সেই আশঙ্কা আছে।
টানা বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ায় কক্সবাজার উপকূলের প্রায় ৬০ হাজার একর লবণমাঠে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। মৌসুমের শেষ সময়ে এমন পরিস্থিতিতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন প্রায় ৪২ হাজার প্রান্তিক চাষি। উৎপাদন বন্ধ থাকায় লোকসান গুনে অনেকেই সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
চাষিরা জানান, বৃষ্টির কারণে একবার লবণ উৎপাদন বন্ধ হলে পুনরায় শুরু করতে অন্তত ছয় থেকে সাত দিন সময় লাগে। এর আগে গত ৬ এপ্রিলের বৃষ্টিতেও টানা সাত দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। আর সর্বশেষ বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ২৭ এপ্রিল থেকে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্র জানায়, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের প্রভাবে সমুদ্র উত্তাল রয়েছে। কক্সবাজার উপকূলে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রাখা হয়েছে। অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান বলেন, আজ রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আকাশে অনেক মেঘ জমে রয়েছে। যেকোনো সময় অঝোর ধারায় বৃষ্টি, বজ্রপাতসহ ভারী বৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে। ভারী বর্ষণ হলে কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস হতে পারে।
লবণের মাঠ নিয়ে দুশ্চিন্তা
গত শুক্রবার সদর উপজেলার চৌফলদন্ডী, ভারুয়াখালী, পিএমখালী ও খুরুশকুল ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে কয়েক হাজার একর লবণমাঠ। গত ২৭ এপ্রিল বিকেল থেকে এসব এলাকায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
চৌফলদন্ডীর মাঝরপাড়ার চাষি আবদুল কাদের বলেন, বৃষ্টিতে লবণ উৎপাদন হয় না। তাই মাঠের পলিথিন সরিয়ে নিচ্ছেন। বৃষ্টি থামলে আবার পলিথিন বিছিয়ে লোনা পানি জমিয়ে রোদে শুকিয়ে লবণ উৎপাদন করতে হবে। একই ইউনিয়নের পূর্ব পাড়ার চাষি রফিকুল ইসলাম দুই একর জমিতে লবণ চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ৫ মাসে ১ হাজার ২০০ মণ উৎপাদন করেছেন। কিন্তু প্রতি মণ উৎপাদনে খরচ হয়েছে ২৮০ টাকা, বিক্রি করতে হয়েছে ২০০ থেকে ২১০ টাকায়। এখন আবার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। সব মিলিয়ে খরচের টাকাও উঠবে না।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে) কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীসহ বিভিন্ন উপজেলায় ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে বৃষ্টির কারণে প্রায় ৬০ হাজার একর মাঠে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
বিসিকের তথ্যমতে, জেলায় লবণ উৎপাদন, পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ১০ লাখ মানুষ। বর্তমানে চাষিদের কাছে মজুত রয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ মেট্রিক টন এবং মিল-কারখানায় আছে দেড় লাখ টন লবণ। সব মিলিয়ে এই মজুত দিয়েই দেশের চাহিদা পূরণ সম্ভব।
বিসিকের কক্সবাজার লবণ উন্নয়ন প্রকল্পের মাঠ পরিদর্শক মো. ইদ্রিস আলী জানান, ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত ৫ মাসে জেলায় ১৭ লাখ ৬৮ হাজার ৫৯৪ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯২ হাজার ৯০৯ মেট্রিক টন কম। চলতি মৌসুমে মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন। দেশে বার্ষিক লবণের চাহিদা ২৭ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন।
বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, মৌসুম শেষ হতে আরও প্রায় ১৫ দিন সময় রয়েছে। এ সময়ে বৃষ্টি না হলে উৎপাদন কিছুটা বাড়ানো সম্ভব। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে মৌসুম কার্যত শেষ হয়ে যেতে পারে।