‘সকাল থ্যাকি বসি থাকি একন খালি হাতে বাড়িত যাচ্ছি। টেকাও লিলো; কিন্তু তেল না দিয়া পরে টেকা ফিরায় দিলো। কত হাতে–পায়ে ধরনু, তা-ও দিলো না।’
বৃহস্পতিবার বিকেলে নাটোর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কার্যালয়ের সামনে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও টিসিবির পণ্য না পেয়ে এভাবে কথাগুলো বলছিলেন ৮২ বছর বয়সী শুকমন বেওয়া। তাঁর বাড়ি সদর উপজেলার হাপানিয়া গ্রামে। প্রায় সাত কিলোমিটার দূর থেকে বেলা ১১টায় এসে টিসিবির পণ্যের জন্য তিনি বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো আজ সদর উপজেলার পাঁচটি স্থানে পাঁচটি ট্রাকে দুই হাজার ভোক্তার মধ্যে খাদ্যপণ্য বিক্রি করা হয়। প্রতিজনকে ৫১০ টাকার প্যাকেজে এক কেজি করে ছোলা ও চিনি, দুই কেজি সয়াবিন তেল সরবরাহ করা হয়।
সম্ভাব্য স্থান হিসেবে সুবিধাভোগীদের জন্য শহরের হেলিপ্যাড মাঠ, মুক্তিযোদ্ধা কার্যালয়, পাসপোর্ট অফিস চত্বর, উপজেলা মডেল মসজিদ চত্বর ও চাঁনপুর বাজার এলাকায় দুই হাজার প্যাকেট খাদ্যপণ্য পাঠানো হয়। তবে কখন কোথায় ট্রাকে করে এসব খাদ্যপণ্য বিক্রি করা হবে, তা আগে থেকে না জানানোর কারণে শত শত অসহায় নারী-পুরুষ সকাল নয়টা থেকে সদর থানা মোড়, বাস মালিক সমিতির কার্যালয় ও উত্তরা ব্যাংকের সামনে জড়ো হয়েছিলেন।
সন্ধ্যা পৌনে ছয়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও সদর থানা মোড়, বাস মালিক সমিতির কার্যালয় ও উত্তরা ব্যাংকের সামনের কয়েক শ মানুষ খাদ্যপণ্য কিনতে না পেরে হতাশ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। তাঁদের মধ্যে ববি খাতুন (৪২), তাহেরুন বেওয়া (৬২), এমদাদ হোসেন (৪৩), মীর মোহাম্মদ মুনসুর (৬৫), হাজ্জাজ খাঁ (৬৬), আকাশ আলী (১২) ও ওমর ফারুকের (১৩) সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের।
ববি খাতুন ছাড়া অন্যরা কমপক্ষে আট কিলোমিটার দূর থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবি পণ্য কিনতে এসেছেন। হাজ্জাজ খাঁ বলেন, ‘আজই প্রথম তেল-ছুলা কিনতে আইচুনু। পাঁচ ঘণ্টা বসি থাকার পর শুনছি একানে দিবি না। রোজা মুকে রোদের মধ্যে দাঁড়ায় থাকি লাভ তো হলোই না; বরং ৫০ টেকা ভ্যানভাড়া লস হলি।’
তাহেরুন বেওয়া বলেন, তিনি এক দিন আগে এক প্যাকেট খাদ্যপণ্য কিনেছেন। সেটা ছেলের বউকে দিয়েছেন। আজ নিজের জন্য নিতে এসেছেন। ববি খাতুন তৃতীয়বারের মতো নিতে এসেছেন। কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘এটা (টিসিবি) তো বন্ধ হয়া যাবি। তাই লিয়া মজুত করছি।’
মুক্তিযোদ্ধা কার্যালয়ের সামনের ট্রাকের ট্যাগ অফিসার ও সরকারি গণগ্রন্থাগারের কর্মকর্তা সাজু আহম্মেদ বলেন, ‘আমি ২০ দিন এই মানবিক কাজে জড়িত ছিলাম। প্রতি ট্রাক থেকে ৪০০ জনের কাছে পণ্য বিক্রি করা যায়। এতে ভিড় হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কিছু দুষ্ট মানুষ ট্রাকের কাছে এসে ভিড় করে বিশৃঙ্খলা করে।’ পণ্য বিক্রির স্থান ও সময় না জানানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা করা হলে ভিড় আরও বাড়বে। অনিয়ম করে পণ্য কেনার প্রবণতা বাড়বে। তাই আগে থেকে এসব জানানো হয় না। এতে কিছু মানুষের ভোগান্তি হয় সত্য।’