বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টা। শিশু রোগীতে ঠাসা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড। অভিভাবকেরা ব্যস্ত অসুস্থ সন্তানদের যত্নে। কোনো মা তাঁর আদরের সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। কেউ আবার চেষ্টা করছেন শিশুকে খাওয়ানোর।
এর মধ্যে হঠাৎ এক মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো ওয়ার্ডের পরিবেশ। অন্যরা তখন বলতে শুরু করেন, এই যে আরেক মায়ের বুক খালি হলো।
কান্নার আওয়াজ আসা কেবিনটির সামনে গিয়ে দেখা যায়, একজন নারী চিকিৎসক শিশুটির মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। আবদুল্লাহ নামের শিশুটি মারা গেছে—চিকিৎসক এমনটি জানানোর পর আহাজারি করা মা আরিফা আক্তার বলতে থাকেন, ‘আমার বুকের ধনরে ফিরায়া দেও আল্লাহ। আমার ছেলে কী আর হাসত না। জ্বর নিয়া হাসপাতালে ভর্তি হইছিলাম, মেডামরা কইছে ওষুধ খাইলেই ভালা হয়া যাইব। আল্লাহগো তুমি কী করলা।’
সন্তান হারানো আরিফা আক্তারের কান্না ছুঁয়ে যায় আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা অন্য শিশুর স্বজনদের। আতঙ্কিত হয়ে কোনো কোনো মা-বাবা তাঁর শিশুকে কোলে তুলে পায়চারি করতে থাকেন। কেউ আবার এগিয়ে আসেন আরিফাকে সান্ত্বনা দিতে।
হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২ এপ্রিল ভর্তি করা হয়েছিল ময়মনসিংহ নগরের জামতলা মোড় এলাকার মো. রনি ও আরিফা আক্তার দম্পতির তিন বছর বয়সী ছেলে আবদুল্লাহকে। শিশুটি আরও কিছু শারীরিক জটিলতায় ভুগছিল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গতকাল বুধবার সকাল ৮টা থেকে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হামের লক্ষণ নিয়ে নতুন করে ২৬টি শিশু ভর্তি হয়েছে। ৬৪ শয্যার (প্রতি শয্যায় দুজন শিশু ধরে) ওয়ার্ডে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৭৬ শিশু। গত ১৭ মার্চ থেকে আজ সকাল পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয় মোট ৩২৪টি শিশু। এর মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ২৩৯ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৯টি শিশুর। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে আরও ২৬ শিশু।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন দুই শিশুর মৃত্যু হয়। মৃত্যুবরণ করা দুই শিশু হলো নেত্রকোনা সদরের ইলিয়াস হোসেনের তিন মাস বয়সী মেয়ে আদিবা ও ত্রিশাল উপজেলার মো. রাসেল মিয়ার ছেলে ৮ মাস বয়সী ছেলে আরাফাত। গত ১৭ মার্চ হামের লক্ষণ নিয়ে ৩ মাস বয়সী আদিবাকে ভর্তি করা হয়েছিল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সকাল আটটার দিকে মৃত্যু হয়। আট মাস বয়সী আরাফাতকে গত ১৮ মার্চ ভর্তি করা হলে গতকাল সকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে মারা যায়। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় আরও এক শিশুর মৃত্যুর হিসাব ধরলে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ জনে।