পুকুরের ডুবে নিহত চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অর্ণব সাহায় মায়ের আহাজারি। গতকাল মধ্যরাতে ফেনী শহরের রেলগেট এলাকার মিদ্দাবাড়ি সড়কে তোলা
পুকুরের  ডুবে নিহত চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অর্ণব সাহায় মায়ের আহাজারি।  গতকাল মধ্যরাতে ফেনী শহরের রেলগেট এলাকার মিদ্দাবাড়ি সড়কে তোলা

চুয়েট শিক্ষার্থীর লাশের পাশে মায়ের আহাজারি, ‘এত তাড়াতাড়ি কেন ঘুমিয়ে পড়লি বাবা’

‘আমার ছেলে নিচে শুয়ে আছে কেন। তার তো ঠান্ডা লাগবে। সে তো ঠান্ডা সহ্য করতে পারে না। আমার ছেলে কেন চিত হয়ে শুয়ে আছে, সে তো কাত হয়ে শোয়। এত তাড়াতাড়ি কেন ঘুমিয়ে পড়লি বাবা, এখনো তো রাত তিনটা হয়নি। তুই তো রাত তিনটার আগে ঘুমাস না।’

ছেলের লাশের সামনে বিলাপ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন মা নেলি সাহা। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুকুরে ডুবে তাঁর ছেলের মৃত্যু হয়েছে। এরপর দিবাগত রাত পৌনে দুইটার দিকে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সে তাঁর ছেলের লাশ ফেনীর বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানেই তিনি বিলাপ করতে করতে কথাগুলো বলেন।

পুকুরে ডুবে নিহত ছেলের নাম অর্ণব সাহা (২২)। তিনি চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আবাসিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলে থাকতেন। বন্ধুদের সঙ্গে গোসলে নেমে হল–সংলগ্ন একটি পুকুরেই তাঁর মৃত্যু হয়।

অর্ণব ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু গতকাল সন্ধ্যা সাতটার দিকে হল–সংলগ্ন পুকুরে গোসল করতে নামেন। একপর্যায়ে অন্য সহপাঠীরা খেয়াল করেন অর্ণবের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় ২০ মিনিট পর পুকুরঘাটের পাশে এক শিক্ষার্থী অর্ণবের মরদেহ খুঁজে পান।

অর্ণব সাহার বাবার নাম প্রবীর রঞ্জন সাহা। তাঁর গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলায়। তবে চাকরির সুবাদে প্রবীর রঞ্জন সাহা দীর্ঘ তিন দশক ধরে ফেনীর রেলগেট এলাকার মিদ্দাবাড়ি সড়কে ভাড়া বাসায় থাকেন। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে অর্ণব ছিল ছোট। আজ বুধবার সকালে ফেনী পৌর মহাশ্মশানে অর্ণবের শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।

দিবাগত রাত পৌনে দুইটার দিকে অ্যাম্বুলেন্স দেখেই ঘর থেকে ছুটে আসেন নেলি সাহা। পরে অর্ণবের মরদেহ ঘরের ড্রয়িংরুমের মেঝেতে রাখা হয়। এরপর ছেলের মরদেহের পাশে বসে বুক চাপড়ে আহাজারি করেন নেলি সাহা। তিনি বলেন, ‘তুই তো সাঁতার জানতি না। কেন পুকুরে নামলিরে বাপ। এই জীবনে আমার ছেলেটা কিছুই পেল না। ভগবান আমার ছেলের আত্মার সদ্‌গতি করিয়ো।’

পুকুরে ডুবে নিহত চুয়েট শিক্ষার্থী অর্ণব সাহা

যেভাবে বড় হয়েছিলেন অর্ণব

অর্ণবের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী হলেও অর্ণবের জন্ম হয় ফেনী শহরে। তিনি ২০১৯ সালে ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ–৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। এরপর তাঁকে রাজধানীর সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তি করা হয়। ২০২১ সালে তিনি ওই কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসিতে জিপিএ–৫ পান। পরে ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন অর্ণব। তিনি ওই বিভাগের সপ্তম সেমিস্টারে অধ্যয়নরত ছিলেন। পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত টিউশনি করে হাতখরচের অর্থ জোগাড় করতেন।

নিহত অর্ণবের স্বজন অপূর্ব সাহা বলেন, অর্ণব সাহার বাবা একজন আদর্শ শিক্ষক ছিলেন। তিনি ফেনী ইনস্টিটিউট অব কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (আইসিটি) কয়েক দশকের শিক্ষকতা শেষে বর্তমানে অবসরে রয়েছেন। নিজে অর্থবিত্তের তেমন মালিক না হলেও ছোট্ট একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করে সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার চেষ্টা করেছেন। ছেলের হঠাৎ মৃত্যুর সংবাদ শুনে বাবা বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।

প্রাইমারি স্কুল থেকে অর্ণবের সহপাঠী ছিলেন অর্ঘ সাহা। বন্ধুর মৃত্যুর সংবাদ শুনে রাতেই বাড়ি ছুটে এসেছেন। অর্ঘ সাহা বলেন, ‘অর্ণব খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলাও নিয়মিত করত। এসএসসি পরীক্ষার পর আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলাদা হয়ে গেলেও বন্ধুত্ব অটুট ছিল। হঠাৎ তার এমন মৃত্যুর সংবাদ শুনব, আমরা ভাবতেই পারিনি।’

অর্ণবের প্রতিবেশী মাহবুবুল হক ওরফে দোলন বলেন, ‘আমাদের পাড়ার গোলাম ফারুক বাচ্চুর বাড়িতে প্রায় আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে অর্ণবরা বসবাস করে আসছিল। তার মতো এমন নম্র ও ভদ্র ছেলে খুঁজে পাওয়া বিরল। এলাকায় অর্ণব ও তার বাবার দীর্ঘদিনের সুনাম রয়েছে। এমন একটি মেধাবী ছেলেকে হারিয়ে আমরা বাক্‌রুদ্ধ।’

২০১৯ সালে ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ–৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন অর্ণব। এরপর তাঁকে রাজধানীর সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তি করা হয়। ২০২১ সালে তিনি ওই কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসিতে জিপিএ–৫ পান। পরে ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন অর্ণব।

পুকুরে নেমেই নিখোঁজ অর্ণব

প্রতিদিন ক্লাস শেষে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টিউশনি করতেন অর্ণব ও তাঁর সহপাঠীরা। টিউশনি শেষ করে অর্ণব ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু গতকাল সন্ধ্যা সাতটার দিকে হল–সংলগ্ন পুকুরে গোসল করতে নামেন। একপর্যায়ে অন্য সহপাঠীরা খেয়াল করেন অর্ণবের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। পরে প্রায় ২০ মিনিট পর পুকুরঘাটের পাশে এক শিক্ষার্থী অর্ণবের মরদেহ খুঁজে পান।

অর্ণবের রুমমেট রাফিউল আদনান বলেন, ‘অর্ণব সাহা প্রতিদিন টিউশনি করে সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে ফিরত। আজ রুমে এসে সে তালা লাগানো দেখে আমাকে কল করে। আমার আসতে দেরি হচ্ছে দেখে পাশের রুমে তার মুঠোফোন ও মানিব্যাগ রেখে সাতটার দিকে হল–সংলগ্ন পুকুরে গোসল করতে নামে। আগে কখনো তাকে সন্ধ্যায় পুকুরে নামতে দেখিনি ও শুনিনি।’

অপর সহপাঠী সুব্রত মণ্ডল বলেন, ‘অর্ণব আর আমি একই হলে থাকতাম। সে তৃতীয় তলায় থাকত, আর আমি দ্বিতীয় তলায় থাকতাম। পুকুরের দুটি ঘাট রয়েছে। ঘাটে সব সময় ৮ থেকে ১০ শিক্ষার্থী আড্ডা দেন। অর্ণব যখন পানিতে ডুবে যাচ্ছিল, তখন ঘাটে থাকা তার সহপাঠী কেন পানি থেকে তাকে তোলার চেষ্টা করল না, এটি সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হয়তো উপস্থিত শিক্ষার্থীরা বিষয়টি দেখেনি, আর দেখলেও হয়তো অনেকে এড়িয়ে গেছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক রাজেশ দেব বলেন, ‘পুকুরে ডুবে যাওয়া অর্ণবকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে নিয়ে এলে আমরা সব যন্ত্রপাতি নিয়ে প্রস্তুত ছিলাম। সিপিআর (জরুরি জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাপদ্ধতি) দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বেঁচে থাকার কোনো লক্ষণ খুঁজে পাইনি। বেশ কিছুক্ষণ পানির নিচে ছিল। তাই আগেই মারা গেছে।’

শেষবিদায়ের সঙ্গী হলো সহপাঠী ও শিক্ষকেরা

নিহত অর্ণব সাহার শেষকৃত্যে যোগ দিতে রাতেই চুয়েট থেকে দুটি বাসে প্রায় ৭০ সহপাঠী তাঁর ফেনীর বাসায় আসেন। তাঁরা এসে অর্ণবের মা–বাবাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক তানভীর মাহমুদ ও মো. ফারহান ইমতিয়াজ এসেছিলেন।

অর্ণবের রুমমেট মো. আনাস বিন হোসাইন বলেন, ‘আমাদের রুমে চারজন থাকতাম। সে সব সময় পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করত। সিজিপিএ–৪.০০–এর মধ্যে ছয় সেমিস্টার পর্যন্ত তার ফল ৩.৬০–এর বেশি ছিল। সে মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের “এসরে” ক্লাবের জিএস হিসেবে দায়িত্বে ছিল।’

সহপাঠী মো. রুয়াইম হোসেন বলেন, ‘অর্ণবের শেষকৃত্য শেষে আমরা আবার চুয়েটের উদ্দেশে রওনা দেব। অর্ণবের এ বিদায় আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারব না। তার শেষবিদায়ে পাশে থাকতে পেরে কিছুটা হলেও মনের ভার কমেছে।’