দেয়াঙ পাহাড় না রংমহল পাহাড়—চট্টগ্রামের পণ্ডিতবিহার কোথায় ছিল

প্রাচীন পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডেই অবস্থিত ছিল—এ বিষয়ে ইতিহাসবিদেরা মোটামুটি একমত। আর এটির অবস্থান চট্টগ্রামেই ছিল বলে তাদের ধারণা। তবে এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে রয়েছে মতভেদ। একদল গবেষকের মতে, দশম শতাব্দীতে (মতান্তরে অষ্টম শতকে) চট্টগ্রাম নগরের রংমহল পাহাড় এলাকায়, বর্তমান জেনারেল হাসপাতাল–সংলগ্ন স্থানে এটির প্রতিষ্ঠা হয়। অন্যদিকে কেউ কেউ পটিয়ার চক্রশালা, আনোয়ারার দেয়াঙ পাহাড় কিংবা সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড় এলাকাকে পণ্ডিতবিহারের সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন; কিন্তু আসলে কোথায় ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর দেয়াঙ পাহাড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও অনুসন্ধানকাজ চলাকালীন দেয়াল ও মেঝের অবয়ব ফুটে ওঠে
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

দূর থেকে দেখলে মনে হতো পাহাড়ঘেরা এক শান্ত শিক্ষানগরী। সবুজ পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে ছিল লালচে ইটের স্থাপনা, ধ্যানকক্ষ, পাঠশালা ও আবাসিক বিহার। সকালবেলায় ঘণ্টাধ্বনি আর বৌদ্ধ মন্ত্রপাঠের সুরে মুখর থাকত চারপাশ। বিশাল প্রাঙ্গণ ঘিরে সারিবদ্ধ কক্ষগুলোতে চলত পাঠদান। ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত ভিক্ষু, পণ্ডিত ও শিক্ষার্থীদের পদচারণে প্রাণবন্ত হয়ে উঠত প্রাচীন পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়।

ইতিহাসগ্রন্থগুলোর বর্ণনা বিশ্লেষণ করলে পণ্ডিতবিহারকে অনেকটা এমন শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করা যায়। বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, এর স্থাপত্য ও শিক্ষাকাঠামোয় তৎকালীন প্রাচীন বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সুস্পষ্ট প্রভাব ছিল। নালন্দা ও বিক্রমশীলার আদলে এখানে আবাসিক ব্যবস্থাসহ বিষয়ভিত্তিক শিক্ষালয় পরিচালিত হতো। ধারণা করা হয়, অন্তত ১৮টি পৃথক শিক্ষাকেন্দ্র নিয়ে গড়ে উঠেছিল পুরো প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি বিহারে শিক্ষক, ভিক্ষু ও শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল স্বতন্ত্র আবাসন ও পাঠব্যবস্থা।

প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডেই অবস্থিত ছিল—এ বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মোটামুটি ঐকমত্য থাকলেও এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে রয়েছে মতভেদ। একদল গবেষকের মতে, দশম শতাব্দীতে (মতান্তরে অষ্টম শতকে) চট্টগ্রাম নগরের রংমহল পাহাড় এলাকায়, বর্তমান জেনারেল হাসপাতাল–সংলগ্ন স্থানে এর প্রতিষ্ঠা হয়। অন্যদিকে কেউ কেউ পটিয়ার চক্রশালা, আনোয়ারার দেয়াঙ পাহাড় কিংবা সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড় এলাকাকে পণ্ডিতবিহারের সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

গবেষকদের মতে, পাল সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক ধর্মপালের শাসনামলেও পূর্ব বাংলায় বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক বিকাশ ঘটে। অষ্টম শতকে তিনি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে সাম্রাজ্যকে উত্তর ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। বৌদ্ধধর্মের গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি বহু বিহার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তাঁর আমলে বাংলায় জ্ঞানচর্চা, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব ও আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ যোগাযোগের প্রসার ঘটে। সেই সময় বাংলার বিভিন্ন বিহার তিব্বত, নেপাল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে জ্ঞান বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য–গবেষক আহমদ শরীফ তাঁর ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, নালন্দাবিহারের প্রভাব কমে আসার পর চট্টগ্রাম বৌদ্ধধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁর মতে, চট্টগ্রামের পণ্ডিতবিহারের খ্যাতি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিস্তৃত ছিল। লোকশ্রুত অনুযায়ী, এ বিহার সীতাকুণ্ড বা চক্রশালা এলাকায় অবস্থিত ছিল। এ ছাড়া পণ্ডিতবিহার ও তীর্থিকদের সঙ্গে বৌদ্ধভিক্ষুদের শাস্ত্রীয় বিতর্কের বর্ণনা থেকে ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকেই চট্টগ্রাম বিদ্যাচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল।

ইতিহাস গ্রন্থে রংমহল পাহাড়ে ইঙ্গিত

পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থে চট্টগ্রামের নামই বারবার উঠে এসেছে। বিশেষ করে নগরের রংমহল পাহাড়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ঐতিহাসিক মত গড়ে উঠেছে। চট্টল তত্ত্ববিদ আবদুল হক চৌধুরী তাঁর ‘বন্দর শহর চট্টগ্রাম’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ১৯০১ সালে রংমহল পাহাড়ের শীর্ষভাগ সমতল করে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ত্রিতল ভবন নির্মাণের সময় মাটি খনন করতে গিয়ে একাধিক বুদ্ধমূর্তি উদ্ধার করা হয়। এসব নিদর্শনের ভিত্তিতে গবেষক শরচ্চন্দ্র দাশ মত দেন, রংমহল পাহাড়ের শীর্ষেই সম্ভবত দশম শতকের পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

কলকাতা থেকে প্রকাশিত কমল চৌধুরী সম্পাদিত ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থেও রংমহল পাহাড়ের প্রত্ননিদর্শনের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার লিখেছেন, ১২৬৬ মগাব্দে (সম্ভাব্য ১৯০৪ সালে) রংমহল পাহাড়ে মৃত্তিকা খননের সময় চার থেকে পাঁচ হাত মাটির নিচে কালো প্রস্তরের একটি বুদ্ধমূর্তি পাওয়া যায়। একই সঙ্গে মাটির অভ্যন্তরে প্রাচীন আমলের কালো বর্ণের অবিকৃত পূজাসামগ্রীও উদ্ধার হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আবদুল হক চৌধুরীর বর্ণনায়, পণ্ডিতবিহারের প্রধান অধ্যক্ষ ছিলেন পটিয়ার চক্রশালার ব্রাহ্মণসন্তান তিলপাদ। তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের পর তিনি প্রজ্ঞাভদ্র নাম ধারণ করেন। বলা হয়, মগধের প্রধান আচার্য নরতোপা চট্টগ্রামের পণ্ডিতবিহারে এসে তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। এ ছাড়া লুই পা, সবরি পা ও লাড়কা পাসহ তৎকালীন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ও পণ্ডিতেরা অধ্যাপক বা পরিদর্শক হিসেবে এই বিহারে আসতেন। গবেষকদের ধারণা, জ্ঞানচর্চা ও পণ্ডিতসমাবেশের কারণেই এ প্রতিষ্ঠানের নাম হয়েছিল ‘পণ্ডিতবিহার’।

গবেষকদের মতে, পাল সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক ধর্মপালের শাসনামলেও পূর্ব বাংলায় বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক বিকাশ ঘটে। অষ্টম শতকে তিনি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে সাম্রাজ্যকে উত্তর ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। বৌদ্ধধর্মের গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি বহু বিহার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তাঁর আমলে বাংলায় জ্ঞানচর্চা, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব ও আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ যোগাযোগের প্রসার ঘটে। সেই সময় বাংলার বিভিন্ন বিহার তিব্বত, নেপাল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে জ্ঞান বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।

ইতিহাসবিদদের মতে, পণ্ডিতবিহারের তান্ত্রিক বৌদ্ধ পণ্ডিতেরা দেব–দেবীর কল্পনা, মণ্ডল অঙ্কন, মন্ত্র ও স্তোত্র রচনাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ প্রণয়নে যুক্ত ছিলেন। তবে পণ্ডিতবিহারের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে এখনো মতভেদ রয়েছে। একাংশের মতে, এটি বর্তমান আন্দরকিল্লা বা জেনারেল হাসপাতাল এলাকায় অবস্থিত ছিল। অন্যদিকে কেউ কেউ পটিয়ার চক্রশালা, সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়, আনোয়ারার দেয়াঙ পাহাড় কিংবা ঝিয়রী এলাকাকে সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এসব ঐতিহাসিক বর্ণনা ও প্রত্ননিদর্শন বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, রংমহল পাহাড়ে উদ্ধার হওয়া বুদ্ধমূর্তি ও অন্যান্য নিদর্শন পণ্ডিতবিহারের অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ ভিত্তিতে রংমহল পাহাড়কে কেন্দ্র করে ঐতিহাসিক মত গড়ে উঠলেও এখনো এমন নির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যার ভিত্তিতে এটিকেই পণ্ডিতবিহারের অবস্থান হিসেবে ঘোষণা করা সম্ভব। তবে গবেষকদের মতে, নিশ্চিত না হলেও সম্ভাবনার তালিকা থেকে রংমহল পাহাড়কে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।

খননকাজ শুরু হলেও দেয়াঙ পাহাড়ের অনুসন্ধান থেকে আছে। হয়নি কার্বন ১৪ পরীক্ষাও। ফলে জানা যায়নি এই স্থাপনার বয়স। আর এটি যে পণ্ডিত বিহার সে বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া যায়নি

দেয়াঙ পাহাড়ে ধ্বংসাবশেষ

চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার বিস্তৃত দেয়াঙ পাহাড় অঞ্চলকে ঘিরে প্রাচীন জনপদের একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক পরিসর গড়ে উঠেছে। গবেষণা ও বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়, ১৫১৮ সালে পর্তুগিজ বণিকদের আগমনের পর তারা প্রথম এই দেয়াঙ এলাকাতেই বসতি স্থাপন করে। পরবর্তী সময়ে ১৫৩৭ সালের দিকে এখানে কুঠি ও গির্জা নির্মিত হয়। ১৬৬৬ সালের ২৬ জানুয়ারি মোগল বাহিনীর চট্টগ্রাম দখলের মাধ্যমে মগ শাসনের অবসান ঘটে, যার ফলে ওই অঞ্চলের বহু স্থাপনা যুদ্ধ ও অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে ধারণা করা হয়।

ঐতিহাসিক সূত্রে ইতালীয় পর্যটক ভারথেমা ও বারবোসার ভ্রমণকাহিনিতে বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী ‘সিটি অব বেঙ্গল’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। গবেষক সুনীতিভূষণ কানুনগোর মতে, ১৫৩৭ সালে দেয়াঙে গড়ে ওঠা পর্তুগিজ বাণিজ্যকেন্দ্রকে ঘিরেই ওই নগরী বা জনপদের বিকাশ ঘটেছিল।

প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে এই অঞ্চলের গুরুত্বও একাধিকবার সামনে এসেছে। ১৯২৭ সালে আনোয়ারার দেয়াঙ পাহাড়ের ঝিউরি ও হাজীগাঁও এলাকা থেকে ৬৬টি পিতলের বুদ্ধমূর্তি উদ্ধার করা হয়, যা এই এলাকায় প্রাচীন বৌদ্ধসভ্যতার উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয় বলে গবেষকদের একটি অংশ মনে করেন।

আরও সাম্প্রতিক সময়ে—২০২৩ সালে কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান ইউনিয়নের একটি পাহাড়ি টিলায় খননকাজে কিছু স্থাপত্যিক কাঠামোর সন্ধান মেলে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে পরিচালিত ওই খননে তিনটি প্রশস্ত দেয়াল ও তিনটি মেঝের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণে খননকাজ স্থগিত করা হয়।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য–গবেষক আহমদ শরীফ তাঁর ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, নালন্দাবিহারের প্রভাব কমে আসার পর চট্টগ্রাম বৌদ্ধধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁর মতে, চট্টগ্রামের পণ্ডিতবিহারের খ্যাতি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিস্তৃত ছিল। লোকশ্রুত অনুযায়ী, এ বিহার সীতাকুণ্ড বা চক্রশালা এলাকায় অবস্থিত ছিল। এ ছাড়া পণ্ডিতবিহার ও তীর্থিকদের সঙ্গে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের শাস্ত্রীয় বিতর্কের বর্ণনা থেকে ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকেই চট্টগ্রাম বিদ্যাচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল।

এর আগে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী অঞ্চলে প্রস্তাবিত পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয় পুনর্গঠন এবং একটি জাদুঘর স্থাপনের সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করে দেশি-বিদেশি একটি দল। সেই দলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক জিনবোধি ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত।

জিনবোধি ভিক্ষুর মতে, দেয়াঙ পাহাড়ের বিশ্বমুড়া এলাকায় একসময় আরাকান রাজা রাজ বিক্রমের প্রাসাদ ছিল এবং আনোয়ারা–কর্ণফুলী অঞ্চলের ঝিওরি, হাজীগাঁও, বটতলী, বড়উঠান ও জুলধা এলাকাজুড়ে সপ্তম–অষ্টম শতকে পাল সম্রাট ধর্মপালের পৃষ্ঠপোষকতায় পণ্ডিতবিহার নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল, যা পরে ষোড়শ শতকের দিকে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায় বলে তাঁর দাবি।

তবে সামগ্রিকভাবে গবেষকরা মনে করেন, দেয়াঙ পাহাড় ঘিরে একটি প্রাচীন বৌদ্ধ ও নগর সভ্যতার সম্ভাবনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। পর্তুগিজ বসতি, মোগল আক্রমণ এবং পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞ এই অঞ্চলের প্রাচীন স্থাপত্যিক ধারাবাহিকতাকে আড়াল করে দিয়েছে। ১৯২৭ সালের বুদ্ধমূর্তি উদ্ধার এবং ২০২৩ সালের খননে পাওয়া স্থাপত্যিক কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হলেও এগুলো এখনো পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বের চূড়ান্ত ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

কার্বন-১৪ পরীক্ষার অপেক্ষা

খননকাজে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম জেলায় এটিই ছিল প্রথম বড় আকারের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন। বগুড়ার মহাস্থানগড় এলাকা থেকে অভিজ্ঞ শ্রমিকদের একটি দল এবং দুজন কর্মকর্তা এই খনন কার্যক্রমে যুক্ত হন। প্রাথমিক পর্যায়ে সংগৃহীত কিছু নমুনা পরীক্ষার জন্য সংরক্ষণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়নি।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এর মূল কারণ ছিল দেশে তখন কার্বন-১৪ ডেটিং পরীক্ষার পর্যাপ্ত সুবিধার অভাব। এ পদ্ধতিতে সাধারণত কাঠ, হাড়, বীজ বা পোড়া জৈব পদার্থের মতো নমুনায় থাকা কার্বন-১৪ আইসোটোপ ক্ষয়ের হার বিশ্লেষণ করে কোনো প্রত্নস্থানের বয়স নির্ধারণ করা হয়। জীবিত অবস্থায় কোনো বস্তুর মধ্যে যে পরিমাণ কার্বন-১৪ থাকে, মৃত্যুর পর তা ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। সেই ক্ষয়ের মাত্রা পরিমাপ করেই সময়কাল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।

প্রত্নতত্ত্ববিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নমুনাগুলো সংগ্রহ করা হলেও সেগুলো বিদেশে পাঠিয়ে পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া তখন সম্পন্ন হয়নি। ফলে খননকালে পাওয়া স্থাপত্যিক কাঠামো ও অন্যান্য নিদর্শনের সুনির্দিষ্ট বয়স নির্ধারণ এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, কার্বন-১৪ ডেটিং সাধারণত ফ্রান্সের নির্দিষ্ট পরীক্ষাগারে সম্পন্ন হয়। সংগ্রহ করা নমুনা পাঠানো হলেও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তা বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে ওই স্থাপনার বয়স নির্ধারণ এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

কার্বন-১৪ পরীক্ষা না হওয়ায় দেয়াঙ পাহাড়ে পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান এখনো সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে একাধিক ইতিহাসবিদ ও গবেষকের মতে, প্রাপ্ত প্রত্নসূত্র এবং ঐতিহাসিক বর্ণনা এই অঞ্চলকেই সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে নির্দেশ করছে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আনন্দ বিকাশ চাকমা। তিনি বলেন, বিদ্যাপীঠটি চট্টগ্রামেই ছিল এটি মোটামুটি নিশ্চিত। ইতিহাস গ্রন্থগুলোতেও এই পাহাড়ের দিকে ইঙ্গিত করছে।

অধ্যাপক আনন্দ বিকাশ চাকমা বলেন, কিছু চীনা ও থাই ঐতিহাসিক নথিতেও এই প্রাচীন বিদ্যাপীঠের অবস্থান দেয়াঙ পাহাড় এলাকায় ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়, যা বিভিন্ন গবেষকের মতকে আরও শক্ত ভিত্তি দেয়। তবে তিনি একই সঙ্গে মনে করেন, বিষয়টি চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। পাশাপাশি বৈজ্ঞানিকভাবে কার্বন-১৪ ডেটিংসহ অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক পরীক্ষা সম্পন্ন হলে এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক অবস্থান সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে।