তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে পৌঁছানোর পর জাতীয় পতাকা হাতে ফাহিম মুনতাসির
তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে পৌঁছানোর পর জাতীয় পতাকা হাতে ফাহিম মুনতাসির

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, সচেতনতার বার্তা দিয়ে হাঁটলেন এক হাজার কিলোমিটার

২১ দিন আগে টেকনাফের শাপলা জিরো পয়েন্ট থেকে হাঁটা শুরু করেছিলেন ফাহিম মুনতাসির। গত বৃহস্পতিবার সকালে যখন দেশের উত্তর প্রান্ত তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে পৌঁছান, তখন তাঁর পেছনে পড়ে ছিল ১ হাজার ২০ কিলোমিটারের বেশি পথ। ‘কালো ধোঁয়া আর নয়, হেঁটেই করব দূরত্ব জয়’—এই বার্তা ছড়িয়ে দিতে পুরো পথ পাড়ি দিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২৬ বছর বয়সী এই তরুণ।

ফাহিম ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মধ্যপাড়া এলাকার মফিজ মিয়ার ছেলে। রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন তিনি। গত ১০ জুলাই যাত্রা শুরুর পর কখনো মহাসড়ক, কখনো গ্রামীণ পথ আবার কখনো সমুদ্রপাড় ধরে হেঁটে ১৫টি জেলা অতিক্রম করেন তিনি।

সচেতনতার বার্তা নিয়ে পদযাত্রা

মানুষকে হাঁটতে উৎসাহিত করা, বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে ব্যতিক্রমী এই পদযাত্রায় নামেন ফাহিম মুনতাসির। শুরুতে ফাহিমের সঙ্গে ছিলেন ফাইয়াজ ফারসিদ (মুবিন) ও প্রণব দেবনাথ। কিন্তু ফেনীতে পৌঁছানোর পর ক্লান্তি ও ব্যক্তিগত কারণে তাঁরা ফিরে যান। এরপর একাই পথ চলতে থাকেন তিনি।

ফাহিম মুনতাসিরের সঙ্গে হাঁটেন টাঙ্গাইল পিটিআইয়ের ইনস্ট্রাক্টর রাজীব মাহবুব ও তাঁর স্ত্রী নূপুর

যাত্রাপথে কখনো পরিচিতজনের বাসায়, কখনো হোটেলে, আবার কখনো শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় রাত কাটিয়েছেন ফাহিম। বিভিন্ন স্থানে তাঁর সঙ্গে কিছু দূর হেঁটেছেন টাঙ্গাইল পিটিআইয়ের ইনস্ট্রাক্টর রাজীব মাহবুব ও তাঁর স্ত্রী নূপুর, চট্টগ্রামের দৌড়বিদ ও সাইক্লিস্ট সাইদুর রহমান (সাকিব), বন্ধু রিয়াজুল মোর্শেদ, সাংবাদিক শফিকুল ইসলামসহ অনেকে।

ফাহিমের বিশ্বাস, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন বড় কোনো উদ্যোগের অপেক্ষায় থাকে না; একজন মানুষের ছোট ছোট উদ্যোগও অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।

শুরুতেই ছিল চ্যালেঞ্জ

১০ জুলাই সকাল সাড়ে নয়টায় টেকনাফের শাপলা জিরো পয়েন্ট থেকে যাত্রা শুরুর পর মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত হাঁটেন ফাহিম। প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে উখিয়ায় পৌঁছান। দ্বিতীয় দিনে প্রায় ৬০ কিলোমিটার হেঁটে চকরিয়ায় রাত কাটান। তৃতীয় দিনে কেরানীরহাট পর্যন্ত প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে একটি হোটেলে রাত কাটান। পথে বারবার খাওয়ার স্যালাইন খেয়েছেন এবং বিশ্রাম নিয়েছেন তিনি।

ফাহিম বলেন, যাত্রার প্রথম কয়েক দিনেই পায়ে কাঁটার আঘাত লেগে একাধিকবার ব্যান্ডেজ করতে হয়েছে। তবে পা ফুলে যায়নি। ছোটবেলা থেকে হাঁটার অভ্যাস ছিল। আগে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার হাঁটতেন। এই যাত্রায় প্রতিদিন রাত ১১টার দিকে ঘুমিয়ে সকালে আবার হাঁটা শুরু করতেন।

হাঁটার মাধ্যমে জ্বালানির ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বার্তাও দিচ্ছেন এই তরুণ

চতুর্থ দিনে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী হয়ে কাজীর দেউড়ি ও পতেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার হাঁটেন তিনি। রাতে থাকেন চট্টগ্রামের দৌড়বিদ সাইদুর রহমানের বাসায়। পঞ্চম দিনে পতেঙ্গা থেকে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া পর্যন্ত প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন। দৌড়বিদ সাইদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সন্ধ্যায় কাজীর দেউড়িতে ফাহিমের সঙ্গে দেখা হয়। গল্প করতে করতে তাঁরা পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার একসঙ্গে হাঁটেন। পরদিনও কিছুটা পথ তাঁর সঙ্গে হেঁটেছেন।

রাজধানীর পথে

পঞ্চম দিনের পর ফেনী, কুমিল্লা, দাউদকান্দি, গজারিয়া ও সোনারগাঁ হয়ে নবম দিন রাতে ঢাকার গুলিস্তানে এসে পৌঁছান। এ সময় প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ হেঁটেছেন তিনি। ঢাকায় বন্ধু রিয়াজুল মোর্শেদের বাসায় রাতযাপন করেন। রিয়াজুল প্রথম আলোকে বলেন, রাজধানীতে পৌঁছানোর পরদিন তিনি ফাহিমকে কিছু দূর এগিয়ে দিয়ে চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার একসঙ্গে হেঁটেছিলেন।

পথে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ফাহিম মুনতাসির

দিনের বেশির ভাগ সময় হাঁটলেও মাঝেমধ্যে স্যালাইন, হালকা খাবার ও স্বল্প বিশ্রাম নিয়েছেন। যাত্রাপথে কখনো পরিচিতজনের বাসায়, কখনো হোটেলে, আবার কখনো রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকদের আতিথেয়তায় রাত কাটিয়েছেন ফাহিম। নবম দিন রাতে পায়ে তীব্র ব্যথা অনুভব করায় দশম দিনও ঢাকায় থাকেন। ফাহিম বলেন, ওই দিন রাতে পা নাড়াতেও কষ্ট হচ্ছিল। তবে বিশ্রামের পরদিন আবার যাত্রা শুরু করেন।

ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের পথে

১১তম দিনে ঢাকার কাঁঠালবাগান থেকে যাত্রা শুরু করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুরের চন্দ্রা, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ও টাঙ্গাইল হয়ে উত্তরবঙ্গের দিকে এগিয়ে যান ফাহিম। ১৩তম দিনে টাঙ্গাইলে পৌঁছে একটি প্রেস মিটে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি পরিচিতজনদের সঙ্গে সময় কাটান। পরদিন টাঙ্গাইল পিটিআইয়ের ইনস্ট্রাক্টর রাজীব মাহবুব ও তাঁর স্ত্রী নূপুরের সঙ্গে হেঁটে যমুনা সেতুর দিকে যান।

তবে সেতুতে হাঁটার অনুমতি না থাকায় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ট্রাকে করে ওপারে পৌঁছে দেয়। এরপর আবার হেঁটে সিরাজগঞ্জে পৌঁছান। সিরাজগঞ্জে প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্যরা তাঁকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। প্রথম আলোর প্রতিনিধি তাঁর দুপুরের খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করেন। এরপর বগুড়ার উদ্দেশে পথচলা শুরু করেন ফাহিম।

রাজীব মাহবুব প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফাহিমকে আমি চিনতাম না। ওর অ্যাডভেঞ্চারের কথা শুনে রাতে বাসায় থাকার নিমন্ত্রণ দিই। দুই দিন ওর সঙ্গে আমার স্ত্রী ও আমি হেঁটেছি। সিরাজগঞ্জের সোনামুখী পর্যন্ত হেঁটে আমরা বিদায় নিয়েছি।’

তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে পৌঁছানোর পর বিজয়সূচক ‘ভি’ চিহ্ন দেখাচ্ছেন ফাহিম মুনতাসির

উত্তরবঙ্গে শেষ লড়াই

বগুড়া, গোবিন্দগঞ্জ, মিঠাপুকুর, রংপুর, কিশোরগঞ্জ, নীলফামারী ও দেবীগঞ্জ পেরিয়ে যাত্রার শেষ ভাগে পৌঁছান ফাহিম। এ সময়ও প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ হেঁটেছেন তিনি। নীলফামারীতে রেড ক্রিসেন্টের যুবপ্রধান মো. ইসমাইলের সহযোগিতায় তিনটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তিনটি গাছ রোপণ করেন। এরপর আবার হাঁটা শুরু করে দেবীগঞ্জে পৌঁছে রাত কাটান।

যাত্রার ২০তম দিনে দেবীগঞ্জ থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার হেঁটে তেঁতুলিয়ায় পৌঁছান। যাত্রার শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ছয়টায় হাঁটা শুরু করেন। আটটার দিকে নাশতা করে ১৯ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে সকাল ১০টার দিকে বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে পৌঁছে ২১ দিনের পদযাত্রা শেষ করেন তিনি।

ফাহিম মুনতাসির প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুস্থ থাকার জন্য একজন মানুষকে প্রতিদিন ১০ হাজার ধাপ হাঁটা উচিত। কিন্তু আমরা হাঁটি না। কোনো না কোনো কারণে আমরা যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। খুব কাছের গন্তব্যে গাড়ি ব্যবহার না করে হেঁটে যাওয়া ও পরিবেশবান্ধব অভ্যাসগুলো গ্রহণ করা উচিত।’ তিনি বলেন, অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি ও কালো ধোঁয়ার কারণে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, সবার। ছোট ছোট অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমেই বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। সেই বার্তা ছড়িয়ে দিতেই তিনি এ যাত্রা করেন।