‘শিশুর সামাজিক বিকাশ কার্যক্রম গতিশীলকরণ: পরিপ্রেক্ষিত সিলেট অঞ্চল’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন সিলেট সিটি করপোরেশন প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, সিলেট, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‘শিশুর সামাজিক বিকাশ কার্যক্রম গতিশীলকরণ: পরিপ্রেক্ষিত সিলেট অঞ্চল’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন সিলেট সিটি করপোরেশন প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, সিলেট, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিলেটে গোলটেবিল বৈঠক

শিশুর যত্নে বাড়তি উদ্যোগ নিন

সিলেট অঞ্চলে শিশুর সামগ্রিক বিকাশে দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতা, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষায় কম অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি ও দুর্গম এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রবাসী পরিবারের শিশুদের পর্যাপ্ত পরিচর্যার ঘাটতি রয়েছে। মূলত শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সমাজসেবা ও সুরক্ষায় সব বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

আজ বৃহস্পতিবার সিলেট শহরতলির বিমানবন্দর এলাকার পাঁচ তারকা মানের গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে ‘শিশুর সামগ্রিক বিকাশ কার্যক্রম গতিশীলকরণ: পরিপ্রেক্ষিত সিলেট অঞ্চল’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) ও প্রথম আলো যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, শিশুর বিকাশে সরকার একা সব দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বিতভাবে সহযোগিতা করতে হবে। বিদ্যালয়ে শিশুদের জন্য খেলাধুলার জায়গা ও কর্নার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া দরকার। প্রাক্-প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেন।

সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, সিলেটকে সাধারণত প্রবাসী-অধ্যুষিত ও সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে দেখা হলেও এখানে দারিদ্র্যের বাস্তবতা রয়েছে। দুর্গম ও দরিদ্র এলাকায় শিশুদের সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করা কঠিন। এসব এলাকায় প্রকল্প নেওয়ার সময় স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

শিশুসেবা পৌঁছে দেওয়া চ্যালেঞ্জ

হাওর ও চা-বাগান এলাকায় শিশুসেবা পৌঁছে দেওয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. জিয়াউর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, বর্ষায় হাওরাঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় টিকাদান, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্ত হয়। চা-বাগান এলাকায় দারিদ্র্য, কম মজুরি, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ঘাটতি এবং প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষার সীমিত সুযোগও শিশুদের বিকাশে ঝুঁকি তৈরি করছে। হাওরাঞ্চলে বোট ও স্যাটেলাইট ক্লিনিক চালু, দুর্গম এলাকায় নিয়মিত টিকাদান এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের শিশুর বিকাশবিষয়ক প্রশিক্ষণের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

উপাচার্য বলেন, শিশুর সামগ্রিক বিকাশের বিষয়টি পরিবার ও সমাজে এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। গর্ভকাল থেকে শিশুর আট বছর বয়স পর্যন্ত শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, ভাষাগত, আবেগগত ও আচরণগত বিকাশের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রথম তিন বছর এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। যৌথ পরিবার কমে আসা, মা-বাবার দুজনের চাকরি ও প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারসহ নানা কারণে শিশুদের প্রয়োজনীয় সময় ও পরিচর্যা কমছে।

গোলটেবিল বৈঠকে শিশুর সামাজিক বিকাশ ও কল্যাণে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারীরা

সিলেটের পরিস্থিতি তুলে ধরে জিয়াউর রহমান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের এমআইসিএস ২০২৫-এর সূচক অনুযায়ী সিলেটে ২ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের ৬৭ শতাংশ সঠিক বিকাশের পথে রয়েছে। জাতীয় হার ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ। তিন থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার সিলেটে ১৩ শতাংশ, যা আট বিভাগের মধ্যে সর্বনিম্ন। জাতীয় হার ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ।

পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সিলেটে মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ শিশুর বাড়িতে তিনটি বা তার বেশি বই রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে খাদ্য দারিদ্র্যের হার ৭২ দশমিক ১ শতাংশ, যা বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

শিশুর যত্নে বাড়তি উদ্যোগের তাগিদ

বৈঠকে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন বিআইজিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সমন্বয়কারী জেমস ওয়ার্ড খকশী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ২০১৩ সালে প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ বিষয়ে নীতিমালা হওয়ার পর চাহিদার দিকটি অনেকটা সংগঠিত হলেও সরবরাহের দিকটি এখনো পুরোপুরি সংগঠিত হয়নি।

বৈজ্ঞানিক এক গবেষণার প্রসঙ্গ তুলে জেমস ওয়ার্ড খকশী বলেন, শিশুর জীবনের প্রথম তিন বছরের মধ্যে মস্তিষ্কের ৮০ শতাংশ বিকাশ হয়। অথচ প্রচলিত ব্যবস্থায় অনেক সময় তিন বছর বয়সের পর আনুষ্ঠানিকভাবে শেখানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে শিশুর প্রাথমিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়টি যথাযথভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ কমে যায়।

আঞ্চলিক তথ্যভান্ডার তৈরির আহ্বান

বৈঠকে বক্তারা সিলেটে শিশুর বিকাশ নিয়ে আঞ্চলিক তথ্যভান্ডার তৈরির আহ্বান জানান। তাঁরা বলেন, সিলেটকে সাধারণত প্রবাসী ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সিলেটে অনেক মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যেও বসবাস করছেন। এসব পরিবারের শিশুরা কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই সিলেটকে প্রবাসী-অধ্যুষিত বা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এলাকা বললে বাস্তব চিত্র পাওয়া যাবে না।

সিলেটের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মাহমুদা সুলতানা তাঁর বক্তব্যে সিলেটের শিশুবিষয়ক শহরকেন্দ্রিক উদ্যোগ তৃণমূলেও ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে পাথর উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর অনেক পরিবারের আয়রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এসব পরিবারের শিশুদের খাবার ও মৌলিক চাহিদা পূরণই যেখানে কঠিন, সেখানে তাদের সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করাও কঠিন।

বিআইজিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সমন্বয়কারী ফারাহ মুনীর বলেন, শিশুর বিকাশের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশুর নিরাপত্তা, যত্ন ও দিবাযত্নসেবার সমন্বয় প্রয়োজন। বিআইজিডি চার বছর ধরে এ বিষয়ে গবেষণা করছে। তাঁদের অংশীদারদের মাধ্যমে ৩০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলাধুলার মাধ্যমে শেখার মডেল বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীদেরও শিশুর সঙ্গে মা-বাবার কথা বলা, খেলা ও বই পড়ার উপকারিতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মাসুমা কাওসার, ব্র্যাক শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যবস্থাপক আতাউর রহমান, সিলেট মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহিনা আক্তার, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আবদুর রফিক, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রধান প্রণবকান্তি দেব, সিলেটের জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা সাইদুর রহমান ভূঞা, সুনামগঞ্জের জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা বাদল চন্দ্র বর্মণ, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মঈন উদ্দিন, সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, সিলেট জেলা শিক্ষা কার্যালয়ের সহকারী প্রোগ্রামার তোফায়েল আহমেদ চৌধুরী, উন্নয়ন সংস্থা এফআইভিডিবির প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচির পরিচালক শিরিন আক্তার, ইনোসেন্ট কর্মসূচির ব্যবস্থাপক দিদারুল ইকবাল, প্রচেষ্টা প্রোগ্রামের সমন্বয়ক মুক্তা দেব ও সিলেট যুব একাডেমির পরিচালক সাবিহা সুলতানা।

বৈঠকে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন প্রথম আলো সিলেটের নিজস্ব প্রতিবেদক সুমনকুমার দাশ। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।