
সারা বছর ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বেগুন চাষ হয়। পুঠিয়া বেগুনের জন্য বিখ্যাত। বিশেষ করে তাল বেগুন বেশি চাষ হয়।
‘রাজা নেই, শাহি নেই—রাজশাহী নাম/ হাতি-ঘোড়া কিছু নেই আছে শুধু আম’—এই গানের কথা থেকে দিনে দিনে বেরিয়ে আসছে রাজশাহীর পরিচয়। কয়েক বছর আগে রাজশাহী সারা দেশের মধ্যে সবজি চাষে সেরা হয়েছিল। সবজি চাষ থেকে রাজশাহীর চাষিরা বছরে যে আয় করেন, তা আমের চেয়ে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বেশি। আমের চেয়ে বছরে প্রায় দ্বিগুণ জমিতে এখন সবজি চাষ হয়। গত ১০ বছরে সবজির চাষ বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর।
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন সবজির জন্য সুখ্যাতি পেয়েছে। এ জন্য ওই ইউনিয়নের জমির ইজারা মূল্যও বেড়ে গেছে। এক বছরের জন্য সেখানে এক বিঘা জমির ইজারা মূল্য দাঁড়িয়েছে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। সেখানকার অনেকেই আমবাগান বাদ দিয়ে উচ্চ মূল্যের সবজি চাষ করে ইতিমধ্যে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এরই মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজশাহী সবজি চাষে দেশসেরা হয়।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এ বছর (২০২৪-২৫ অর্থবছরে) সবজি চাষ থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ২৫৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। আম চাষ থেকে আয় হয়েছে ৮০১ কোটি ৫ লাখ টাকা। সবজি চাষ হয়েছে ৩৩ হাজার ১৫ হেক্টর জমিতে। আম চাষ হয়েছে ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে। অনেকেই আমগাছ কেটে সবজিসহ অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। অথচ ঠিক ১০ বছর আগে রাজশাহীতে সবজি চাষ হয়েছিল ২২ হাজার ১১৮ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ ১০ বছরে রাজশাহীতে সবজি চাষ বেড়েছে ১০ হাজার ৮২৭ হেক্টর।
দুর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নে এক বছরের জন্য স্থানীয় ভাষায় এক বিঘা জমি ‘টেন্ডার’ নিতে হলে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা গুনতে হবে। জেলার অন্যান্য উপজেলায় ১০ হাজার থেকে জমিভেদে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ইজারামূল্য পাওয়া যায়।
এবার জেলায় টমেটো চাষ হয়েছে ৩ হাজার ২৯৮ হেক্টর জমিতে। গোদাগাড়ী উপজেলায় সবচেয়ে বেশি টমেটো চাষ হয়। উপজেলার ধামিলা গ্রামের বর্গা চাষি জনিরুল ইসলাম জমি ইজারা নিয়ে টমেটো চাষ করেন। গত বছর এক বিঘা ২ কাঠা জমি ১৫ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন। এ থেকে ৮৫ হাজার টাকা মুনাফা করেছিলেন। এবার চার বিঘা জমি ইজারা নিয়ে টমেটো লাগিয়েছেন।
এবার বাঁধাকপি অগ্রিম চাষ হয়েছে ১৩৮ হেক্টর জমিতে। গোদাগাড়ী উপজেলার পালপুর গ্রামের কৃষক মাসুদ রানা এবার ছয় বিঘা জমিতে আগাম বাঁধাকপি চাষ করেছিলেন। এর মধ্যে চার বিঘা জমির বাঁধাকপি বিক্রি হয়ে গেছে। আর দুই বিঘা জমির বাঁধাকপি এখনো বিক্রির অপেক্ষায়। মাসুদ রানা প্রথম আলোকে বলেন, এলাকাতেই মহাজন আছেন। তাঁরা কৃষকদের কাছ থেকে পাইকারি দামে বাঁধাকপি কিনে ঢাকার কারওয়ান বাজার, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যান। তিনি বলেন, গত আশ্বিন মাসের প্রথম সপ্তাহে আগাম বাঁধাকপি রোপণ করেছিলেন। ৭০ থেকে ৭৫ দিনের মধ্যেই এই কপি কাটার উপযুক্ত হয়ে গেছে। এই চার বিঘা জমিতে কপি রোপণে তাঁর খরচ হয়েছিল দেড় লাখ টাকা। খরচ বাদ দিয়ে তাঁর মুনাফা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ টাকা। তিনি বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকেই তাঁদের সবজি চাষ হতো। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে তিনি সবজি চাষ শুরু করেছেন ২০১৯ সাল থেকে। তিনি সব মৌসুমেই সবজি চাষ করেন। নিজের ছয় বিঘা জমি আছে। আরও প্রায় ১৪ বিঘা জমি ইজারা নিয়ে বাঁধাকপি, ফুলকপি, মরিচ, টমেটোসহ অন্যান্য সবজি চাষ করেন।
উপজেলার গোলাই গ্রামের চাষি হুমায়ুন কবীর (৪৭) এবার ১৩ কাঠা জমি ইজারা নিয়ে পটোল চাষ করেছিলেন। গত পাঁচ মাসে প্রায় ৯০ হাজার টাকার পটোল বিক্রি করেছেন। জমির ইজারাসহ খরচ ২৬ হাজার টাকা বাদ দিয়ে বাকিটা পুরোটাই মুনাফা। তিনি বলেন, পটোলের আয় চোখে দেখা যায় না। সপ্তাহে দুবার ওঠানো হয়। হাতে হাতে বিক্রি হয়ে যায়। গত পাঁচ মাসে তাঁর পুরো সংসার খরচ, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা—সবকিছুই এসেছে এই পটোল থেকে।
হুমায়ুন কবীরকে সংসারের খরচ চালাতে এবার বিক্রি করে করতে হয়নি। আরও দুই বিঘা জমিতে বাঁধাকপি চাষ করেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘বলতে পারেন এই সবজি এখন সংসারের সুখের মূল।’ জেলার মোহনপুর ও পবা উপজেলা পটোল চাষের জন্য প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছে। রাজশাহী-নওগাঁ সড়কে যাওয়ার পথে প্রায় পটোলের বিরাট খেত চোখে পড়ে।
গোদাগাড়ীর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঈশ্বরীপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অতনু সরকার প্রথম আলোকে বলেন, আজ থেকে ১০ বছর আগে তাঁর ব্লকে বছরে দুবার শুধু ধান হতো। তারপর চাষিদের সবজি ও উচ্চ মূল্যের ফসল চাষে তাঁরা উদ্বুদ্ধ করেন। এতে বর্তমানে উঁচু জমিতে সব চাষি চাষ করছেন। একাধিক ফসল করে তাঁরা আগের চেয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। তিনি বলেন, পবা উপজেলার দামকুড়া হাট তাঁর ব্লকের পাশেই। এই হাটের দোকানিরা ১০-১৫ বছর আগে রাজশাহী শহর থেকে সবজি এনে বিক্রি করতেন। এখন এই এলাকায় উৎপাদিত সবজির ট্রাক বোঝাই হচ্ছে, চলে যাচ্ছে ঢাকায়-কারওয়ান বাজারে।
গত ১৫-২০ বছরে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার সবজি চাষের বিপ্লব ঘটে গেছে। চাকরির খোঁজ না করে অনেকেই সবজি চাষে ঝুঁকছেন। সে রকম একজন চাষি বায়েজিদ হোসেন। তাঁর বাড়ি উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের মাড়িয়া গ্রামে। রাজশাহী কলেজ থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা বায়েজিদ এবার আড়াই বিঘা জমিতে ফুলকপির চাষ করেছেন। তিনি বলেন, প্রথম দিকেই তাঁর উৎপাদন খরচ উঠে গেছে। এখন যা হচ্ছে মুনাফা। পর্যায়ক্রমে তিনি বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, তাঁর কোনো দিকে তাকানোর সময় নেই। কোনো চাকরিও করতে যাওয়ার দরকার নেই। তিনি ১২-১৩ বিঘা জমিতে বিভিন্ন ফসলের চাষ করেন।
রাজশাহীতে সারা বছর ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বেগুন চাষ হয়। জেলার পুঠিয়া বেগুন চাষের জন্য বিখ্যাত। বিশেষ করে তাল বেগুন বেশি চাষ হয়। পুঠিয়ায় সড়কের দুই পাশে সারা বছর গাড়িতে বেগুন বোঝাই করতে দেখা যায়। উপজেলার নন্দনপুর গ্রামের রবিউল ইসলাম বেগুন চাষি থেকে এখন বেগুন ব্যবসায়ী হয়ে গেছেন। আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে বেশি বেগুন ওঠে। সেই সময় তিনি ১০০ মণ পর্যন্ত বেগুন ঢাকায় পাঠান। তিনি বলেন, এখন মৌসুম নয়, তবু গত ৬ নভেম্বর ৫৫ মণ এবং ৭ নভেম্বর ২৫ মণ বেগুন ঢাকায় পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, বেগুন সবচেয়ে লাভজনক ফসল। বেগুনেই তিনি স্বাবলম্বী হয়েছেন। বাড়িঘর করেছেন।
সবজি হলেও আলুর হিসাব এর বাইরে। গত বছর রাজশাহীতে আলু চাষ হয়েছিল ৩৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। এবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার হেক্টর।
সবজি চাষ বাড়ার ব্যাপারে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিন বলেন, আগে কৃষি ছিল বাঁচার জন্য। এখন কৃষি হচ্ছে ব্যবসার জন্য। এ ছাড়া এখন স্বাস্থ্য ও পুষ্টিগত কারণে চিকিৎসকেরা রেড মিট বাদ দিয়ে সবজি খাওয়ার ব্যাপারে বেশি উৎসাহিত করছেন। এ কারণে সবজির চাহিদা বেড়ে গেছে। তাঁরা চাষিদের পরামর্শ দেন যেন জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করেন। আর কীটনাশক ব্যবহার করলেও যেন নিয়ন্ত্রিত মাত্রার বাইরে না যান।