বৃষ্টির পানিতে ধান ডুবে যাচ্ছে হাওরের ধানখেত। ছবিটি গতকাল শনিবার বিকেলে কলমাকান্দা উপজেলার বড়খাপন ইউনিয়নের মেদাবিল থেকে তোলা
বৃষ্টির পানিতে ধান ডুবে যাচ্ছে হাওরের ধানখেত। ছবিটি গতকাল শনিবার বিকেলে কলমাকান্দা উপজেলার বড়খাপন ইউনিয়নের মেদাবিল থেকে তোলা

‘খোরাকির ধানও কাটতে পারলাম না, কীবায় চলবাম?’

‘ঘরে ভিজা ধানের স্তূপ, পইচ্চা গন্ধ করতাছে। ফালাইতেও মায়া লাগে। ১০ আড়া জমির ধান মেদাবিলের পানির নিচে পচতাছে। খোরাকির ধানও কাটতে পারলাম না। কীবায় চলবাম? তিন দিন ধইরা বৃষ্টি না হইলেও পানি কমতাছে না।’ মন ভার করে কথাগুলো বলছিলেন নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার বড়খাপন গ্রামের কৃষক আহম্মদ মণ্ডল।

হঠাৎ বৃষ্টি আর উজানের ঢলে হাওরের বোরো ধানের খেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। পাকা ধান ঘরে তুলতে না পারার আক্ষেপ সবার। এর মধ্যে কিছুটা স্বস্তির আভাস। গতকাল শনিবার ভোর থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মাঝারি বৃষ্টি হয়েছে নেত্রকোনায়। আজ সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত আকাশ পরিষ্কার। এতে কৃষকের মনে কিছুটা হলেও আশার আলো জাগছে। কারণ স্তূপ করে রাখা পচাগলা ধান ত্রিপল বিছিয়ে হলেও শুকানোর ব্যবস্থা করা যাবে। তবে বৃষ্টি না হলেও হাওরের পানি মোটেই কমছে না। ফলে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

বড়খাপন গ্রামের আরেক কৃষক হাবলু মিয়া বলেন, ‘গুরাডোবা হাওরে ১১ আড়া (১ হাজার ৪০৮ শতাংশ) জমি করছিলাম। মাত্র তিন আড়া জমির ধান কাটছিলাম। তাও শুকাইতে না পাইরা পচাগলা হইতাছে। রইদ নাই, খলায় (ধান শুকানোর জায়গা) পানি উঠছে। আইজ বৃষ্টি না হইলে মনে হয় ত্রিপাল বিছাইয়া লারতে পারবাম।’

স্থানীয় বাসিন্দা, জেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনার ১০ উপজেলায় এবার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন ধান। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়। সরকারি হিসেবে হাওরে ৬২ শতাংশ খেতের ধান কাটা হয়েছে। আর অতিবৃষ্টিতে নিমজ্জিত হয়েছে ১৩ হাজার ৪৬৬ হেক্টর জমির ধান।

কিন্তু বাস্তব চিত্রটা ভিন্ন। গত কয়েক দিনে খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন, কলমাকান্দা, আটপাড়া ও বারহাট্টা উপজেলার বিভিন্ন হাওর ও বিলে ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাওরাঞ্চলে ফসল এখনো প্রায় ৬০ শতাংশ খেতের ধান কাটা বাকি। আর পানিতে নিমজ্জিত আছে প্রায় সাড়ে ২৩ হাজার হেক্টর খেতের ধান।

খালিয়াজুরি উপজেলার হায়াতপুর গ্রামের কৃষক দুলু সরকার বলেন, ‘খালিয়াজুরিতে ৬৫ শতাংশ খেতের ধান এখনো পানির নিচে। শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ধান পচে যাচ্ছে এখন কেউ কেউ বুক পানিতে নাইম্মা ধান কাটলে ময়লায় চুলকায়, শরীরে ফুসকুরি গুড গুডি হইয়া যায়। রইদ নাই, ঘরে ও খলায় ধান পইচ্চা চারা গজাইতাছে।’ ধান পচে ২০১৭ সালের বন্যার মতো মাছ ও জলজ প্রাণী মরে ভেসে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা এই কৃষকের।

অবশ্য খালিয়াজুরি কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেনের দাবি, উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। গতকাল শনিবার পর্যন্ত প্রায় ৫২ শতাংশ খেতের ধান কাটা হয়েছে। প্রায় সব খেতের ধান পানির নিচে।
জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন সকাল ১০টার দিকে জানান, কংস ও উব্দাখালি নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে আছে। আর ধনু নদের পানি বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদের খালিয়াজুরি পয়েন্টে বিপৎসীমা ৪ দশমিক ১৫ মিটার।

কোথা হতে এত পানি এলো?

হাওর ঘুরে জানা গেছে নেত্রকোনায় এ বছর পাউবোর অধীনে ৩১ কোটি টাকা ব্যয় ধরে ১৩৮ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এই বাঁধের ওপর কৃষকদের প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান নির্ভর করে। সেখান থেকে ধান উৎপাদন হয় প্রায় ৩ লাখ টন। এই ধানের উপরই হাওরের কৃষকদের সন্তানদের লেখাপড়াসহ সারা বছরের সংসার খরচ নির্ভর করে। তাই ফসল হারানোর আশঙ্কা মানেই তাঁদের জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তার ছায়া। এবার অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলে জেলার ছোট-বড় সব নদ-নদীর পানি বাড়লেও কোনো বেড়িবাঁধ ভাঙার ঘটনা ঘটেনি। সব পানিই বৃষ্টির জমাটবদ্ধ।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন হাওরে পানি আসবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এবার ভারতের চেরাপুঞ্জি, আসাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হওয়ায় এই পানি এসেছে। অবশ্য ঢলের কোনো পানি হাওরের ভেতরে আসতে পারেনি। এবার ডিজেল–সংকটের কারণে কৃষকেরা হার্ভেস্টার দিয়ে সহজে ধান কটতে পারেননি। অন্যান্য বছর কৃষকেরা কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, পাবনা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ধান কাটার শ্রমিক আনতেন। তাঁরা হাওরে জিরাতি হয়ে ধান কাটতেন। কিন্তু হার্ভেস্টারের ওপর নির্ভরশীল থাকায় এখন শ্রমিক আনা হয় না। আর খেতে পানি জমলে ধানকাটার যন্ত্রটি ব্যবহার করা যায় না। এ ছাড়া শুকনো মৌসুমে হাওর থেকে পানি দেরিতে নামায় কৃষকদের বীজতলা প্রস্তুত করতে দেরি হয়। তাই ধানের চারাও দেরিতে লাগানো হয়।

হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে বৃষ্টির পানি যেতে পারছে না। পানি যাওয়ার পথগুলো পলি জমে বন্ধ হয়ে গেছে। হাওরের অধিকাংশ জলকপাট (স্লুইসগেট) অকেজো হয়ে রয়েছে।

স্থানীয় হাওর গবেষক সঞ্জয় সরকার বলেন, হাওর নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে পরিকল্পনা না করে টেকসই ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রয়োজন। এর জন্য মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। তলদেশ খনন, কিছু স্থানে স্থায়ী বাঁধ, স্লুইসগেট নির্মাণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ প্রয়োজন।