
নিজের বাসায় অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গালিগালাজ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন সিফাত আবদুল্লাহ। ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, ২ মাসে তাঁর প্রায় ১০ হাজার টাকার বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তদন্তেও ২ মাসের বিল ১০ হাজার টাকার বেশি দেখা গেছে। তবে বিলটি একটি মিটারের নয়, তিনটি মিটারের।
গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে সিফাতকে (২০) আটক করে পুলিশ। পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গত শুক্রবার তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
সিফাত রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী এবং গাজীপুর মহানগরের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের টিনের মসজিদ এলাকার বাসিন্দা সিকান্দার আলীর ছেলে।
সিফাত জুলাই ও আগস্ট মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা বিল দেওয়ার কথা বললেও কতটি মিটারের বিপরীতে বিল পরিশোধ করেছেন, তা উল্লেখ করেননি। কিন্তু ভবনটির নিচতলায় ভাড়াটে দুই পরিবারও থাকে।
সিফাতের বাসার বিদ্যুৎ বিলের গ্রাহক কপি এবং পল্লী বিদ্যুতের তদন্তে পাওয়া বিলের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দুটি হিসাব প্রায় একই ধরনের। সিফাত ভিডিওতে ২ মাসে ১০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে তিনি জুলাই ও আগস্ট মাসে মোট ১০ হাজার ৬৮১ টাকা বিল পরিশোধ করেছেন। তিনটি আবাসিক বিদ্যুৎ মিটারের বিল হিসাবে এই টাকা পরিশোধ করা হয়।
আজ রোববার সকালে নগরের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে টিনের মসজিদ এলাকায় সিফাতের বাবা সিকান্দার আলীর নামে থাকা বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দোতলা ভবনটিতে সিফাতের পরিবার ছাড়াও আরও দুটি পরিবার ভাড়ায় থাকে। ভবনটিতে পল্লী বিদ্যুতের তিনটি আবাসিক মিটারের সংযোগ আছে।
প্রথম মিটারে মে মাসে ৪৫ ইউনিটের বিল ছিল ৩১৭ টাকা, জুনে ৫০ ইউনিটে ৩৪২ টাকা, জুলাইয়ে ১৫০ ইউনিটে ১ হাজার ১৮২ টাকা এবং আগস্টে ৭৫ ইউনিটে ৫১৩ টাকা। অর্থাৎ, ৪ মাসে মোট বিল এসেছে ২ হাজার ৩৫৪ টাকা।
দ্বিতীয় মিটারে মে মাসে ২৫০ ইউনিটে ১ হাজার ৮১২ টাকা, জুনে ২০০ ইউনিটে ১ হাজার ৫৮৪ টাকা, জুলাইয়ে ৪০০ ইউনিটে ৩ হাজার ৫৯৪ টাকা এবং আগস্টে ২৮৫ ইউনিটে ২ হাজার ৩৯৭ টাকার বিল এসেছিল। সব মিলিয়ে এই মিটারে বিল আসে ৯ হাজার ৩৮৭ টাকা।
তৃতীয় মিটারে মে মাসে ১২৫ ইউনিটে ৮৪৭ টাকা, জুনে ১২০ ইউনিটে ৬৯০ টাকা, জুলাইয়ে ২০৫ ইউনিটে ১ হাজার ৬৩৩ টাকা এবং আগস্টে ১৭৫ ইউনিটের বিল এসেছে ১ হাজার ৩৬২ টাকা। ৪ মাসে এই মিটারে মোট বিল এসেছে ৪ হাজার ৫৩২ টাকার। তিনটি মিটার মিলিয়ে ৪ মাসে মোট ২ হাজার ৮০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে। বিপরীতে মোট বিল এসেছে ১৬ হাজার ২৭৩ টাকা।
সিফাত দুই মাসের হিসাব দেখিয়েছে আর পল্লী বিদ্যুৎ হিসাব দিয়েছে চার মাসের। এসব হিসাব দেখিয়ে গণমাধ্যমকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।আলী নাছের খান, সিফাতের আইনজীবী ও এনসিপির মুখ্য সংগঠক
সিফাত জুলাই ও আগস্ট মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা বিল দেওয়ার কথা বললেও কতটি মিটারের বিপরীতে বিল পরিশোধ করেছেন, তা উল্লেখ করেননি। কিন্তু ভবনটির নিচতলায় ভাড়াটে দুই পরিবারও থাকে। তিনটি মিটার মিলিয়ে জুলাইয়ে বিল আসে ৬ হাজার ৪০৯ টাকা, আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৭২ টাকায়। ২ মাসে ৩টি মিটারে মোট বিল দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮১ টাকা। অন্যদিকে তিনটি মিটারে মে ও জুন মাসে যথাক্রমে ২ হাজার ৯৭৬ টাকা এবং ২ হাজার ৬১৬ টাকা।
এ বিষয়ে কথা বলতে সিফাতের বাসায় গেলে ভেতর থেকে এক নারী এ ব্যাপারে বাসার পুরুষ কারও সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে এ ব্যাপারে তেমন কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সিফাতের আইনজীবী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক আলী নাছের খান প্রথম আলোকে বলেন, সিফাত দুই মাসের হিসাব দেখিয়েছে আর পল্লী বিদ্যুৎ হিসাব দিয়েছে চার মাসের। এসব হিসাব দেখিয়ে গণমাধ্যমকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর বোর্ডবাজার আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক আহসান কবীর বলেন, বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর তাঁরা বিষয়টি যাচাই করতে সিফাতের বাড়িতে গিয়েছিলেন। মিটারের রিডিং ও বিলের তথ্য পর্যালোচনার পাশাপাশি বাড়িতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের তালিকা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সিফাতের পরিবার সহযোগিতা করেনি। পরিবারের সদস্যরা বাড়ির ফটক বন্ধ করে দেন।
তিনি আরও বলেন, একটি বাড়িতে একাধিক মিটার থাকলে প্রতিটি মিটারের হিসাব আলাদাভাবে দেখতে হয়। শুধু একটি মিটারের বিল দেখিয়ে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ খরচের বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসা ঠিক নয়।