নিজের আঁকা ছবির সঙ্গে জারিন সুবহ্। ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছে গ্রামীণ জীবনের নানা দৃশ্য। সম্প্রতি সাতক্ষীরায় নিজের বাড়িতে
নিজের আঁকা ছবির সঙ্গে জারিন সুবহ্। ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছে গ্রামীণ জীবনের নানা দৃশ্য। সম্প্রতি সাতক্ষীরায় নিজের বাড়িতে

দুবার জেলা পর্যায়েই বাদ, এবার চিত্রাঙ্কনে দেশসেরা জারিন

সাদা কাগজে রংতুলির আঁচড়ে ফুটে উঠছে একটি গ্রাম। কোথাও গাছপালা, কোথাও কাঁচা ঘর। আছে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি। গ্রামের মানুষের ব্যস্ততাও বাদ যায়নি। নিজের কল্পনায় আঁকা সেই ছবিতে মগ্ন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী জারিন সুবহ্।

সম্প্রতি সাতক্ষীরা শহরে জারিনের বাড়িতে গিয়ে এমন দৃশ্যই দেখা গেল। ছবি আঁকার ফাঁকে নিজের আঁকা ছবিটি হাতে তুলে দেখাল সে। এই জারিনই এবার জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার চিত্রাঙ্কন বিভাগে প্রথম হয়েছে।

জারিন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সিলভার জুবিলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। জাতীয় পর্যায়ে প্রথম হয়ে সে পেয়েছে পুরস্কার ও পদক। তাদের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলায়। বাবা নাজমুল আলমের চাকরির সুবাদে কয়েক বছর আগে পরিবারের সঙ্গে সাতক্ষীরায় আসে জারিন।

তবে সাফল্যের পথটা জারিনের জন্য সহজ ছিল না। এর আগে টানা দুই বছর জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার চিত্রাঙ্কন বিভাগে অংশ নিয়ে জেলা পর্যায় থেকেই বাদ পড়েছিল সে। ২০২৪ সালে প্রথমবার অংশ নিয়ে জেলা পর্যায়ে থেমে যায় তার পথ। পরের বছরও একই ফল। দ্বিতীয়বার ব্যর্থ হওয়ার পরও ছবি আঁকার স্বপ্ন থেকে সরে যায়নি জারিন। ব্যর্থতা তাকে আরও মনোযোগী করেছে। নিয়মিত অনুশীলন করেছে। শিক্ষকদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছে। মা-বাবাও উৎসাহ দিয়ে গেছেন। শেষ পর্যন্ত তৃতীয়বারের চেষ্টায় জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বাধা পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সেরার স্বীকৃতি পেয়েছে সে।

ভবিষ্যতে দেশের জন্য ভালো কিছু করতে চায় জানিয়ে জারিন সুবহ্ বলে, ‘আমার ছবি আঁকতে খুবই ভালো লাগে। প্রথম দিকে তো দুবার পারিনি। একটু মন খারাপ হয়েছিল। কিন্তু আমি আরও অনুশীলন করেছি। স্কুলের স্যারদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছি। মা-বাবা ও শিক্ষকেরা সব সময় আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। এবার আমার প্রস্তুতিটাও ভালো ছিল। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কারও পেয়েছি।’

জারিনের পরিবার সূত্রে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ তার। বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ ধরে রাখে সে। কাগজ-খাতা পেলেই রংতুলিতে নিজের কল্পনার জগৎ ফুটিয়ে তুলত। সেই আগ্রহই ধীরে ধীরে স্বপ্নে পরিণত হয়।

জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার চিত্রাঙ্কন বিভাগে প্রথম হয়ে পাওয়া পদক ও পুরস্কার হাতে জারিন সুবহ্। সম্প্রতি সাতক্ষীরায় নিজের বাড়িতে

মেয়ের এই সাফল্যে আনন্দিত বাবা নাজমুল আলম। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের এই অর্জনে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। তার নিজের প্রচেষ্টাই সবচেয়ে বড় বিষয়। আমরা শুধু তাকে সহযোগিতা করেছি। সে শুধু চিত্রাঙ্কনেই নয়, পড়াশোনাতেও ভালো। আমরা চাই, সে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক।’

জারিনের সাফল্যে খুশি তার বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহপাঠীরাও। বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, এবার জাতীয় পর্যায়ের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিদ্যালয়টির তিনজন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে জারিন প্রথম স্থান অর্জন করে।

সিলভার জুবিলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চায়না ব্যানার্জী বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায় নিয়মিত সাফল্য অর্জন করে। জারিন অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই এ অর্জন সম্ভব হয়েছে।’

চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমেও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে গুরুত্ব দেয় বিদ্যালয়টি। শিক্ষকেরা জানান, এর আগে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় স্থানসহ বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এবার সেই সাফল্যের তালিকায় যুক্ত হলো জারিনের নাম।