
‘আল্লাহ, আল্লাহ, ডুবে যাচ্ছে তো, কেউ তো সাঁতার পারে না। একটু আগে আমার সামনে দিয়ে দুজন পানিতে নেমেছে!’ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়ায় সাগরের পানিতে দুই তরুণ যখন ডুবতে শুরু করেন, তখন উদ্বেগের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন সৈকতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পর্যটক। এ সময় ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
গত শুক্রবার বিকেলে বাঁশবাড়িয়া সৈকত এলাকায় সাগরে গোসল করতে নেমে তলিয়ে যান কলেজছাত্র মেহরাজ হোসাইন (১৯) ও সাব্বির সাগর (১৯)। পরে দুজনকে স্থানীয় জেলেরা উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মেহরাজকে মৃত ঘোষণা করেন। দুজনেরই এবার চট্টগ্রামের এমইএস কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে সাগরে গোসল করতে নামেন মেহরাজ ও সাব্বির। ভিডিওতে দেখা যায়, সাগরে তখন প্রচণ্ড ঢেউ। ভাটার পানির স্রোত মেহরাজকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। শুরুতে উপকূল থেকে অন্তত ৫০ মিটার দূরে দেখা যায় মেহরাজকে। ১০ মিটার দূরত্বে ছিল সাব্বির। একপর্যায়ে মেহরাজ ভিডিও থেকে অদৃশ্য হতে শুরু করেন।
ঘটনাস্থলের পাশেই বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট। সেখানে বিআইডব্লিউটিএর টোল আদায় করেন সাইফুল আহমেদ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভাটার টানে মেহরাজ যখন তলিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সাব্বির তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। দুজনই ভালো সাঁতার জানতেন না। তাই দুই তরুণ ডুবতে শুরু করেন। একপর্যায়ে জেলেরা লাল বোট (জাহাজের লাইফবোট) নিয়ে তাঁদের উদ্ধার করেন।’
সাইফুল আহমেদ আরও বলেন, ‘দুজনকে উদ্ধার করে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক মেহরাজকে মৃত ঘোষণা করেন। অপরজন বর্তমানে সুস্থ।’
পুলিশ জানায়, মেহরাজ হোসাইন চট্টগ্রাম নগরের ডাবলমুরিং থানার পূর্ব মাদারবাড়ি এলাকার মোশারফ হোসেনের একমাত্র ছেলে। মেহরাজ হোসাইন যে ভবনে বসবাস করতেন, এর পাশের ভবনে সাব্বিরের পরিবার থাকে। মেহরাজ ও সাব্বির পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
ঘটনার প্রসঙ্গে জানতে সাব্বিরের মুঠোফোনে কল করা হয়। তিনি কল রিসিভ করেননি। তবে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দেন, তিনি মানসিকভাবে ভালো নেই। তাই কথা বলতে পারছেন না।
হাসপাতালে মেহরাজের লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন সীতাকুণ্ড থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রাসেল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মেহরাজের বাবা একজন ব্যবসায়ী। মেহরাজ ছিলেন তাঁর একমাত্র ছেলে। তাঁরা মূলত ভোলা জেলার বাসিন্দা, তবে দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম নগরে বসবাস করে আসছেন।
এর আগে ২০২৩ সালের ২৪ জুলাই সন্ধ্যা ছয়টার দিকে একই উপকূলে গোসলে নেমে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। নিহত ওই শিক্ষার্থীরা হলেন দাওয়া বিভাগের তৃতীয় সেমিস্টারের মোহাম্মদ আলী আহসান ও কোরআনিক সায়েন্স বিভাগের তৃতীয় সেমিস্টারের মো. এনায়েত উল্লাহ। ২০১৮ সালের ২১ জুন ও ৬ জুলাই পৃথক দুটি দুর্ঘটনায় এই সৈকতে ডুবে পাঁচ তরুণের মৃত্যু হয়। এই নিয়ে গত আট বছরে বাঁশবাড়িয়া সৈকতে আটজনের মৃত্যু হলো।