কুমিল্লা নগরের আলোচিত কিশোর গ্যাং ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’-এর প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)
কুমিল্লা নগরের আলোচিত কিশোর গ্যাং ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’-এর প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)

কুমিল্লার আতঙ্ক ‘আর স্কোয়াড’, রতনের গ্রেপ্তারে কি থামবে কিশোর গ্যাং

একটি হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লা নগরে আলোচনায় আসে কিশোর গ্যাং ‘আর স্কোয়াড’ বা ‘রতন গ্রুপ’। এরপর সংঘর্ষ, প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া, হত্যাচেষ্টার অভিযোগ—বছরের পর বছর বিভিন্ন ঘটনায় একই নাম ফিরে এসেছে। গ্রুপটির প্রধান হিসেবে পরিচিত ইমরান হোসেন ওরফে রতন একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁর সহযোগীরাও বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার রতনকে এক সহযোগীসহ কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

কিশোর গ্যাংটিকে ‘র (Raw) স্কোয়াড’ নামেও চেনে অনেকে। পুলিশের ভাষ্য, ২৫ বছর বয়সী রতন এই কিশোর গ্যাংয়ের মূল চালিকাশক্তি। তাঁর বিরুদ্ধে খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ৯টি মামলা রয়েছে। একই অভিযানে রতনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সাইফুল ইসলামকেও (২০) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, সাইফুল রতনের ‘ডান হাত’। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে ১০টি মামলা রয়েছে।

গত কয়েক বছর ধরেই কুমিল্লা নগরের মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়ায় ‘আর স্কোয়াড’। পুলিশ, র‍্যাব থেকে শুরু করে সেনাবাহিনী—এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার করেছে গ্রুপটির প্রধান রতনকে। পাশাপাশি এই গ্যাংয়ের অন্যান্য সদস্যরার বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার হয়ে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন।

পুলিশ জানায়, শুক্রবার রাতে কিশোর গ্যাংবিরোধী পুলিশের পঞ্চম দফার অভিযানে ৩৭০ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ২৭৯ জনকে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ৯১ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ‘ক্রাইম সেটআপ’ নামের আরেকটি কিশোর গ্যাংয়ের শীর্ষ নেতা মো. সাব্বির ওরফে ‘পয়েন্ট সাব্বির’ (২৪) ও তাঁর সহযোগী রবিউল ইসলাম নবী ওরফে ‘কিং মেকার’ (২৪) রয়েছেন।

কুমিল্লার সচেতন নাগরিকেরা বলছেন, সদস্যদের গ্রেপ্তার হওয়ার ফলে ‘আর স্কোয়াডের’ অস্তিত্ব থাকার কথা ছিল না; কিন্তু ঘটেছে উল্টোটা—প্রতিনিয়ত বেড়েছে কিশোর গ্যাংটির দৌরাত্ম্য। মূলত একজন গ্রেপ্তার হওয়ার পর অন্য কেউ গ্যাংটির সামনে এসেছেন। নেতা আত্মগোপনে গেলে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে গ্রুপের কার্যক্রম চালু থাকার অভিযোগ উঠেছে।

হত্যাকাণ্ডের পর আলোচনায় আসে রতনের নাম

কুমিল্লা নগরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন নয়। ২০১৫ সালের পর এই ‘গ্যাং কালচার’ ছড়িয়ে পড়ে। শুরুর দিকে যে কয়েকটি গ্রুপ আতঙ্ক ছড়িয়েছিল, তাদেরই একটি ‘আর স্কোয়াড’ বা রতন গ্রুপ। তবে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার মধ্য দিয়ে রতন আলোচনা আসেন ২০২২ সালে। ওই বছরের ১৯ আগস্ট কুমিল্লা নগর উদ্যানের সামনের সড়কে আওয়ার লেডি অব ফাতিমা স্কুলের সামনে ১৭ বছর বয়সী কিশোর শাহাদাত হোসেনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

কিশোর গ্যাং ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াডের’ প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনকে (বাঁ থেকে তৃতীয়) ২০২২ সালে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে র‍্যাব

ওই ঘটনার পরবর্তী সময়ে র‍্যাব জানিয়েছিল, রতন ও ইগল গ্রুপের আধিপত্যের দ্বন্দ্বের জেরে শাহাদাতকে হত্যা করা হয়। তখন র‍্যাব রতনকে ওই মামলার প্রধান আসামি ও রতন গ্রুপের প্রধান হিসেবে উল্লেখ করেছিল। ওই ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও দিয়েছিল র‍্যাব। পরে পুলিশ, র‍্যাব ও ডিবির অভিযানে মোট ১৭ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়।

শাহাদাত হত্যা মামলার পর থেকেই কুমিল্লা নগরের কিশোর গ্যাংয়ের আলোচনায় রতন গ্রুপের নাম স্থায়ীভাবে চলে আসে। পুলিশের ভাষ্য ও বিভিন্ন মামলার তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপটির সদস্যদের বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার, সংঘর্ষ, অস্ত্রের মহড়া, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল নগরের ধর্মসাগরপাড়ের রানীর কুঠি এলাকায় নাফিজ অময় নামের এক যুবককে হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটে। কুপিয়ে তাঁর একটি হাত প্রায় বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ ঘটনায় করা মামলায় রতন, তাঁর সহযোগী সাইফুলসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাতনামা আরও প্রায় ৫০ জনকে আসামি করা হয়।

ওই সময়ে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে নাফিজের এক বন্ধুর বক্তব্যে রতন ও সাইফুলের নেতৃত্বে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি দলের হামলার অভিযোগ উঠে আসে।

কুমিল্লা জেলা ডিবি পুলিশের কার্যালয়ের সামনে গ্রেপ্তার হওয়া কিশোর গ্যাংয়ের চার নেতা—ইমরান হোসেন ওরফে রতন (বাঁ থেকে দ্বিতীয়), সাইফুল ইসলাম (লাল শার্ট পরিহিত), মো. সাব্বির ওরফে ‘পয়েন্ট সাব্বির’ এবং রবিউল ইসলাম নবী ওরফে ‘কিং মেকার’ (কালো টি–শার্ট পরিহিত)। আজ শনিবার দুপুরে তোলা

২৫ এপ্রিল নগরের রানীর দিঘির পাড়, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের বিভিন্ন পক্ষের অস্ত্রের মহড়ার খবর আসে। ২৬ এপ্রিল রাতে র‍্যাব ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে রতনসহ ১৮ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশিত হয়। তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকার অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা হয়; কিন্তু অভিযানের পরও রতন গ্রুপের তৎপরতা পুরোপুরি কমেনি।

পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, ২০২৫ সালের এপ্রিলে গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক মাস পরেই জামিনে বের হয়ে রতন এলাকায় ছিলেন। তাঁকে ধরতে কয়েক দফা অভিযান চালানো হলেও তিনি পালিয়ে যান।

রতনের গ্রেপ্তারে কি থামবে ‘আর স্কোয়াড’

সর্বশেষ অভিযানে কক্সবাজার থেকে রতন ও সাইফুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। জেলা পুলিশের ভাষ্য, রতন আত্মগোপনে থাকার সময় তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে গ্রুপের কার্যক্রম চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল। সাইফুলকে সেই নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।

চার বছরের ঘটনাপ্রবাহে এখন রতন গ্রুপকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি শুধু রতন গ্রেপ্তার হলেন কি না, তা নয়; বরং গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় নগরবাসী একটি প্রশ্ন সামনে রাখছে—নেতা গ্রেপ্তার হওয়ার পরও একই নেটওয়ার্ক কীভাবে টিকে থাকে?

কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. মহসিনের নেতৃত্বে মিছিলের পেছনে হাঁটছেন ‘রতন গ্রুপের’ প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতন (গোল চিহ্নিত)

কারা নতুন সদস্য যুক্ত করে, পুরোনো সদস্যরা কীভাবে আবার সক্রিয় হয়, মামলায় গ্রেপ্তারের পর জামিনে বের হওয়া ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি কতটা কার্যকর এবং অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের কোনো যোগাযোগ আছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর না মিললে শুধু গ্রেপ্তার করে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকেরা।

অবশ্য কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চলছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। প্রতিটি এলাকায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে গ্যাংয়ের সদস্যদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে কোনো ‘বড় ভাই’ বা রাজনৈতিক ব্যক্তি এসব গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতা করছেন কি না, তা তদন্ত করে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ছড়িয়ে পড়েছে বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কুমিল্লার সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান। আজ শনিবার বিকেলে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, প্রথম সারির না হলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির পর্যায়ের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি নিজেদের পেশিশক্তি বাড়াতে এসব কিশোর গ্যাং ব্যবহার করেছেন—অতীতেও এমন ঘটনা দেখা গেছে, বর্তমানেও দেখা যাচ্ছে।