
চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে আবাসিক হল থেকে শিক্ষার্থীকে নামিয়ে দেওয়া, আসন-বাণিজ্য কিংবা শিক্ষার্থী নির্যাতনের মতো ঘটনায় বারবার খবরের শিরোনাম হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবাসিক হলগুলোতে স্বস্তি ফিরেছে। শৃঙ্খলা ফিরেছে হলে, নিয়মে ফিরেছে আবাসিকতা।
তবে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সামগ্রিক সংস্কার এখনো দৃশ্যমান নয়। সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের কারণে চিকিৎসাকেন্দ্রকে শিক্ষার্থীরা এখনো ‘নাপা সেন্টার’ বলেই কটাক্ষ করেন। ডাইনিংয়ের খাবারের মান নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক পদ বণ্টনে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ আগের মতোই চলছে। প্রশাসনিক কাজে ডিজিটাল সুবিধার অভাব এখনো শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কারণ হয়ে আছে।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেল ২৩ পদের মধ্যে সহসভাপতি (ভিপি), সহসাধারণ সম্পাদকসহ (এজিএস) ২০টিতে জয়ী হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ে ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ নামের প্যানেলটি ১২ মাসে ২৪ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও এর অধিকাংশই ‘অধরা’ বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
ডাইনিংয়ের খাবারের মান নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক পদ বণ্টনে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ আগের মতোই চলছে। প্রশাসনিক কাজে ডিজিটাল সুবিধার অভাব এখনো শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কারণ হয়ে আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়সূত্রে জানা যায়, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের আগে আবাসিক হলগুলোতে ছিল বর্তমানে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের একক আধিপত্য। প্রতিটি হলেই নেতা-কর্মীদের নামে কক্ষ বা ‘রাজনৈতিক ব্লক’ ছিল। ছাত্রলীগ নেতাদের সুপারিশ ছাড়া আসন পাওয়া ছিল যেন ‘ডুমুরের ফুল’। আসন থেকে শিক্ষার্থীকে নামিয়ে দেওয়া ও শিক্ষার্থী নির্যাতন হয়ে উঠেছিল প্রতিদিনকার চিত্র। শিক্ষার্থীদের জোর করে মিটিং-মিছিলে নিয়ে যাওয়ার রীতিও চালু ছিল। এ ছাড়া আবাসিকতার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া এবং যথাযথ নিয়মানুসারে আসন বরাদ্দ দেওয়ার রীতিটিও অচল হয়ে পড়েছিল।
তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সেই চিত্র পাল্টাতে শুরু করে। প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময়ের (আলটিমেটাম) মধ্যে অনাবাসিক ও দখলদাররা আসন ছেড়ে দেন। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানের মাধ্যমে আবাসিক হলগুলো অস্ত্রমুক্ত করা হয়। এর পর থেকে মেধাতালিকার মাধ্যমে প্রশাসন আসন বরাদ্দ দিচ্ছে। যদিও প্রাধ্যক্ষদের বিরুদ্ধে নিজ দলীয় শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন কেউ কেউ। তবে হলগুলো থেকে দূর হয়েছে মিটিং-মিছিল, ‘রুমওয়ার্ক’ ও সেই ভয়ের রাজনীতি। শিক্ষার্থীরা এখন স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করছেন।
অবশ্য হলে শৃঙ্খলা ফিরলেও আসনসংকট কাটেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যকণিকা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। তাঁদের জন্য রয়েছে ১৭টি আবাসিক হল এবং একটি আন্তর্জাতিক ডরমিটরি।
প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময়ের (আলটিমেটাম) মধ্যে অনাবাসিক ও দখলদাররা আসন ছেড়ে দেন। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানের মাধ্যমে আবাসিক হলগুলো অস্ত্রমুক্ত করা হয়। এর পর থেকে মেধাতালিকার মাধ্যমে প্রশাসন আসন বরাদ্দ দিচ্ছে।
এর মধ্যে ছাত্রদের জন্য ১১টি এবং ছাত্রীদের জন্য ৬টি হল। আন্তর্জাতিক ডরমিটরিতে থাকেন বিদেশি শিক্ষার্থী ও এমফিল-পিএইচডি পর্যায়ের গবেষকেরা। সব মিলিয়ে আবাসনসুবিধা রয়েছে ৯ হাজার ৬৭৩ জন শিক্ষার্থীর। অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর ৩২ শতাংশ হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। এদিকে শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট নিরসনে দুটি হল দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণাধীন রয়েছে। এক হাজার আসনসম্পন্ন ১০তলা ‘বিজয় ৭১’ হল ও ৮০০ আসনসম্পন্ন ‘অপরাজিতা’ হল। ৯৫ শতাংশ কাজ হওয়া ‘বিজয় ৭১’ হল শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে অপরাজিতা হলের নির্মাণকাজ ৬৫ শতাংশ হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিব হোসেন। তিনি ৫ আগস্টের আগে হলে ছাত্রলীগের সেই দখলদারি ও পরিবেশের কারণে হলে ওঠার চেষ্টা করেও পারেননি। একটি আসনের বিপরীতে তাঁকে অর্থ বা রাজনীতি করার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। তবে পটপরিবর্তনের পর নিয়মানুযায়ী আবেদন করে আসন পেয়েছেন। এই শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে হলে উঠতে হলে হয় টাকা বা মিটিং-মিছিল করার শর্তে উঠতে হতো। এরপরও অনেকে নির্যাতনের শিকার হতেন। সবকিছু বিবেচনা করে আর হলে উঠিনি। কিন্তু পটপরিবর্তনের পর মেধার ভিত্তিতে আসন পেয়েছি। এখন হলে সেই ভয়ের পরিবেশ-পরিস্থিতি নেই। মেসের চেয়ে স্বাধীনভাবে এখানে বসবাস করছি।’
ফলিত গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান ক্যাম্পাসে এসেছেন বছরখানেক আগে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন মির্জাপুর এলাকার একটি ছাত্রাবাসে থাকেন। ক্লাসের ফাঁকে দুপুরে মাঝেমধ্যে ডাইনিংয়ে খাবার খান। ডাইনিংয়ে খাবারের অভিজ্ঞতার বিষয়ে তাঁর ভাষ্য, ‘বেঁচে থাকার জন্য খেতে হয়, তাই ডাইনিংয়ে খাই। সেখানে অপুষ্টিকর খাবার পরিবেশন করা হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। সারা বছর খাবারের স্বাদ-মান একই থাকে।’
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত চার বছরে দুই দফায় হলের ডাইনিংয়ের খাবারের দাম বাড়ানো হলেও মান বাড়েনি। ২০২২ সালের ১ জুলাই থেকে দুই বেলার খাবারে মোট আট টাকা বাড়ায় প্রশাসন। এতে দুপুরের খাবারের কুপনের দাম ২৪ টাকা থেকে ২৮ এবং রাতের খাবার ১৮ টাকার পরিবর্তে ২২ টাকা করা হয়। গণ–অভ্যুত্থানের পর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও খাবারের মান বাড়াতে দুপুরের খাবার ৩০ টাকা এবং রাতের খাবার ২৫ টাকা করা হয়। এ ছাড়া আগে দুই টাকায় বিভিন্ন ভর্তা পাওয়া গেলেও এখন সেগুলো খেতে শিক্ষার্থীদের বাড়তি আরও তিন টাকা গুনতে হয়। ক্যানটিনের খাবারেরও দাম বেড়েছে।
বর্তমানে হলের ডাইনিংয়ে দুপুর ও রাতের খাবার সরবরাহ করা হয়। দুপুর ও রাতে ভাত ও পাতলা ডালের সঙ্গে থাকে মাছ/মুরগি/ডিম।
১৯৯৪ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদার বখ্শ হলের ডাইনিং কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন সাবুর আলী। ডাইনিংয়ের খাবারের মানের বিষয়ে তিনি বলেন, করোনার আগে প্রতি কেজি মুরগির মাংস ১৫ থেকে ১৮ টুকরা করা হতো। আর অভ্যুত্থানের আগে আগে করা হতো ২৫ টুকরা। বর্তমানে সেটি করা হয় ১৮-২০ টুকরা।
খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিম প্রথম আলোকে বলেন, ডাইনিংয়ে খাবারের মানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। উল্টো বিভিন্ন সময় নানা কারণ দেখিয়ে দাম বাড়ানো হয়েছে। মোটা চালের ভাত ও পাতলা ডাল আগের মতোই রয়েছে। দাম বাড়লেও মাছ ও মুরগির টুকরার সাইজের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, টুকরা আরও ছোট হয়েছে। প্রশাসন ও রাকসু ভর্তুকি দেওয়ার আশ্বাস দিলেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
আগে হলে উঠতে হলে হয় টাকা বা মিটিং-মিছিল করার শর্তে উঠতে হতো। এরপরও অনেকে নির্যাতনের শিকার হতেন। সবকিছু বিবেচনা করে আর হলে উঠিনি। কিন্তু পটপরিবর্তনের পর মেধার ভিত্তিতে আসন পেয়েছি। এখন হলে সেই ভয়ের পরিবেশ-পরিস্থিতি নেই। মেসের চেয়ে স্বাধীনভাবে এখানে বসবাস করছি।শিক্ষার্থী রাকিব হোসেন
গত বছরের জুলাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মৌমিতা জামান ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এতে চিকিৎসাকেন্দ্রের অবহেলা ও প্রশাসনের দায়িত্বহীনতার অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীরা ১৭ জুলাই মানববন্ধন শেষে চিকিৎসাকেন্দ্রকে ‘নাপা সেন্টার’ নাম দিয়ে ব্যানার ঝুলিয়ে দেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে উন্নত মানের কোনো সেবা পাওয়া যায় না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের অভাব তো রয়েছেই। সেই সঙ্গে কিছু হলেই হাতে নাপা মেডিসিন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বেশির ভাগ সময়ই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) পাঠানো হয়। জুলাই–পরবর্তী প্রশাসন সংস্কারের আশ্বাস দিলেও কোনো কাজ হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে থেকে শিক্ষার্থীরা এক্স-রে, ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাফি (ইসিজি), ফিজিওথেরাপি, প্রেশার মনিটর, আলট্রাসনোগ্রামসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা পাচ্ছেন। সেই সঙ্গে প্রায় ৬০ প্রকারের ওষুধ সরবরাহ করা হয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর ও সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী জয়ীতা রায় প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষ না করেই শিক্ষার্থীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ছাড়া চিকিৎসক ও নার্সের স্বল্পতা শিক্ষার্থীদের বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার চিকিৎসা শেষে প্রয়োজনীয় ওষুধও পাওয়া যায় না।
জানতে চাইলে প্রধান চিকিৎসক মাফরুহা সিদ্দিকা লিপি বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মেডিক্যাল সেন্টার শনিবার খোলা রাখা হচ্ছে। ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাফি (ইসিজি) দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবার চালু করা হয়েছে। প্যাথলজিতে ইএসআর অ্যানালাইজার যন্ত্র যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ওষুধের সরবরাহ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এক কোটি টাকা বাজেটের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা আগে ছিল ৪৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া নারী শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবার জন্য একজন গাইনি চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশনের দাবি উঠলেও সনদ উত্তোলন আধুনিকায়ন ছাড়া কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত রাকসু নির্বাচনে জয়ী ছাত্রশিবির ইশতেহারে এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। তাঁদের ১২ মাসে ২৪ সংস্কারের একটি অঙ্গীকার ছিল ‘ওয়ান অ্যাপে অল সলিউশন’। তবে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি লাঘবে প্রশাসনের উদ্যোগে গত বছরের এপ্রিলে সনদ উত্তোলনপ্রক্রিয়া আধুনিকায়ন করা হয়েছে। অনলাইনে নির্ভুলভাবে আবেদনপ্রক্রিয়া সম্পন্নের পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে সনদ দেওয়া হচ্ছে।
ফরম ফিলআপে ভোগান্তির কথা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মুহাম্মদ মিরাজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর পরীক্ষার ফরম ফিলআপ করতে সময় লেগেছে দুই দিন। দাপ্তরিক নানা কাজ শেষ করে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে হয়েছে। পরীক্ষার কয়েক দিন আগে এমন দৌড়ঝাঁপ করে ফরম ফিলআপ করা অনেক কষ্টের ও ভোগান্তির। বাসায় বসে অনলাইনেই যদি এই সেবা পাওয়া যেত, তাতে তাঁদের কষ্ট লাঘব হতো।
অভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য বিদায়ী সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষক নিয়োগকাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। শিক্ষকদের গবেষণায় আগ্রহী করতে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী করা হয়েছে। অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ও রাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠন করা হয়েছে। ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প একনেকে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ক্যাম্পাস নিট ও ক্লিন করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশে সিনেটে নির্বাচিত তিন সদস্যের প্যানেল থেকে একজনকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার কথা; কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেই নিয়ম মানা হয় না। অভ্যুত্থানের পরও সেই আগের মতো দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগের ধারা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে সহ-উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, প্রক্টর, কোষাধ্যক্ষ, জনসংযোগ প্রশাসক, প্রাধ্যক্ষসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের রীতিই চলে আসছে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর শীর্ষ প্রশাসনিক পদ উপাচার্য পদে সালেহ্ হাসান নকীব, উপ-উপাচার্য পদে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন, রেজিস্ট্রার পদে ইফতিখারুল ইসলাম মাসউদসহ অন্য পদগুলোতে রাজপথে থাকা শিক্ষকদের নিয়ে আসা হয়। এরপর উপাচার্য তাঁর কাছের ও জামায়াতপন্থী শিক্ষক হিসেবে পরিচিতদের অন্য পদগুলোতে নিয়োগ দেন। হাতে গোনা কয়েকটি পদে বিএনপিপন্থী শিক্ষকেরা ছিলেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মাথায় উপাচার্য পদে পরিবর্তন আনা হয়। চার বছরের জন্য নিয়োগ পান বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম। সবশেষ গত বুধবার (২০ মে) অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া দুই সহ–উপাচার্যকে সরিয়ে নতুন দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নবনিযুক্ত সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আবদুল আলিম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের বর্তমান সভাপতি। সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ইউট্যাবের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির পদে আছেন। অন্যান্য প্রশাসনিক পদেও শিগগিরই পরিবর্তন আসবে বলে ক্যাম্পাসে গুঞ্জন চলছে।
চব্বিশের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যেসব শিক্ষক ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁদের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম মাসুদ রেজা (শৌভিক রেজা)। পরিবর্তনের কথা জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কারোর ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি। পটপরিবর্তনের পর ক্যাম্পাসে বড় প্রত্যাশা ছিল ভিসি নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হবে; কিন্তু ইউনূস সাহেব সেই আগের দেখানো পথেই হেঁটেছেন। নির্বাচিত তারেক রহমানও রাজনৈতিক মতাদর্শ দেখে নিয়োগ দিলেন। ক্যাম্পাসে আওয়ামীপন্থী ডিনদের অপসারণ করা হয়েছে। তাঁরা তো নির্বাচিত ডিন ছিলেন, আওয়ামীপন্থী বলে তো তাঁরা নির্বাচিত হননি। তাহলে অন্য ডিনদের কেন অপসারণ করা হলো না?’
ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে অধ্যাপক মাসুদ রেজা বলেন, ‘পটপরিবর্তনের পর ছাত্র সমন্বয়কেরা লাফিয়ে বেড়িয়েছেন। এখন হয়তো তলে তলে ছাত্রদলও তা করছে। সব মিলিয়ে স্বস্তিতে থাকার উপায় নেই।’