শিশুটির মায়ের হাতে চিকিৎসা সহযোগিতার চেক তুলে দেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. হারুনুর রশিদ। গতকাল রোববার বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদ কার্যালয়ে
শিশুটির মায়ের হাতে চিকিৎসা সহযোগিতার চেক তুলে দেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. হারুনুর রশিদ। গতকাল রোববার বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদ কার্যালয়ে

টাকার অভাবে হাসপাতাল ছাড়া হামে আক্রান্ত শিশুর পাশে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক

টাকার অভাবে হামে আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে হাসপাতাল ছাড়া পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. হারুনুর রশিদ। গতকাল রোববার বিকেলে তিনি শিশুটির মায়ের হাতে ২০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন।

শিশুটির বয়স এখন চার মাস। তার মধ্যে দুই মাসই ছিল হাসপাতালে। শিশুর চিকিৎসার জন্য মা শাহিদা খাতুন (১৭) নিজের রিকশাচালক বাবার তিনটি গরু বিক্রি করেছেন। গরু বিক্রির তিন লাখ টাকা চিকিৎসায় শেষ হয়ে যায়। এরপর শিশুর চিকিৎসার জন্য রাজশাহী শহরে থাকা-খাওয়ার তাঁদের কোনো টাকা ছিল না। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ শিশুটির চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। কিন্তু রোগীর স্বজনদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় তখন তাঁরা চিন্তায় পড়েন।

শাহিদা খাতুনের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার নয়দিয়াড়ী সিরোটোলা গ্রামে। তাঁর স্বামী ডালিম আলী একজন দিনমজুর। তিনি গ্রামে কাজ করেন। খরচের কারণে কাজ বাদ দিয়ে সে সময় তিনি শহরে এসে থাকতে পারতেন না। শাহিদার সঙ্গে ছিলেন তাঁর মা পারভীন বেগম ও ছোট বোন সুমাইয়া (৭)। শাহিদার বাবা জুয়েল আলী ঢাকায় রিকশা চালান।

শাহিদার মা পারভীন বেগম তখন বলেছিলেন, তাঁর নাতির চিকিৎসার জন্য নিজের পোষা তিনটা গরু ছিল, তিন লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। সব টাকা চিকিৎসার পেছনে খরচ হয়ে গেছে। তাঁরা একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন।

শাহিদা খাতুন জানান, প্রথমে শিশুটির ঠান্ডা লাগা, জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া হয়েছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দুই মাস বয়সী শিশুটিকে নিয়ে প্রথম হাসপাতালে আসেন। একটানা ২০ দিন হাসপাতালে ছিলেন। তখন তিন দিন আইসিইউতে রাখতে হয়েছিল। কিছুটা সুস্থ মনে হলে ডাক্তার ছুটি দিয়েছিলেন। মাত্র দুই দিন বাসায় ছিলেন। বাসায় গিয়ে দেখেন, বাচ্চার গায়ে হাম উঠেছে। তখনই হাসপাতালে ফিরে আসেন। প্রথমবার হাসপাতালে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে আর দ্বিতীয়বার ১০ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। দ্বিতীয় দফায় ভর্তি হওয়ার ১০ দিন পর ডাক্তার শিশুকে আবার আইসিইউতে নেন। তখন আইসিইউতে পাঁচ দিন রাখা হয়। তারপর আবার ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। হাম ঠিক হলো। কিন্তু হাম–পরবর্তী জটিলতা শুরু হয়। তখন শিশুর নিউমোনিয়া, ঠান্ডা লাগা, ফুসফুসের সমস্যা ও রক্তে জীবাণু ধরা পড়ে। গত ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ১০ দিন আইসিইউতে ছিল। পরে ৩০ এপ্রিল তাঁরা হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান।

শাহিদা সেই সময় বলেছিলেন, শিশুটিকে দ্বিতীয়বার আইসিইউতে নেওয়ার পর তাঁদের টাকাপয়সা সব শেষ হয়ে যায়। তাঁরা চলে যেতে চান। সে সময় আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। কিন্তু শহরে থাকা-খাওয়ার একটা খরচ আছে। তাঁদের আর কোনো উপায় ছিল না। তাঁরা আর থাকতে চাননি।

গত ২৭ এপ্রিল প্রথম আলোয় ‘৪ মাসের শিশু ২ মাস ধরে হাসপাতালে, নিঃস্ব পরিবার লড়ছে খরচ জোগাতে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই খবর দেখে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদ ২০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। সেই টাকা শেষ হয়ে গেলে তাঁরা হাসপাতাল থেকে স্বেচ্ছায় ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে যান। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আগামী তিন মাস শিশুকে নির্ধারিত ইনজেকশন দিতে হবে। তাঁরা সেই টাকা জোগাড় করতে পারছিলেন না। অবশেষে খবর পেয়ে রোববার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. হারুনুর রশিদ শিশুটির মায়ের হাতে ২০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন। শিশুটির মা শাহিদা খাতুন বিষয়টি প্রথম আলোকে জানান।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. হারুনুর রশিদ বলেন, তিনি শিশুটির চিকিৎসায় সহায়তা করেছেন। চিকিৎসা যেন থেমে না যায়, সে বিষয়ে আগামীতেও খোঁজখবর রাখবেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা আইসিইউতে থাকতেই চিকিৎসা বন্ধ করে চলে যেতে চেয়েছিলেন। তিনি আইসিইউর চিকিৎসার খরচের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সেখান থেকে সাধারণ ওয়ার্ডে পাঠানোর পর তাঁরা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান।