
ডিজেলের সংকটের প্রভাবে বঙ্গোপসাগর ও পটুয়াখালীর নদ-নদীতে মাছ আহরণ ৭০-৮০ শতাংশ কমে গেছে বলে দাবি করেছেন জেলে ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এতে সাগর উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্যবন্দর ও মোকামগুলোতে প্রায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ফলে জেলে, স্থানীয় ব্যবসায়ী, আড়তদার, পাইকার, শ্রমিকসহ মৎস্য পেশার ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হচ্ছে টানা ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, প্রজনন নিশ্চিত করা ও টেকসই আহরণের লক্ষ্যে এ সময় বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। জ্বালানি–সংকটের ভোগান্তি কাটতে না কাটতেই এই দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন উপকূলের মৎস্যজীবীরা।
পটুয়াখালী জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ৭৫ হাজার নিবন্ধিত জেলেসহ ১ লাখের বেশি জেলে আছেন। এর মধ্যে উপকূলীয় উপজেলা কলাপাড়ায় ১৮ হাজার ৩০৫ জন জেলে এবং ১০ হাজারের বেশি শ্রমিক সরাসরি মৎস্য পেশার ওপর নির্ভরশীল। এ অঞ্চলে ৭০০ থেকে ৮০০টি ট্রলার এবং বিচ্ছিন্নভাবে আরও ৪০০টির বেশি ট্রলার নিয়মিত সাগরে মাছ আহরণ করে। মহিপুর, আলীপুর, কুয়াকাটা, আশাখালী, বাবলাতলা, পাটুয়া, ধোলাইমার্কেটসহ বিভিন্ন বন্দর থেকে প্রতি মাসে ৭০০-৮০০ টন মাছ আহরিত হয়ে থাকে, যার স্থানীয় বাজারমূল্য ৪০-৫০ কোটি টাকা।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, জ্বালানি–সংকটে উপজেলাটিতে মাছ আহরণ ও সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জেলে ও ব্যবসায়ীরা জ্বালানি তেলের নিশ্চয়তা চেয়েছেন এবং বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।
গলাচিপা উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা এবং রাঙ্গাবালীর অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী জানান, গলাচিপায় ৫০০টির বেশি এবং রাঙ্গাবালীতে ৯০০টির বেশি ট্রলার নিয়মিত মাছ আহরণ করে। গলাচিপায় ২১ হাজার ৩২০ জন এবং রাঙ্গাবালীতে ১৬ হাজার ৮০০ জন জেলে এ পেশায় যুক্ত। এ অঞ্চল থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫ টন টাইগার চিংড়ি খুলনায় পাঠানো হয়, যা পরে বিদেশে রপ্তানি হয়। তবে জ্বালানি–সংকটে মাছ আহরণ ও সরবরাহে মন্দা ভাব দেখা দিয়েছে।
জেলেদের সূত্রে জানা গেছে, পায়রা, রামনাবাদ, আগুনমুখা, বুড়াগৌরাঙ্গ, কোড়ালিয়া, চরমোন্তাজ, চালিতাবুনিয়া ও তেঁতুলিয়া নদীসংলগ্ন শতাধিক মোকাম থেকে তিন হাজারের বেশি ট্রলার সাগর ও নদীতে মাছ আহরণ করে। এসব মোকাম থেকে প্রতিদিন ১৫-২০ টন ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ দেশে সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে তা ৭০-৮০ শতাংশ কমে গেছে।
পটুয়াখালী পৌর নিউমার্কেটের মাছ বিক্রেতা আবুল কালাম বাশার বলেন, আগের তুলনায় মোকামগুলোতে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। অল্প যা পাওয়া যাচ্ছে, তা বেশি দামে কিনে বিক্রি করতে হচ্ছে।
মহিপুর মৎস্যবন্দরের এফভি ‘মা-বাবার দোয়া’ ট্রলারের মালিক মো. মনু খান জানান, এক সপ্তাহ সাগরে থাকতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু তিনি মাত্র ৩০০ লিটার নিয়ে গিয়ে দুই দিনের মধ্যেই ফিরে আসতে বাধ্য হন। বর্তমানে ডিজেল না পেয়ে ট্রলার, ১৮ জন মাঝিমাল্লাসহ বন্দরে নোঙর করে আছেন। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের ভরণপোষণও তাঁকেই করতে হচ্ছে।
রাঙ্গাবালীর চরমন্তাজ এলাকার ট্রলারের মাঝি হাসান শরীফ বলেন, ২১ মার্চ সাগর থেকে ফিরে আসার পর ডিজেল না পেয়ে আর যেতে পারেননি। বর্তমানে অধিকাংশ ট্রলার ঘাটে বাঁধা রয়েছে।
মহিপুর ও আলীপুর মৎস্যবন্দরের ব্যবসায়ীরা জানান, এই দুটি বন্দরে ১২০টি আড়তে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ শ্রমিক কাজ করেন। এসব আড়তের মাধ্যমে সারা দেশে মাছ সরবরাহে প্রায় ৩০০ পাইকার যুক্ত আছেন। পাশাপাশি বরফকল, হোটেল, ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ পুরো অর্থনৈতিক চক্র এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ডিজেলের সংকটে সবখানেই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
মহিপুর ও আলীপুর হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার সরদার বলেন, তাঁর সংগঠনের প্রায় ৭৫০ শ্রমিক এখন কর্মহীন। ঈদের আগ থেকেই কাজ বন্ধ। সামনে আবার নিষেধাজ্ঞা, তাতে সংকট আরও বাড়বে।
সাগরে মাছ ধরা কমে যাওয়ায় ব্যবসায় বড় প্রভাব পড়েছে বলে জানান মহিপুরের মাছ ব্যবসায়ী বাবলু হাওলাদার। তিনি বলেন, আগে নিয়মিত বিভিন্ন জেলায় মাছ সরবরাহ করলেও এখন তা প্রায় বন্ধের পথে।
মহিপুর মৎস্য আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুমন দাস বলেন, ট্রলার চলাচল ৭০-৮০ শতাংশ কমে যাওয়ায় আড়তের শ্রমিকদের কাজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আগে প্রতিদিন কোটি টাকার মাছ সরবরাহ হলেও এখন তা প্রায় বন্ধ।
মহিপুরের একটি ফিলিং স্টেশনের ডিলার মো. রাজু আহমেদ জানান, প্রতিদিন ট্রলারের চাহিদা ৩০-৩৫ হাজার লিটার হলেও তিনি পাচ্ছেন মাত্র ৪-৫ হাজার লিটার। ফলে সবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
অন্যদিকে মেঘনা অয়েলের ডিলার আবুল কালাম মৃধা জানান, আগের তুলনায় তিনি এখন মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ জ্বালানি পাচ্ছেন। এতে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না।