
বাবার দ্বিতীয় বিয়ের পর মো. নাইম শেখের আর সেই বাড়িতে থাকার জায়গা হয়নি। মা ফাতেমা বেগমকে নিয়ে তিনি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার কুমারখালি গ্রামে ভাড়া থাকতেন। কয়েক বছর আগে বিয়ে করেন নাইম। ১৬ মাস আগে মেয়ে নওশীন নাইম নুসাইবার জন্ম হয়। মা, মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর সংসার ছিল। ভাড়ায় গাড়ি চালিয়েই চলত সংসার।
গত বুধবার দুই দিনের জন্য একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গাড়ি ভাড়া করা হয়। সেদিন বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মেয়েকে আদর করে নাইম স্ত্রী কবিতাকে বলেছিলেন, ‘বাড়ি ফিরে সবার জন্য ঈদের কেনাকাটা করব।’ তিনি ঠিকই বাড়ি ফিরেছেন, তবে লাশ হয়ে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নবদম্পতি ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে মাইক্রোবাসচালক মো. নাইম শেখ নিহত হন। তাঁকে হারিয়ে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক।
নাইম রামপাল উপজেলার জিগিরমোল্লা গ্রামের মনিরুল ইসলামের ছেলে। ২০১৯ সালে মোরেলগঞ্জ উপজেলার শনিরজোর গ্রামের কবির হোসেনের মেয়ে কবিতা আক্তারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্ত্রীকে পড়াশোনা করান তিনি। কবিতা বাগেরহাট সরকারি প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) করেছেন। এখন তিনি মোংলা ইপিজেডের একটি প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।
সোমবার দুপুরে কুমারখালি গ্রামের শিকারি মোড়ে ভাড়া বাড়ির উঠানে খেলছিল নাইম-কবিতার একমাত্র মেয়ে নুসাইবা। মাঝেমধ্যে আধো গলায় মাকে ডাকে, কোলে উঠে ‘বাববা, বাববা’ বলে বাবাকে খোঁজে। সে এখনো বুঝতে পারেনি, তার বাবা আর ফিরবেন না। বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন নাইমের স্ত্রী, মা ও শ্বশুরবাড়ির কয়েকজন আত্মীয়। স্বামীকে হারিয়ে কবিতা যেন শোকে পাথর হয়ে গেছেন, চোখে আর পানি নেই।
কবিতা আক্তার বলেন, ‘শ্বাশুড়ি ও আমরা তিনজন মিলে মোংলায় ভাড়া বাসায় থাকি। আমাদের কোনো জমিজায়গা নেই। আমার শ্বশুর দ্বিতীয়বার বিয়ে করার কারণে আমার শাশুড়িকে দেখেন না। আমার সংসারে উপার্জন করার মতো আর কেউ নেই। আমার ছোট একটি বাচ্চা আছে। আমার সব শেষ...। এখন আমার বাচ্চা ও শাশুড়ির ভরণপোষণের সব দায়িত্ব আমার ওপর।’
নাইমের ছোট চাচি আজমিরা বেগম বলেন, ‘নাইম ড্রাইভারি করে টাকা ইনকাম করত, সেই টাকা দিয়ে সংসার চালাত। নাঈমের মা, স্ত্রী ও মেয়েটা খুবই অসহায় হয়ে পড়েছে। ওদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। নাইমের বউ কবিতা তো লেখাপড়া জানে। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, ওকে যেন একটা ভালো কাজের ব্যবস্থা করে দেয়, যাতে মেয়েটাকে নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে পারে।’
খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর স্টাফ বাস ও যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১৪ জনের একজন ছিলেন নাইম। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার রাতেই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই ১৪টি মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।