
সকালে অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নামেন তিনি। দিনভর গাড়ি চালিয়ে করেন আয়। দিন শেষে মালিকের কাছে অটোরিকশার ভাড়া পরিশোধ করে আয়ের যা অবশিষ্ট থাকে, তা নিয়েই ফেরেন ঘরে। এত দিন এভাবেই চলে আসছিল অটোরিকশাচালক আবু তৈয়বের। তবে দুই দিন ধরে তাঁর দিন শুরু হচ্ছে ফিলিং স্টেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে। দিনের বড় অংশ সেখানে শেষ হচ্ছে গ্যাসের অপেক্ষায়।
আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় নগরের আকবরশাহ এলাকার পাহাড়িকা সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে আবু তৈয়বের সঙ্গে কথা হয়। জানালেন, ভোর চারটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। পাঁচ ঘণ্টা পার হলেও গ্যাস পাননি। রাত কেটেছে গাড়িতেই। সকালে হোটেলে নাশতা করেছেন। কিন্তু সেই খরচটুকু উঠবে কি না, তা–ও জানেন না। আবু তৈয়ব প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্যাস নিতে নিতেই অর্ধেক দিন চলে যায়। এরপরে রাস্তায় নেমে আর কত টাকা ভাড়া মারব? মালিককে জমা দিতে হবে, সংসারও চালাতে হবে।’
গ্যাস নিতে নিতেই অর্ধেক দিন চলে যায়। এরপরে রাস্তায় নেমে আর কত টাকা ভাড়া মারব? মালিককে জমা দিতে হবে, সংসারও চালাতে হবে।আবু তৈয়ব, অটোরিকশার চালক।
শুধু আবু তৈয়ব নন, তাঁর মতো শত শত সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকের কর্মঘণ্টা এখন গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে নষ্ট হচ্ছে। একই সংকটে পড়েছেন গ্যাসচালিত বাস, মাইক্রোবাসসহ অন্যান্য যানবাহনের চালকেরাও।
সরেজমিনে পাহাড়িকা, ষোলশহরের ফসিলসহ নগরের কয়েকটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, শত শত গাড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ চার ঘণ্টা, কেউ পাঁচ ঘণ্টা, আবার কেউ ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না।
পাহাড়িকা ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মোহাম্মদ আবুল কাশেম বলেন, ‘গতকাল আট ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নিয়েছি। দুই ঘণ্টা চালানোর পরই গ্যাস শেষ। আজ আবার ভোর ছয়টায় লাইনে দাঁড়িয়েছি। কখন গ্যাস পাব জানি না। এখন চাহিদামতো গ্যাসও পাওয়া যাচ্ছে না।’
ফসিল ফিলিং স্টেশনের সামনে অপেক্ষমাণ চালকেরা বলেন, আগে ২০ থেকে ৩০ মিনিটেই গ্যাস নিয়ে রাস্তায় নামা যেত। এখন গ্যাস নিতেই চলে যাচ্ছে দিনের বড় অংশ। ফলে যাত্রী পরিবহনের সময় কমছে, কমছে আয়ও।
চালকদের ভাষ্য, অনেকেই দৈনিক নির্ধারিত জমা তুলতে পারছেন না। কেউ ধার করে সংসার চালাচ্ছেন। আবার কেউ অতিরিক্ত সময় ও খরচ পুষিয়ে নিতে যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া চাইছেন।
এবারের সংকটের মূল কারণ মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড। ২১ জুলাই একসিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালটিতে আগুন লাগার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা দেখছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম থেকে ফতেয়াবাদ রুটে চলাচলকারী একটি মিনিবাসের চালক মো. নাহিদ বলেন, ‘সাধারণ দিনে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় হয়। গতকাল মাত্র ৬০০ টাকা নিয়ে বাসায় ফিরেছি। আজ আয় আরও কম হবে বলে মনে হচ্ছে।’
পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একজন গ্যাসচালিত যানবাহনের চালক সাধারণত দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা রাস্তায় থাকেন। কিন্তু তার মধ্যে যদি পাঁচ-ছয় ঘণ্টাই ফিলিং স্টেশনের লাইনে কেটে যায়, তাহলে কর্মঘণ্টার প্রায় অর্ধেকই হারিয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে চালকদের আয় কমছে, অন্যদিকে রাস্তায় সিএনজিচালিত যানবাহনের কার্যকর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। যাত্রীদের অপেক্ষার সময় বাড়ছে, কোথাও কোথাও অতিরিক্ত ভাড়াও গুনতে হচ্ছে।
এবারের সংকটের মূল কারণ মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড। ২১ জুলাই একসিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালটিতে আগুন লাগার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা দেখছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, আজ সকাল আটটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে মাত্র ১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস। অথচ তাদের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রায় ১৬ কোটি ঘনফুট ঘাটতি নিয়েই সরবরাহ চালাতে হচ্ছে। আগের দিনও একই পরিমাণ, অর্থাৎ ১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।
এই ঘাটতির কারণে বিভিন্ন খাতে গ্যাস সরবরাহ সীমিত করতে হচ্ছে। কেজিডিসিএলের তথ্যমতে, দৈনিক প্রায় ১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস যায় বিদ্যুৎকেন্দ্রে, প্রায় ৯ কোটি ঘনফুট শিল্পকারখানায়, প্রায় ৬ কোটি ঘনফুট আবাসিক গ্রাহকদের কাছে এবং প্রায় ৫ কোটি ঘনফুট সিএনজি খাতে। বর্তমানে বরাদ্দ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ, শিল্প, আবাসিক ও সিএনজি—সব খাতেই চাপ কমিয়ে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকেরা।
কেজিডিসিএলের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় পেট্রোবাংলার বরাদ্দ অনুযায়ী গ্যাস বিতরণ করতে হচ্ছে। তাই কোনো খাতেরই পূর্ণ চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। টার্মিনালে মেরামত কাজ চলছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে টার্মিনাল চালুর চেষ্টা করছে বিশেষজ্ঞ দল। আশা করা যাচ্ছে, এ সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।