
হবিগঞ্জের হাওরে বৃষ্টির পানিতে জমিতে কেটে রাখা ধানের স্তূপে পচন ধরেছে। একই কারণে মাড়াই করা ধানও শুকানো যাচ্ছে না। এদিকে আজ সোমবার সকালে আবারও বৃষ্টি হওয়ায় কৃষকদের ভোগান্তি বেড়েছে।
গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর বাঁধ উপচে হবিগঞ্জের বিভিন্ন হাওরাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই, নবীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলার ফসলি জমি পানির নিচে। পাশাপাশি জেলার বৃহত্তম গুংগিয়াজুরী হাওর ডুবে আছে।
জেলার ছয়টি উপজেলার প্রায় ৪৫ ভাগ জমির বোরো ধান এখন পানির নিচে। জেলা কৃষি অফিসের হিসাবে ১০–১২ হাজার হেক্টর জমির ধান ডুবে গেছে। গত এক সপ্তাহে এ জেলায় বৃষ্টির পরিমাণ ২০০ মিলিমিটারের ওপরে।
এদিকে আজ সকালে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। আজ বেলা দুইটা পর্যন্ত ২৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এতে নতুন করে ভোগান্তিতে পড়েন কৃষকেরা। সকালে বানিয়াচং উপজেলার শতমুখা হাওরে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকেরা পানিতে ডুবে থাকা জমি থেকে ধান কেটে উঁচু জায়গায় স্তূপ করে রাখছেন। কয়েকজন কৃষক জানান, এক সপ্তাহ ধরে রোদ নেই। মাঝেমধ্যে সূর্যের আলো ঝলক দিলেও পরে তা মিলিয়ে যায়।
অনেকে কোমরসমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন। কাটা ধান কাঁধে তুলে এনে উঁচু জায়গায় জমা করছেন। ভেজা ধান থেকে বের হচ্ছে পচা গন্ধ। শতমুখা গ্রামের কৃষক আবদুল করিম (৪৫) ধানের স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এক সপ্তাহ ধইরা রোদ দেখি না। একটু রোদ উঠলেই ভাবি বাঁচলাম, কিন্তু আবার কালো মেঘে সব ঢেকে যায়। এখন ধান কাটতেছি, কিন্তু শুকাইতে পারতেছি না। ঘরে নিতেও পারতেছি না ওই ভেজা ধান।’
পাশেই ছিলেন কৃষক ছালেক মিয়া (৫০)। তিনি পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছিলেন। কাছে যেতেই আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ‘আমরারে দেখতা আইছইন। আমরার কষ্টর শেষ নাই। কষ্ট করে যে ফলন ফলাইছলাম। অখন চোখর ফলক পচন ধরছে। আল্লাহ জানইন, ইবার কিতা খাইয়া বাঁচমু।’
আরেক কৃষক জহির উদ্দিন (৩৮) গাদা থেকে একমুঠো ধান তুলে দেখালেন। তিনি বলেন, ‘দানাগুলো কালচে হয়ে গেছে। এটা আর ধান না, নষ্ট হয়ে গেছে। বাজারে কেউ নিবে না, এমনকি তা গরুও খাবে না।’
সমস্যা শুধু ডুবে থাকা ধান নয়। যেসব ধান কেটে আনা হয়েছে, সেগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। মাড়াই করা ধানও শুকাতে না পারায় একইভাবে পচন ধরেছে। কৃষকেরা বলছেন, বৃষ্টির পানিতে জমি তলিয়ে গেছে। এতে ধান কাটতে দেরি হচ্ছে। এখন ধান কাটলেও শুকানোর সুযোগ নেই। মাঠে রেখে দিলে পানিতে ডুবে যায়, আর উঁচুতে রাখলেও টানা বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
শতমুখা গ্রামের বৃদ্ধ কৃষক হাফিজ উদ্দিন (৬৫) ধানখেতের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এবার শুধু বাঁচার জন্য ধান কাটছি। পানি থেকে কিছু ধান উদ্ধার করতে না পারলে ঘরে খাবার থাকবে না।’