
মানুষের মুক্তিই ছিল বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের দর্শন ও গানের মূল কথা। জীবনভর সাম্য, সম্প্রীতি ও মানুষের জয়গান গেয়েছেন তিনি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর গান প্রেরণা জুগিয়েছে। শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে এখনো তাঁর গান মানুষকে জাগায়।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে গতকাল দুই দিনব্যাপী শাহ আবদুল করিম লোক উৎসবের উদ্বোধনী আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা। তাঁদের মতে, শাহ আবদুল করিমের সৃষ্টিকর্মের চর্চা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের ১১০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর জন্মস্থান সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে গতকাল থেকে এ উৎসব শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও শাহ আবদুল করিম পরিষদ যৌথভাবে এর আয়োজন করেছে।
বসন্তের পড়ন্ত বিকেলে করিমের বাড়ি থেকে শাহ আবদুল করিমের বিখ্যাত গান ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান আর মুরশিদী গাইতাম, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম...’ গেয়ে হেঁটে হেঁটে উৎসবস্থলে আসেন একদল বাউল। মাঠজুড়ে ছিল হাজারো মানুষের ভিড়। বাড়ির দক্ষিণ পাশে কালনী নদীর তীরে করচগাছের নিচে ছোট ছোট দলে আগেই বসে গানের আসর। সেই সুর ছড়িয়ে পড়ে উজানধলের বাতাসে, নদীর ঢেউয়ে। উৎসব ঘিরে করিমের বাড়ি ও কালনী নদীর তীরে ভক্ত-অনুরাগীদের এক মিলনমেলা বসেছে।
রাত আটটায় সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়ার সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন, দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার ও তাড়ল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী আহমদ। স্বাগত বক্তব্য দেন শাহ আবদুল করিম পরিষদের সভাপতি ও তাঁর ছেলে বাউল শাহ নূর জালাল।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, শাহ আবদুল করিম ছিলেন ক্ষণজন্মা মানুষ। তাঁর জীবনধর্মী, আধ্যাত্মিক ও মর্মস্পর্শী গান মানুষকে নাড়া দেয়। সহজিয়া জীবনবোধ, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও প্রকৃতির প্রতি মমত্ব তাঁর গানে ফুটে উঠেছে। তিনি যেমন মানুষকে ভালোবাসতেন, তেমনি মানুষও তাঁকে ভালোবাসত। সেই টানেই মানুষ উজানধলে ছুটে আসে।
শাহ আবদুল করিম উজানধলের বসন্তের বাতাসে, কালনী নদীর জলে-ঢেউয়ে মিশে আছেন জানিয়ে নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মানুষই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। এই লোক উৎসব সাম্য ও মৈত্রীর মিলনমেলা। শুদ্ধ স্বর ও কথায় তাঁর গান পরিবেশন করা প্রয়োজন—এটা তিনি নিজেও চাইতেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, সুনামগঞ্জ বাউল, সাধক ও গুণীজনের জন্মভূমি। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ এ জেলায় শাহ আবদুল করিম সাধারণ কথায় অসাধারণ বিষয় তুলে ধরেছেন। তাঁর সৃষ্টি সংরক্ষণে প্রশাসন পাশে থাকবে।
উদ্বোধন শেষে মঞ্চে করিমের জনপ্রিয় গান পরিবেশন করেন তাঁর শিষ্য ও অনুরাগীরা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা সেই গানে মুগ্ধ হন। ‘বসন্ত বাতাসে সই গো...’, ‘বন্ধুরে কই পাগো সখি গো...’, ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান...’, ‘আমি বাংলা মায়ের ছেলে...’, ‘বন্ধে মায়া লাগাইছে...’, ‘গাড়ি চলে না রে...’, ‘তুমি আমার আমি তোমার...’, ‘কেন পিরিতি বাড়াইলা রে বন্ধু...’, ‘তুমি বিনে আকুল পরাণ...’, ‘তুমি মানুষ আমি মানুষ...’, ‘আসি বলে গেল বন্ধু আইল না...’সহ তাঁর জনপ্রিয় গান পরিবেশিত হয়। আজ শনিবার এ উৎসবের সমাপ্তি হওয়ার কথা।
বাংলা লোকসংগীতের এই কিংবদন্তি বাউলকে স্মরণে ২০০৬ সাল থেকে এ উৎসব আয়োজন করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্ত, সাধক ও সংগীতপ্রেমীদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে উজানধল গ্রাম। এ গ্রামেই ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন শাহ আবদুল করিম। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।