গতকাল সোমবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলা এই ধ্বংস কার্যক্রমে হাসপাতাল এলাকা ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে যায়
গতকাল সোমবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলা এই ধ্বংস কার্যক্রমে হাসপাতাল এলাকা ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে যায়

হাসপাতালের উন্মুক্ত চত্বরে পোড়ানো হলো মেয়াদোত্তীর্ণ চিকিৎসাসামগ্রী

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে মেয়াদোত্তীর্ণ এন-৯৫ মাস্ক, পিপিইসহ বিপুল পরিমাণ নানা চিকিৎসাসামগ্রী পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। এতে ছড়িয়ে পড়া তীব্র কালো ধোঁয়ায় ভোগান্তিতে পড়েন রোগী, তাঁদের স্বজন, চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যরা।

প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানান, গতকাল সোমবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলা এই ধ্বংস কার্যক্রমে হাসপাতাল এলাকা ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। ধোঁয়ার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে অনেকের কাশি ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দেয়। আগুনের তাপে হাসপাতাল চত্বরে থাকা কয়েকটি গাছও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নগরকান্দা থেকে স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে আসা আমিনুল হক বলেন, ‘হঠাৎ করেই চারদিকে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। এতে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, চোখ জ্বলছিল।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় এসব সামগ্রী পোড়ানো হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়েই এই ধ্বংস কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। তবে কোন কোন সামগ্রী তালিকাভুক্ত ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ও ধ্বংসকরণ কমিটির সদস্যসচিব ওমর ফয়সাল বলেন, সর্বশেষ ২০১৬ সালে এ ধরনের সামগ্রী ধ্বংস করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন ওয়ার্ডে জমে থাকা মেয়াদোত্তীর্ণ ও ব্যবহার অযোগ্য এমএসআর (মেডিকেল, সার্জিক্যাল ও রেডিওলজিক্যাল) লিনেন সামগ্রী কনডেমনেশন কমিটির মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। অনুমোদন পাওয়ার পর জেলা প্রশাসন, গণপূর্ত ও পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এসব সামগ্রী পোড়ানো হয়েছে। তিনি জানান, ১৬টি আইটেমের মোট ৩৯ হাজার ৫৭০টি সামগ্রী ধ্বংস করা হয়েছে। তবে অনুমোদনপত্র বা পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানান, হাসপাতালের নতুন ৯ তলা ভবনের মাত্র ২০-৩০ মিটার দূরে খোলা জায়গায় এসব সামগ্রী পোড়ানো হয়। এতে সৃষ্ট ধোঁয়া আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্তত দুটি নারকেলগাছসহ কয়েকটি গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, কার্টনভর্তি পিপিই ও কেএন-৯৫ মাস্ক প্যাকেটসহ পোড়ানো হচ্ছে। পিপিইর প্যাকেটে উল্লেখ ছিল, প্রতিটি প্যাকেটে ৫০টি করে পিপিই, যার মোট ওজন প্রায় সাড়ে ১৩ কেজি। এসব সামগ্রী ২০২০ সালে চীন থেকে আমদানি করা হয়েছিল এবং দুই বছরের মেয়াদ উল্লেখ ছিল। পাশাপাশি বিছানার চাদর, বালিশের কভার, পর্দাসহ বিভিন্ন ব্যবহার অনুপযোগী সামগ্রীও পোড়ানো হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল উপস্থিত ছিল। ফরিদপুর ফায়ার সার্ভিসের টিম লিডার নিছার হোসেন বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুরোধে তাঁরা সেখানে অবস্থান নিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেন।

তবে খোলা জায়গায় এভাবে মেডিক্যাল বর্জ্য পোড়ানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, মেডিক্যাল বর্জ্য (ম্যানেজমেন্ট) বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী এ ধরনের বর্জ্য নির্দিষ্ট নিরাপদ পদ্ধতিতে, বিশেষ করে ইনসিনারেটরের মাধ্যমে ধ্বংস করার কথা। খোলা স্থানে পোড়ানো এ বিধিমালার পরিপন্থী। এ ছাড়া বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী পরিবেশদূষণ সৃষ্টিকারী কার্যক্রম দণ্ডনীয় অপরাধ। একই সঙ্গে দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী জনদুর্ভোগ সৃষ্টি ও বায়ুদূষণের ঘটনাও শাস্তিযোগ্য।

ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সভাপতি আওলাদ হোসেন বলেন, মেডিক্যাল বর্জ্য অপসারণের নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এমন অনিয়ম প্রত্যাশিত নয়।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইন ভঙ্গ করেছে জানিয়ে জেলার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাঈদ আনোয়ার বলেন, বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা–২০২২ অনুযায়ী মেডিক্যাল বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে সংরক্ষণ ও পোড়ানো যাবে না। এ বিধিমালা লঙ্ঘন করলে অনূর্ধ্ব দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান আছে।