
খুলনায় গতকাল সোমবার রাত থেকে আজ মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত প্রায় ১৭ ঘণ্টার ব্যবধানে গুলি করার তিনটি ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে বটিয়াঘাটা উপজেলায় পৃথক দুই স্থানে গুলিতে আহত হয়েছেন যুবদলের সাবেক দুই নেতা। আর খুলনা নগরে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বেসরকারি কোম্পানির এক কর্মী। তাঁর সঙ্গে থাকা ল্যাপটপের ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। আহত তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
গতকাল দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে বটিয়াঘাটার বড় কড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে যুবদল নেতা সোহেল শেখকে (৩৪) গুলি করে দুর্বৃত্তরা। আজ বেলা সোয়া ১১টার দিকে খুলনা নগরের নিরালা আবাসিক এলাকার ১৭ নম্বর সড়কে জাপান টোব্যাকো কোম্পানির ডিলার পয়েন্টের সামনে গুলি করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া আজ সন্ধ্যায় বটিয়াঘাটার চক্রাখালী বাজারসংলগ্ন এলাকায় অহিদুল ইসলাম ওরফে বাদল (৩৫) নামে যুবদলের এক সাবেক নেতাকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা।
গুলি করে পালিয়ে গেল দুর্বৃত্তরা
আহত সোহেল শেখ বটিয়াঘাটার বড় কড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা গনি শেখের ছেলে। তিনি উপজেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গতকাল রাতে তিনি মোটরসাইকেলে বসে ছিলেন। এ সময় দুর্বৃত্তরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। তাঁর ডান হাত ও পেটের ডান পাশে গুলি লাগে। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে সার্জারি ইউনিটে তাঁকে ভর্তি করা হয়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
সোহেল শেখের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন, মারামারিসহ ১১টি মামলার তথ্য আছে পুলিশের কাছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবির সিদ্দিকী বলেন, সোহেলকে গুলির ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় মামলা হয়নি। হামলার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।
ল্যাপটপের ব্যাগ ছিনতাই
অন্যদিকে নগরের নিরালা আবাসিক এলাকার সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা সালমান (২৫) জাপান টোব্যাকো কোম্পানির ডিলার পয়েন্টের অফিস সহকারী। আজ বেলা সোয়া ১১টার দিকে তিনি ডিলার পয়েন্টের সামনে ছিলেন। এ সময় দুটি মোটরসাইকেলে করে পাঁচজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি সেখানে আসেন। তারা সালমানকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে তাঁর পেটের ডান পাশে গুলি লাগে। এরপর দুর্বৃত্তরা তাঁর সঙ্গে থাকা ল্যাপটপের ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
পরে সহকর্মীরা সালমানকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। জাপান টোব্যাকোর এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিন ওই সময় কর্মচারীরা টাকার ব্যাগ নিয়ে ব্যাংকে যেতেন। তবে আজ সালমান ওই ব্যাগে ল্যাপটপ নিয়ে বের হয়েছিলেন। ছিনতাইকারীরা তাঁকে গুলি করে ব্যাগটি নিয়ে যায়।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লোকমান হোসেন বলেন, চিকিৎসকেরা আহত সালমানকে আশঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন। এ ঘটনায় দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ওই কর্মীর কাছ থেকে টাকার ব্যাগ নেওয়াই ছিনতাইকারীদের উদ্দেশ্য ছিল। তবে তাঁরা টাকা নিতে পারেননি। এ ঘটনায় মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মামলা হয়নি।
মোটরসাইকেলে এসে গুলি
এদিকে বটিয়াঘাটায় আজ সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে যুবদলের সাবেক নেতা অহিদুল ইসলাম ওরফে বাদলকে (৩৫) গুলি করে দুর্বৃত্তরা। উপজেলার ১ নম্বর জলমা ইউনিয়নের চক্রাখালী বাজারসংলগ্ন বাদশার দোকানের সামনে এ ঘটনা ঘটে। খুলনা জেলা যুবদল আয়োজিত যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি শেষে খুলনা থেকে তিনি নিজ এলাকার দিকে যাচ্ছিলেন।
আহত অহিদুল ইসলাম বাদল বটিয়াঘাটা উপজেলার তেঁতুলতলা গ্রামের আলতাফ হাওলাদারের ছেলে। তিনি জলমা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি এবং ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি পদপ্রার্থী।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে এসে অহিদুল ইসলামকে গুলি করে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
ঘটনার খবর পেয়ে বটিয়াঘাটা থানা-পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবির সিদ্দিকী শুভ্র জানান, হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছে।
এর আগে ২৪ অক্টোবর খুলনায় একই দিনে গুলি, হামলা ও ভাঙচুরের তিনটি পৃথক ঘটনা ঘটে। ওই দিন সকালে তেরখাদা উপজেলায় যুবদলের সাবেক নেতা রামিম বিশ্বাস (৩২) গুলিবিদ্ধ হন। মোটরসাইকেলে এসে দুর্বৃত্তরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। ওই দিন সন্ধ্যায় নগরের দক্ষিণ টুটপাড়া গাছতলা এলাকায় নিজের দোকানে বসে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন কলেজশিক্ষক ধনঞ্জয় কুণ্ডু ওরফে আকাশ কুণ্ডু (৪৫)। ওই ঘটনার পেছনে চাঁদাবাজির কারণ রয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। রাতে নগরের বাবু খান রোডে সন্ধানী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে মুখোশধারী একদল দুর্বৃত্ত। যাওয়ার সময় তারা একটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে।
১০ মাসে ৭১ খুন
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে খুলনায় গুলি, কুপিয়ে বা অন্য উপায়ে ৭১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬৯টি। একই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি নিহত হওয়ায় মামলা ও নিহত ব্যক্তির সংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের পেছনে অস্ত্র ও মাদক কারবার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, পূর্বশত্রুতা ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ কাজ করেছে।