৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি চালুর সাড়ে পাঁচ বছরেই বন্ধ হয়ে পড়ায় শোধন ছাড়াই সরাসরি পানি যাচ্ছে গ্রাহকদের ঘরে।
মাগুরা পৌর এলাকায় সরবরাহ করা পানির মান নিয়ে দিন দিন বাড়ছে অভিযোগ। কেউ সময়মতো ও চাহিদার পর্যাপ্ত পানি পান না। কারও বাড়িতে সকালে প্রথম এক-দেড় ঘণ্টা দুর্গন্ধযুক্ত ও নোংরা পানি আসে। এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে অকেজো হয়ে পড়া একমাত্র পানি শোধনাগার। ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি চালুর সাড়ে পাঁচ বছরেই বন্ধ হয়ে পড়ায় শোধন ছাড়াই সরাসরি পানি যাচ্ছে গ্রাহকদের ঘরে।
পৌরসভার সরবরাহ করা পানির মান নিয়ে ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর ৯টি ওয়ার্ডের অন্তত ১০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। প্রতিটি এলাকার বাসিন্দারা পানি নিয়ে কোনো না কোনো অভিযোগ করেছেন। পানি শোধনাগারের বিষয়ে মাগুরা পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান বারি প্রথম আলোকে বলেন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও অভিজ্ঞ জনবলের অভাবে শোধনাগারটি যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং সঠিক সময়ে ফিল্টার উপাদান পরিবর্তন করা যায়নি।
পৌরসভার কলেজ পাড়ার বাসিন্দা সজীব আহমেদের অভিযোগ, গত কয়েক বছর সকালে প্রথম এক থেকে দেড় ঘণ্টা লাইন দিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত পানি আসে। ফলে ওই সময়ের পানি ব্যবহার করা যায় না। তিনি বলেন, সকালে এক–দেড় ঘণ্টা পানি ফেলে দেওয়ার পর যে পানি আসে, সেটা ব্যবহার করা যায়। এই পানিতে যেকোনো সময় পরিবারের সদস্যরা জটিল কোনো রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
একমাত্র পানি শোধনাগার বন্ধ ২০ মাস
মাগুরা পৌরসভার বাসিন্দাদের সুপেয় পানি সরবরাহ করতে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে শিমুলিয়া এলাকায় চালু হয় পানি শোধনাগার প্রকল্প। ৩৭ জেলা শহরে পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় ৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। নির্মাণের পর এটি পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়। চারটি পাম্পের মাধ্যমে এ শোধনাগারে ঘণ্টায় ৩৫০ ঘনমিটার পানি শোধনের সক্ষমতা ছিল।
পানির সংযোগ নিয়ে খুব বিপদে আছি। বিচ্ছিন্নও করতে পারছি না। জোর করেই বিল দিয়ে যাচ্ছি। এত পরিমাণে আয়রন যে বাসার পুরো পানির লাইন ব্লক হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে অনেক ঘোলা, কালো পানি আসে।মেহেদী হাসান, স্থানীয় বাসিন্দা
প্রকৌশলীরা বলছেন, প্রকল্পটি চালুর পর আয়রন, আর্সেনিকসহ সব ধরনের ক্ষতিকারক উপাদানমুক্ত সুপেয় পানি সরবরাহ শুরু হয় পৌর এলাকায়। তবে পানি শোধনাগার প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অকেজো হয়ে পড়ে। এর পর থেকে শোধন না করেই ভূগর্ভস্থ পানি সরাসরি বিকল্প লাইনের মাধ্যমে শহরে সরবরাহ শুরু হয়।
১৪ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে পানি শোধনাগার প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, যেখানে পানি শোধন হতো, সেখানে ময়লার গাঢ় আস্তরণের পাশাপাশি ঘাস-লতাপাতা জন্মেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থেকে জেনারেটরসহ অনেক সরঞ্জাম বিকল হয়ে পড়ে আছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নির্দিষ্ট সময় পর ফিল্টার উপাদান পরিবর্তন ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না করায় শোধনাগারটি দ্রুত ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। নতুন ফিল্টার উপাদান বসিয়ে এটি আবার চালু করতে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা প্রয়োজন।
পৌর এলাকায় পানির মোট গ্রাহক প্রায় ৪ হাজার ২০০। সরবরাহ লাইন আছে প্রায় ১০০ কিলোমিটার। সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৯টা এবং দুপুর ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত পানি সরবরাহ করা হয়।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান বারি মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেভেন টাউন ওয়াটার সাপ্লাই’ প্রকল্পের আওতায় পুরোনো শোধনাগারটি সংস্কারের পাশাপাশি নতুন দুটি শোধনাগার নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া পুরো পৌর এলাকায় আড়াই শ কিলোমিটার নতুন পানির লাইন স্থাপন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পানি নিয়ে বিদ্যমান সংকটের সমাধান হবে। এর স্বল্পমেয়াদি তেমন কোনো সমাধান নেই।
৩০ বছরের পুরোনো পানির লাইন
পৌরসভার পানি শাখায় কথা বলে জানা গেছে, পৌর এলাকায় পানির মোট গ্রাহক প্রায় ৪ হাজার ২০০। সরবরাহ লাইন আছে প্রায় ১০০ কিলোমিটার। সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৯টা এবং দুপুর ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত পানি সরবরাহ করা হয়। প্রতিটি সংযোগের জন্য ৩০০ টাকা বিল আদায় করা হয়। গ্রাহকের কাছ থেকে মাসে ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকা বিল পায় পৌর কর্তৃপক্ষ।
শহর অংশে যে পানির লাইন রয়েছে, সেগুলো অন্তত ৩০ বছরের পুরোনো। সেগুলো মাটির প্রায় সাত থেকে আট ফুট নিচে দিয়ে গেছে। এগুলো পরিষ্কার করার কোনো উপায় নেই।আবু মো. আল আরাম, মাগুরা পৌরসভার পানি শাখার দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী
পানির বিল আদায়ের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গ্রাহকেরা পর্যাপ্ত ও নিরাপদ পানি না পাওয়ার অভিযোগ করছেন প্রতিনিয়ত। এখন যে পরিমাণ গ্রাহক পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে চাইছেন, অতীতে এমনটা দেখা যায়নি।
জানতে চাইলে মাগুরা পৌরসভার পানি শাখার দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী আবু মো. আল আরাম প্রথম আলোকে বলেন, শহর অংশে যে পানির লাইন রয়েছে, সেগুলো অন্তত ৩০ বছরের পুরোনো। সেগুলো মাটির প্রায় সাত থেকে আট ফুট নিচে দিয়ে গেছে। এগুলো পরিষ্কার করার কোনো উপায় নেই।
এই কর্মকর্তা বলেন, নালা পরিষ্কার বা অন্য কাজে নিয়োজিত কর্মীরা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এই লাইনের কোনো জায়গা হয়তো কেটে বা ভেঙে ফেলেছেন। ফলে বিদ্যুৎ না থাকলে বা পাম্প বন্ধ করা হলে ওই ভাঙা লাইন দিয়ে নালার নোংরা পানি ভেতরে ঢোকে। জমা হওয়া সেই দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা পানিই পরে আবার পাম্প চালুর সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকদের বাসাবাড়িতে যাচ্ছে।
পুলিশ লাইনস পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা মেহেদী হাসান বলেন, ‘পানির সংযোগ নিয়ে খুব বিপদে আছি। বিচ্ছিন্নও করতে পারছি না। জোর করেই বিল দিয়ে যাচ্ছি। এত পরিমাণে আয়রন যে বাসার পুরো পানির লাইন ব্লক হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে অনেক ঘোলা, কালো পানি আসে।’