কারও মুখভরা কেওড়া, কারও হাতে আধখাওয়া ফল। কেউ লাফিয়ে যাচ্ছে এক ডাল থেকে আরেক ডালে, কেউ আবার নিশ্চিন্তে বসে চিবোচ্ছে। ফল নিয়ে কাড়াকাড়ি, ছোটাছুটি আর দুষ্টুমিতে মুখর কেওড়ার বন। চকচকে লোম আর টগবগে শরীর দেখে মনে হয়, বনে বানরদের উৎসব চলছে। উপলক্ষ কেওড়া ফলের ভোজ।
সুন্দরবনে এখন কেওড়ার মৌসুম প্রায় শেষ। বেশির ভাগ গাছের ফল ঝরে গেছে। তবু কিছু গাছে এখনো ফল ঝুলছে, আর সেই ফলের খোঁজে গাছে গাছে ঘুরছে বানরের দল। একটি ফল ছিঁড়ে খেয়েই চলে যাচ্ছে পাশের ডালে। খাবারের এমন প্রাচুর্যে এ সময় তাদের শরীরও বেশ হৃষ্টপুষ্ট।
গত বৃহস্পতিবার সকালে কয়রা নদীর তীরের একটি কেওড়ার বনে দেখা গেল এই দৃশ্য। তবে মানুষের উপস্থিতি টের পেতেই ডালপালা পেরিয়ে গহিন বনে মিলিয়ে গেল বানরের দলটি। পড়ে রইল শুধু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কেওড়ার টুকরো, যেন একটু আগের জমজমাট ভোজের সাক্ষী।
কয়রা নদীতে তখন মাছ ধরছিলেন জেলে আসাদুল সরদার। তিনি বলেন, কেওড়ার ফল এখন প্রায় শেষ। শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন মাস পর্যন্ত বনে এই ফল বেশি পাওয়া যায়। জেলেরা এই ফল দিয়ে ডাল রান্না করেন। আবার ফল সেদ্ধ করে বড়শিতে গেঁথে মাছও ধরেন। বানরের প্রসঙ্গে তাঁর কথা, এই সময়ে ওরা কেওড়া খায়, শরীরও মোটাতাজা হয়।
এখন কার্তিক মাস চলে। এ সময় পর্যন্ত কেওড়া ফল খায়ে বানরগুলো বেশ টগবগি থাকে। ফল ফুরাই গেলি গাছের কচি পাতা, ঘাস, এমনকি নদীর ধারের কাঁকড়াও খায়। তখন শরীরে আর মেদ থাকে না, অনেকটা শুকাই যায়।—ইকরামুল গাজী, জেলে
আরেক জেলে ইকরামুল গাজীও একই কথা বলেন। তাঁর ভাষায়, ‘এখন কার্তিক মাস চলে। এ সময় পর্যন্ত কেওড়া ফল খায়ে বানরগুলো বেশ টগবগি থাকে। ফল ফুরাই গেলি গাছের কচি পাতা, ঘাস, এমনকি নদীর ধারের কাঁকড়াও খায়। তখন শরীরে আর মেদ থাকে না, অনেকটা শুকাই যায়।’
সুন্দরবনে বানর আর হরিণের সম্পর্কটাও বেশ অদ্ভুত। জেলেদের ভাষ্য, বানর গাছের ডাল থেকে ফল ও পাতা ছিঁড়ে নিচে ফেলে। নিচে থাকা হরিণ সেগুলো খায়। বিপদেও তারা একে অন্যের কাজে আসে। বাঘের উপস্থিতি টের পেলে উঁচু ডালে বসে চিৎকার করে ওঠে বানর। সেই ডাক শুনে সতর্ক হয়ে যায় হরিণের দল।
গত রোববার দুপুরে খোলপেটুয়া নদীর তীরে কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রেও দেখা গেল বানরের চঞ্চলতা। দল বেঁধে গাছের ডালে ছোটাছুটি, একে অন্যকে তাড়া করা আর চেঁচামেচি করছে তারা। মুগ্ধ চোখে সেসব দেখছিলেন পর্যটকেরা।
তবে বানরের আচরণে একটি পরিবর্তন চোখে পড়ছে। আগে পর্যটক দেখলেই খাবারের আশায় ছুটে আসত তারা, নজর থাকত হাতের খাবার আর ব্যাগের দিকে। এখন কেওড়া খেয়েই পেট ভরছে, তাই সেই আগ্রহ অনেকটা কম।
পর্যটকবাহী ট্রলারের মালিক আনিসুর রহমান বলেন, ‘এখানে কোনো কোনো বানর খাবার না দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে আক্রমণ করে, ব্যাগ বা খাবার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এখন কেওড়া খেয়ে ওদের চেহারা যেমন হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে, তেমনি খাবারের প্রতি আগ্রহও কমেছে। কেওড়ার মৌসুমে যতবার এসেছি, ততবারই ওদের এমন টগবগে দেখেছি।’
বনের খাদ্যচক্র ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় কেওড়া গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বনকর্মী মো. মহিউদ্দিন বলেন, সুন্দরবনের বানরের অন্যতম প্রধান খাবার কেওড়া। হরিণ ও নানা প্রজাতির পাখিসহ বনের আরও অনেক প্রাণীর খাদ্যের জোগানও দেয় এই ফল।
সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় খাকি বানর, অর্থাৎ রেসাস ম্যাকাক। কালাবগী, করমজল, জামতলা, কটকা, কচিখালী, কলাগাছিয়া ও হাড়বাড়িয়ার মতো ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে গেলেই চোখে পড়ে তাদের দলবদ্ধ বিচরণ।
বনকর্মী ও ট্রলারচালকদের ভাষ্য, পর্যটকেরা ট্রলার রেখে বনে ঢুকলে সুযোগ বুঝে বানরের দল ট্রলারে উঠে পড়ে। হাতের কাছে খাবার বা অন্য কিছু পেলে নিয়ে পালায়। হরিণ মানুষ দেখলেই দূরে সরে যায়, বানর করে উল্টোটা। খাবারের আশায় প্রায়ই কাছে চলে আসে। তবে অতিরিক্ত বিরক্ত করলে বা দুষ্টুমি করতে গেলে ক্ষিপ্ত হয়ে কখনো কামড়েও দেয়।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান জানান, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য কনজারভেশন অব ন্যাচারের (আইইউসিএন) ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনে বানরের সংখ্যা ১ লাখ ৫২ হাজার ৪৪৪। ২০০৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫১ হাজার। দুই দশকে বানরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বন কর্মকর্তার মতে, কেওড়ার মৌসুমে বানরকে সবচেয়ে সুস্থ ও সতেজ দেখায়। পর্যটকদের চোখেও পড়ে সেই হৃষ্টপুষ্ট শরীর আর বাড়তি চঞ্চলতা। অনেকেই তখন বলেন, বানরের চেহারা দেখলেই বোঝা যায়, কেওড়ার মৌসুম চলছে।