বিকেল নামলেই খালের পানিতে ভেসে চলে নৌকা। চারপাশে সবুজ ফসলের মাঠ, মাথার ওপর খোলা আকাশ। মৃদু বাতাসে বদলে যায় দিনের ব্যস্ততা। কেউ নৌকায় ঘুরছেন, কেউ খালের পাড়ে বসে গল্প করছেন। কেউ আবার মুঠোফোনে ছবি তুলছেন।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের বোয়ালকান্দি সেতু এলাকা এভাবেই জমে উঠেছে স্থানীয় মানুষের বিনোদনের জায়গা হিসেবে। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার বিকেলে বাড়ছে ভিড়।
গত শুক্রবার বিকেল পাঁচটার দিকে বোয়ালকান্দি সেতু এলাকায় গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। শেরপুর-কাজীপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে স্থানীয় লোকজনের কাছে ‘পারনী খাল’ নামে পরিচিত খালটি বর্ষার পানিতে পরিপূর্ণ। সেই পানিতেই এখন চলছে নৌকা।
সেতুর আশপাশে মানুষের ভিড়। কেউ ইজিবাইকে, কেউ মোটরসাইকেলে, আবার কেউ ব্যক্তিগত গাড়িতে করে এসেছেন। শেরপুরের পাশাপাশি পাশের ধুনট উপজেলার বাসিন্দাদেরও দেখা গেল সেখানে। সূর্য ডোবার আগপর্যন্ত বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের আনাগোনা।
নৌকায় ঘুরতে এসেছিলেন শেরপুরের সাইফুল ইসলাম ও লোকমান হোসেন। তাঁরা বলেন, শেরপুর শহরে বিনোদনের তেমন কোনো জায়গা নেই। তাই বর্ষার মৌসুমে খালের পানিতে নৌকায় ঘুরে সময় কাটান তাঁরা।
বোয়ালকান্দি সেতুর চারপাশে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। বন্ধুদের কাছে এ জায়গার কথা শুনে তিন কলেজশিক্ষার্থীও এসেছেন। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি তাঁরা মুঠোফোনে ছবি তুলছেন।
সব ঋতুতেই মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন বলে জানান পাশের গোপালপুর গ্রামের যতীন্দ্রনাথ রায়। তিনি বলেন, বর্ষার পর দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায়। তিন বছর ধরে তাঁরা এমন দৃশ্য দেখে আসছেন।
শুক্র ও শনিবার দর্শনার্থীর সংখ্যা অন্য দিনের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সেতুর দুই পাশে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১০টি অস্থায়ী দোকান। কোথাও আখের রস, কোথাও ফুচকা, মাঠা, বাদাম ও ছোলা বিক্রি হচ্ছে।
বোয়ালকান্দি সেতু এলাকায় শুক্র ও শনিবার বাদাম ও ছোলা বিক্রি করতে আসেন দোকানি এরশাদ আলী। তিনি বলেন, এখানে এসে এক দিনে তাঁর প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা আয় হয়। সপ্তাহের অন্যান্য দিন বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বিক্রি করেন।
একই কথা জানিয়ে মাঠা বিক্রেতা মো. মিলন বলেন, বিনোদনের জন্য এখানে মানুষের আনাগোনা ছোট ব্যবসায়ীদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে।
শহরের আশপাশে খোলামেলা বিনোদনের জায়গা না থাকায় শেরপুর শহর ও শহরতলির বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন, রকি হোসেন ও আঞ্জুয়ারা খাতুন ছুটির দিনে বোয়ালকান্দি সেতু এলাকায় চলে আসেন। তাঁরা বলেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে চাকরিজীবীদের অনেকেই পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে এখানে আসেন। নৌকায় ঘোরার পাশাপাশি খালের পাড়ে বসে সময় কাটান।
শেরপুর শহর ও আশপাশের এলাকা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় ঘেরা। কিন্তু সরকারি উদ্যোগে এখনো কোনো বিনোদনকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি বলে জানান খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান পিয়ার উদ্দিন। তিনি বলেন, বোয়ালকান্দির খোলা পরিবেশ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এই জায়গার পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো শিল্পকারখানাও নেই। মানুষ এখানে এসে খোলা প্রকৃতির মধ্যে কিছুটা স্বস্তির সময় কাটাতে পারছেন।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। খালের পানিতে তখনো কয়েকটি নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে কেউ নৌকার ছবি তোলেন, কেউ খালের পাড়ে বসে গল্প করেন। শহরে বিনোদনের আয়োজন না থাকলেও প্রকৃতি যেন নিজের মতো করেই বোয়ালকান্দিতে তৈরি করেছে মানুষের জন্য এক টুকরা অবসর।