সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিকের মায়ের আহাজারি। শনিবার বিকেল ৪টার দিকে মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামে
সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিকের মায়ের আহাজারি। শনিবার বিকেল ৪টার দিকে মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামে

সৌদি আরবে আগুনে নিহত নওগাঁর পাঁচজনের লাশ বাড়িতে ফিরল তিন মাস পর

সৌদি আরবে প্রায় তিন মাস আগে আগুনে নিহত নওগাঁর পাঁচজনসহ সাত বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। দুপুরের পর মরদেহগুলো নিহত ব্যক্তিদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা।

আজ শনিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে লাশ বহনকারী বিমান বাংলাদেশের এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে সেগুলো নিয়ে নিহত ব্যক্তিদের গ্রামের বাড়ি নওগাঁ ও নাটোরের উদ্দেশে রওনা করেন স্বজনেরা।

নওগাঁর পাঁচজনের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আজ আসর ও মাগরিবের পর নিজ নিজ গ্রামে লাশগুলোর জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত হওয়ার ২ মাস ২২ দিন পর নওগাঁর ৫ জনসহ ৭ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পৌঁছাল। আগুনে পুড়ে মৃতদেহ বিকৃত হয়ে যাওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষায় ওই সাতজনের পরিচয় শনাক্তের পর তাঁদের মৃতদেহ দেশে পাঠানো হয়।

গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জন বাংলাদেশি কর্মী নিহত হন। তাঁদের মধ্যে নয়জনের মরদেহ গত ২৭ আগস্ট দেশে পাঠানো হয়েছিল। অবশিষ্ট সাতজনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষা করে প্রায় তিন মাস পর দেশে পাঠানো হলো।

ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় শনাক্ত হওয়া নওগাঁর নিহত পাঁচজন হলেন নওগাঁ পৌরসভার পার নওগাঁ এলাকার মো. শাহিন, আত্রাই উপজেলার দুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান, একই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী।

নিহত অপর দুজন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দীঘিরপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ শামীম এবং খাজুরা গ্রামের সাব্বির হোসেন।

সৌদিতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁ সদর উপজেলার নিহত শাহীনের মরদেহ দেশে এসেছে। শনিবার বিকেলে তিনটার দিকে মরদেহ নওগাঁ শহরের পার-নওগাঁর বাড়িতে তাঁর মরদেহ পৌঁছায়

নওগাঁ পৌরসভার পার নওগাঁ এলাকায় আজ বেলা পৌনে তিনটার দিকে পৌঁছায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত শাহীনের মরদেহ। শাহীনের বৃদ্ধ মা নার্গিস বেগম বাড়ির বারান্দায় চেয়ারে বসে আহাজারি করছিলেন।

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে নার্গিস বেগম আহাজারি করে বলছিলেন, ‘হামার ছাওয়াল অনেক আশা করে, সমিতত থ্যাকে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ করে বিদেশ গেছিল। বিদেশ যাইয়ে কামও পাইছিল। সর্বনাশা আগুনে হামার সব শ্যাষ হয়ে গেল। বুকের ধনটা হামাক র‍্যাখে চলে গ্যালো। কিসের আশায়, ক্যামন করে হামরা বাঁচমু।’

সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ধারদেনা করে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন দুই সন্তানের বাবা শাহীন। সৌদিতে যাওয়ার তিন মাসের মাথায় কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে তিনি নিহত হন।

শাহীনের স্ত্রী মীম বানু ঘরের ভেতরে আহাজারি করছিলেন। তাঁকে কয়েকজন নারী সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বাড়ির সামনের রাস্তায় মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। আশপাশের লোকজন সেটি ঘিরে আছেন। পার নওগাঁ মডেল মসজিদ প্রাঙ্গণে আসরের নামাজের পর সামাজিক গোরস্তানে শাহীনের দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

একই দুর্ঘটনায় নিহত মিনহাজ প্রামাণিকের মরদেহ আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামে বিকেল চারটার দিকে পৌঁছায়। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

মিনহাজের বাবা আক্কাস প্রামাণিক বলেন, এক বছর আগে সাত লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। দালাল চক্রের মাধ্যমে সৌদি আরবে যাওয়ার পর এক বছরেও তাঁর ইকামা হয়নি। মৃত্যুর চার মাস আগে রিয়াদের একটা সোফা কারখানায় কাজ পেয়েছিলেন। কাজ পাওয়ার পর কিছু টাকা বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন। কাজ করে ঋণ পরিশোধ করার পর দেশের বাড়িতে ঘরবাড়ি করার ইচ্ছা ছিল মিনহাজের।

ছেলেকে হারিয়ে এখন ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন আক্কাস প্রামাণিক।

আত্রাই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে আত্রাই উপজেলার ১১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এর মধ্যে প্রথম দফায় গত ২৭ আগস্ট সাতজনের মরদেহ দেশে আসে। এই দফায় চারজনের মরদেহ এল। বিকেলে মরদেহগুলো নিহত ব্যক্তিদের নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছে। নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ দাফনের জন্য প্রতিটি পরিবারকে আপাতত ৩৫ হাজার করে টাকা দেওয়া হবে। তিন মাস পর ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে তিন লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে।