
যারা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়, যারা বাংলাদেশকে মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করতে চায়, তারাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এর প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর এলাকায় আজ সোমবার বিকেলে মানববন্ধন কর্মসূচিতে তিনি এ কথা বলেন।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধের প্রতিবাদে ওই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। বিকেল সাড়ে চারটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সর্বস্তরের জনগণ’–এর ব্যানারে এ কর্মসূচি পালিত হয়। এতে জেলার বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।
এই কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতির রাজধানী বলা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে। সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২০২১ সালে সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সংগীতাঙ্গন আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা সিনেমা হল নেই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে দাঁড়াতে দেওয়া হচ্ছে না। এই কালো নকশা করা করছে? যারা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়, যারা বাংলাদেশকে অন্ধকারে নিয়ে যেতে চায়, যারা বাংলাদেশকে একটা মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করতে চায়, তারাই বাংলাদেশের সংস্কৃতির রাজধানী ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে একটা সিনেমা, যেটা একেবারেই পরিবারের সকলকে নিয়ে দেখার মতো সিনেমা “বনলতা এক্সপ্রেস”, তার প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে।’
রুমিন ফারহানা আরও বলেন, ‘গতকাল আমি সিনেমাটি দেখেছি, এটি চমৎকার একটি সিনেমা। এটি পরিবারের শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ—সবাই একসঙ্গে বসে দেখতে পারে। সেই সিনেমা কেন বন্ধ করে দেওয়া হলো?’
সিনেমা প্রদর্শন বন্ধে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমি যদি প্রশ্ন করি যে রাষ্ট্র ৬ বছরের শিশুকে ধর্ষণ আর বলাৎকার থেকে রক্ষা করতে পারে না; যেই রাষ্ট্র ৭০ বছরের বৃদ্ধাকে ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না; যেই রাষ্ট্রে দুর্নীতি, দুঃশাসন, টাকা পাচার, ব্যাংক লুট এবং কোনো অন্যায় বন্ধ করতে পারে না; সেই রাষ্ট্র কেন সিনেমা বন্ধের মদদ দেয়। কারণ, আমরা গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, একটার পর একটা মাজার ভাঙা হয়েছে, কবর থেকে তুলে নিয়ে মানুষ পোড়ানো হয়েছে; আমরা দেখেছি, দক্ষিণপন্থা বা ডানপন্থার উত্থান। কিন্তু আমার দেশের মানুষ তো এমন ছিল না। এ দেশে আমরা যেমন সুমধুর আজান শুনেছি, আমরা বাউলগানও শুনেছি।’
সরকারের উদ্দেশে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘যাদেরকে আপনারা আজ আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন; আপনাদের মদদে যারা আজ গানবাজনা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপরে শক্তভাবে প্রতিরোধ করার সাহস পাচ্ছে, একদিন তাদের হাতেই কিন্তু আপনারা পরাজিত হবেন। আমি আশা রাখব, শুভবুদ্ধির উদয় হবে। সামনের প্রজন্মকে আমরা যেন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে না রাখি। আমরা এই রকম রাষ্ট্র আশা করি না, যেই রাষ্ট্র মানুষকে পেছনে টেনে নিয়ে যায়।’
রুমিন ফারহানা দাবি করেন, ‘অবিলম্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যেন নির্বিঘ্নে চলতে পারে, সেই ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক। প্রশাসনের কাছে আমার আবেদন থাকবে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী—এই পরিচয় আপনারা কোনো গোষ্ঠীকে মুছে ফেলতে দেবেন না।’
গত শনিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। কিন্তু বৃহস্পতি ও শুক্রবার জেলার কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের ব্যানারে সিনেমাটি প্রদর্শন না করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রচার চালানো হয়। পরে রোববার ব্যক্তিগত উদ্যোগে একজন কসবা উপজেলায় একটি স্কুলের মাঠে সিনেমাটির প্রদর্শনীর আয়োজনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু পুলিশ ও প্রশাসন গিয়ে সেটি বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।