
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রচার-প্রচারণায় মুখর সারা দেশ। তবে ভোটের আমেজ নেই চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ ও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের সীমান্তবর্তী দ্বীপ উড়িরচরের উত্তর ও পশ্চিম অংশে। এই অংশে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের বসবাস। অথচ এলাকাটিতে এখনো কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা বা গণসংযোগ নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রার্থীদের কেউ আসেননি এলাকায়।
উড়িরচরের বাসিন্দারা মূলত ভোলা, হাতিয়া, রামগতি ও সুবর্ণচর এলাকা থেকে আসা। নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে প্রায় এক যুগ আগে তাঁরা এই চরে ঠাঁই নেন। একই সঙ্গে স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করে তাঁদের অনেকেই উড়িরচরের ভোটার হয়েছেন।
চরের প্রধান সড়কটি আগের ‘বাংলাবাজার’ থেকে পশ্চিমের ‘মুকবুল বাতানি বাজার’ পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যে বাংলাবাজার অংশটি চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনের অন্তর্ভুক্ত। আর বাতানি বাজার অংশটি পড়েছে নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ-কবিরহাট) আসনে।
গত সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-৩ আসনের অংশটিতে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা জোরেশোরেই চলছে। অথচ ২৫ হাজার মানুষের বসবাস হওয়া সত্ত্বেও নোয়াখালী-৫ আসনের অংশটিতে ভোটের আমেজই নেই। সরেজমিনে দক্ষিণের ফুলমিয়া চেয়ারম্যান বাজার, ভূমিহীন বাজার; মধ্যভাগের বারআউলিয়া বাজার ও উত্তরের ইউসুফ মেম্বার বাজার ঘুরে একই চিত্র দেখা যায়। বাজারের দোকানপাটেও ভোট নিয়ে কারও আলাপ চোখে পড়েনি।
প্রশাসনিকভাবে তাঁদের এলাকাটি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর এলাহী ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। তবে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের সেবা থেকে তাঁরা অনেকটা বঞ্চিত। ভোটার তালিকায় নাম তুলতেও তাঁদের বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বেশির ভাগ মানুষ ভোটারই হতে পারছেন না
দ্বীপের উত্তর ও পশ্চিম অংশে গিয়ে একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানান, প্রশাসনিকভাবে তাঁদের এলাকাটি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর এলাহী ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। তবে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের সেবা থেকে তাঁরা অনেকটা বঞ্চিত। ভোটার তালিকায় নাম তুলতেও তাঁদের বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বেশির ভাগ মানুষ ভোটারই হতে পারছেন না।
বারআউলিয়া বাজারে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা ও মুদিদোকানি দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘১২ তারিখ নির্বাচন, অথচ কোনো প্রার্থীই আসেননি, আমরা যেন দেশের ভেতরেই ভিনদেশের নাগরিক। আমাদের শত সমস্যা নিয়ে কারও কোনো প্রতিশ্রুতিও মিলছে না।’
দেলোয়ার হোসেন জানান, লক্ষ্মীপুরের রামগতির বাসিন্দা ছিলেন তিনি। ১০ বছর ধরে উড়িরচরে বসবাস করছেন। সেখান থেকে ঠিকানা স্থানান্তরের মাধ্যমে উড়িরচরের ভোটার হয়েছেন। তবে তাঁর পরিবারের সদস্যদের আর কেউ এখনো ভোটার এলাকা স্থানান্তর করতে পারেননি। তিনি বলেন, তাঁর সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। তবে জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার পরও ‘রোহিঙ্গা’ বলে তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
১২ তারিখ নির্বাচন, অথচ কোনো প্রার্থীই আসেননি, আমরা যেন দেশের ভেতরই ভিনদেশের নাগরিক। আমাদের শত সমস্যা নিয়ে কারও কোনো প্রতিশ্রুতিও মিলছে না।—দেলোয়ার হোসেন, বাসিন্দা, উড়িরচর।
বাসিন্দারা জানান, যাঁরা বহু কাঠখড় পুড়িয়ে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে পেরেছেন, তাঁদেরও ভোট দিতে গিয়ে বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ভোট দিতে হলে নদী পার হয়ে যেতে হয় অন্তত ১৫ কিলোমিটার দূরের ভোটকেন্দ্রে। নিজেদের বসতির আশপাশে কোনো ভোটকেন্দ্র না থাকায় খরচ আর ভোগান্তির কারণে অনেকে ভোট দিতেও যান না।
ক্ষোভের সঙ্গে বাসিন্দারা জানান, অনেক বাসিন্দা ভোটার এলাকা স্থানান্তরের প্রাণপণ চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন। যাঁরা সফল হয়েছেন, তাঁদের ‘ঘুষ’ দিয়ে কাজ আদায় করতে হয়। প্রার্থীরা এলাকায় এলে এসব ভোগান্তির কথা জানানো যেত।
বারআউলিয়া বাজারের দোকানি আবুল খায়ের জানান, তাঁরও আগের ঠিকানা ছিল লক্ষ্মীপুরের রামগতি। সেখান থেকে তাঁর পরিবারের সাত সদস্য ভোটার এলাকা পরিবর্তনের মাধ্যমে উড়িরচরের ভোটার হয়েছেন। এতে ২৯ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ভোটার হতে গেলে মেম্বার (ইউপি সদস্য) আমাকে রোহিঙ্গা সম্বোধন করে। এটা ছিল টাকা আদায়ের কৌশল।’
চর এলাহী ৩ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কাশেমের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগ অস্বীকার করেন। বলেন, ‘এটা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা। আমি ভূমিহীনদের প্রায় তিন হাজার ভোট ট্রান্সফারে সাহায্য করেছি। কাউকে বাধা দিইনি, কাউকে রোহিঙ্গা বলার প্রশ্নই আসে না।’ ভোটার এলাকা পরিবর্তনে হয়রানির বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কার্যালয়ে থাকা একজন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর জানান, কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণে রয়েছেন।
নোয়াখালী-৫ আসনে ১২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সংসদীয় আসনটির সীমানার মধ্যে পড়া সত্ত্বেও চর এলাহীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপটিতে প্রচারণা না চালানোর কারণ জানতে চাওয়া হয় নোয়াখালী-৫ আসনের বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের কাছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, 'এলাকাটিতে যাতায়াত ও নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে আমাদের। প্রচারণার জন্য সময়ও এবার কম, তাই আমরা প্রতিটি ইউনিয়নে একবার করে যাওয়ার সময়ও পাচ্ছি না। আমাদের কর্মীদের দ্রুত সেখানে গিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালাতে বলব।’