শীতে আগুন পোহাতে গিয়ে পুড়ে যাওয়া রোগী বাড়ছে হাসপাতালে। বুধবার দুপুরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে
শীতে আগুন পোহাতে গিয়ে পুড়ে যাওয়া রোগী বাড়ছে হাসপাতালে। বুধবার দুপুরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে

রংপুর মেডিকেলে বাড়ছে আগুনে পোড়া রোগী

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার গোয়ালটলি ইসলামপুর এলাকার দিনমজুর দুলাল মিয়ার মেয়ে লামিয়া আখতার (৭) তীব্র শীতে আগুন পোহাতে গিয়ে গত রোববার সন্ধ্যায় দুর্ঘটনার শিকার হয়। ওই রাতেই তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজের (রমেক) বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, তার শরীরের ৬৫ শতাংশ পুড়ে গেছে।

গতকাল বুধবার দুপুরে রমেকের বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, লামিয়ার শয্যার পাশে বসে কাঁদছেন মা বৃষ্টি বেগম ও ফুফু জোসনা বেগম।

লামিয়ার ফুফু জোসনা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগুন পোহাতে ধরছিল কয়েকজন মিলে। ওই সময় জামাতে আগুন লাগছিল। দৌড়ে এক বাড়িতে গেছে। পানি দিতে দিতে পুড়ে গেছে। ডাক্তার বলছে, ঢাকা নিয়ে যাও। আমরা সাহস পাচ্ছি না। আমাদের সামর্থ্য নাই। সহযোগিতা করবেন, এমন মানুষও আমাদের নাই।’

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি শীত মৌসুমে নারী, শিশুসহ ৬০ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন বার্ন ইউনিটে। এর মধ্যে আগুনে পোড়া রোগী রয়েছেন ৫০ জন। শীতের আগে এই ইউনিটে রোগী ছিলেন ৩০-৩৫ জন। রোগীদের অধিকাংশ আগুন পোহাতে গিয়ে পুড়ে গেছেন বলে চিকিৎসক, নার্স ও রোগীর স্বজনেরা জানিয়েছেন। ১৪ শয্যার বার্ন ইউনিটে জায়গা না হওয়ায় রোগীদের সার্জারি, মেডিসিনসহ বিভিন্ন বিভাগে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

রংপুর মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. শাহীন শাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত ১০-১২ দিন থেকে শীতের তীব্রতা বেড়ে গেছে। আগুনে পোড়া রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। বার্ন ইউনিটের ১৪টি শয্যা অনেক আগে থেকে পূরণ হয়ে গেছে। এই রোগীদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রেখে আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি।’

সরেজমিন দেখা গেছে, বার্ন ইউনিটে আগুনে পোড়া মানুষ যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। তাঁদের একজন দিনাজপুরের পার্বতীপুরের খাজের পাড়ার মজিদা বেগম (৭৫)। মজিদার নাতনি তাসলিমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর দাদির পা থেকে কোমর পর্যন্ত ২৬ ভাগ অংশ পুড়ে গেছে। তিনি খড়ের গাদার পাশে আগুন পোহাচ্ছিলেন। এ ছাড়া রান্নাঘরের চুলায় আগুন পোহাতে গিয়ে গত ২১ ডিসেম্বর দগ্ধ হন রংপুরের গঙ্গাচড়ার মহিপুর কলাগাছির চরের সুফিয়া বেগম (৭০)। তিনি বলেন, ‘মরণের জাড় (ঠান্ডা)। জাম্পার (সোয়েটার), কম্বল নাই। শীতোত থাকইপার পাই না। ঘরোর আগুন তপপার যায় কাপড়োত আগুন নাগছে। জ্বালায় হামরা মরি যাই।’

চিকিৎসকেরা বলছেন, আগুন পোহাতে গিয়ে গ্রামে নারীরাই বিপদে পড়েন বেশি। গ্রামাঞ্চলে নারীরা সাধারণত শাড়ি পরেন। শীত সইতে না পেরে বাড়ির পাশেই খড়ের মধ্যে আগুন ধরিয়ে তাপ নেওয়ার সময় কখন যে শাড়ির আঁচলে আগুন লেগে যায়, তা শীতের তীব্রতার কারণে বোঝা যায় না। এ ক্ষেত্রে সাবধান থাকতে হবে। আগুন পোহানো শেষে ভালোভাবে তা নিভিয়ে না ফেললে অজান্তে কেউ, বিশেষ করে শিশুরা আগুনে পুড়ে যেতে পারে।

বার্ন ইউনিটে চিকিৎসকের সংকট

রংপুর বিভাগের আট জেলার মধ্যে একমাত্র বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট রয়েছে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এখানে রংপুর ছাড়াও কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর ও গাইবান্ধার আগুনে পোড়া রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। অথচ ১৪ শয্যার বিপরীতে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসক আছেন একজন সহযোগী অধ্যাপকসহ তিনজন চিকিৎসক। এই চিকিৎসকেরাও বিভিন্ন সময় ছুটিতে থাকেন।

চিকিৎসক মো. শাহীন শাহ প্রথম আলোকে বলেন, বার্ন ইউনিটে রোগীর চাপ বাড়ছে। এতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। ১৪ শয্যার জন্য অন্তত একজন অধ্যাপক, একজন সহযোগী অধ্যাপক, একজন সহকারী অধ্যাপক ও চারজন মিড লেভেল চিকিৎসক থাকা প্রয়োজন।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ১৪ ওয়ার্ডের বার্ন ইউনিট হলেও অনেক রোগী ভর্তি হন। অতিরিক্ত রোগীদের সার্জারি বিভাগে বার্ন কর্নার করে সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, উত্তরাঞ্চলে দগ্ধ রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় রংপুর মেডিকেলে একটি ১০০ শয্যার বার্ন ইউনিট করছে সরকার। এ জন্য জায়গা নির্ধারিত হয়ে গেছে। পুরোনো ভবন ভেঙে ফেলতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ১০ তলা ভবনের বার্ন ইউনিটটি হয়ে গেলে অতিরিক্ত জনবল, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম পাওয়া যাবে। এ ইউনিট চালু হলে আগুনে পোড়া রোগীদের ভালোভাবে চিকিৎসা দেওয়া যাবে।