
কক্সবাজারে সৈকতে ডিম পাড়তে আসা মা কাছিমের মৃত্যু হচ্ছে। গত ৪ মাসে সৈকত থেকে ২২০টি কাছিমের মরদেহ উদ্ধার করেছেন পরিবেশকর্মীরা। গত বছরের তুলনায় এ বছর কাছিমের মৃত্যু বেশি হচ্ছে বলে তাঁরা জানান। ডিম পাড়ার পরিবেশও পাচ্ছে না কাছিম। গত ৪ মাসে অরক্ষিত সৈকতে অন্তত ২০০ কাছিম ১৬ হাজার ডিম পেড়েছিল, যা শিয়াল–কুকুর–গুইসাপ-বেজি খেয়ে ফেলেছে। ডিম পেড়ে গভীর সাগরে ফিরে যাওয়ার সময়ও ২০০ কাছিমের অর্ধেকের মৃত্যু হয়েছে উপকূলে পুঁতে রাখা ফাঁদ জালে আটকে পড়ে। বালুচর থেকে ডিম সংগ্রহ করে বাচ্চা ফুটানোর হ্যাচারি প্রকল্প ছাড়া মা কাছিমের সুরক্ষায় তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ে না।
কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক-বাসিন্যাপাড়া সৈকত। গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় জোয়ারের পানিতে এই সৈকতে ভেসে আসে একটি মরা কাছিম। কাছিমের মুখ ও পেছনের এক পায়ে আঘাতের চিহ্ন, রক্ত ঝরছিল। কয়েকটি কুকুর কাছিমের নরম অংশ টেনে খাচ্ছিল। স্থানীয় জেলে রশিদ আহমদ বললেন, সকাল আটটার দিকে জোয়ারের পানিতে তিনটি মরা কাছিম ভেসে এসেছিল, কুকুর খেয়ে ফেলছে। দুটি কাছিমের মুখ ও হাত-পা কাটা, রক্ত ঝরছিল। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল, তাই কাছিমগুলো বালুচরে পুঁতে ফেলা হয়েছে।
পরিবেশকর্মী, ট্রলারমালিক ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু বাসিন্যাপাড়া-নাজিরারটেক নয়, কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার সৈকতের সমিতিপাড়া, দরিয়ানগর, হিমছড়ি, প্যাঁচারদ্বীপ, উখিয়ার সোনারপাড়া, পাটোয়ারটেক, টেকনাফের বাহারছড়া, শীলখালী, মহেশখালীয়াপাড়া, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালীর সোনাদিয়া ও কুতুবদিয়া সৈকতে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টা মৃত কাছিম ভেসে আসছে।
পরিবেশবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের দেওয়া তথ্যমতে, গত ১ নভেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৪ মাসে সৈকতের অন্তত ১৩টি পয়েন্টে ২২০টি মরা মা কাছিম ভেসে আসে। ৮০ শতাংশ কাছিমের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। কাছিমগুলোর পেটে ডিমও ছিল বলে পরিবেশকর্মীরা জানান। এ বিষয়ে কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর কাছিমের মৃত্যু বেশি হচ্ছে। ডিম পাড়ার পরিবেশও পাচ্ছে না কাছিম। গত ৪ মাসে অরক্ষিত সৈকতে অন্তত ২০০ কাছিম ১৬ হাজার ডিম পেড়েছিল, যা শিয়াল–কুকুর–গুইসাপ-বেজি খেয়ে ফেলেছে। ডিম পেড়ে গভীর সাগরে ফিরে যাওয়ার সময়ও ২০০ কাছিমের অর্ধেকের মৃত্যু হয়েছে উপকূলে পুঁতে রাখা ফাঁদ জালে আটকা পড়ে। প্রতিবছর মানুষের নিষ্ঠুর আচরণে ২০০ থেকে ৩০০ মা কাছিমের মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। বালুচর থেকে ডিম সংগ্রহ করে বাচ্চা ফুটানোর হ্যাচারি প্রকল্প ছাড়া মা কাছিমের সুরক্ষায় তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ে না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা প্রথম আলোকে বলেন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল বটম ট্রলিং জাহাজ গভীর সাগরে মা চিংড়ি ধরার নামে নির্বিচার বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। উপকূলজুড়ে পুঁতে রাখা হয় হাজারো নিষিদ্ধ জাল, এসব ফাঁদ জালে আটকা পড়েই বেশির ভাগ মা কাছিমের মৃত্যু হচ্ছে। তথ্যপ্রমাণ না থাকায় কাছিমনিধনের বিপরীতে মামলা করা যাচ্ছে না।
কক্সবাজার সৈকতে ভেসে আসা সব কটি অলভি রিডলে (জলপাই রং) প্রজাতির কাছিম। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত পাঁচ মাস তাদের প্রজনন মৌসুম। কাছিমের মৃত্যু রোধ এবং প্রজনন বাড়াতে সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে জানিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, জালে আটকা পড়লে যেন কাছিমকে জীবিত অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হয়, এ বিষয়ে জেলেদের সচেতন করতে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নিষিদ্ধ ও ফাঁদ জাল উচ্ছেদে মৎস্য বিভাগ, কোস্টগার্ডসহ যৌথ অভিযানও চলছে। কিন্তু কাছিমের মৃত্যু রোধ করা যাচ্ছে না।
কক্সবাজার সৈকত ও উপকূলে কাছিমের সুরক্ষা, ডিম সংগ্রহ, প্রজননের ব্যবস্থা এবং জীবনচক্র নিয়ে এক যুগের বেশি গবেষণা করে আসছেন মেরিন বায়োলজিস্ট আবদুল কাইয়ুম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে সোনাদিয়া, প্যাঁচারদ্বীপ, বাহারছড়া, শীলখালী, মাদারবুনিয়া, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, কোডেক, নেকমসহ কয়েকটি সরকারি–বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত কাছিমের বাচ্চা ফুটানোর ১০টি হ্যাচারি রয়েছে। গত ৪ মাসে ৭০টির বেশি কাছিমের পাড়া প্রায় ১৫ হাজার ডিম সংগ্রহ করে হ্যাচারিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ডিম থেকে তিন হাজার বাচ্চা ফুটেছে, যা পরবর্তী সময় সাগরে অবমুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু তদারকি না থাকায় সোনাদিয়াতে সম্প্রতি ১৫ থেকে ২০টি কাছিমের পাড়া কয়েক হাজার ডিম শিয়াল–কুকুর-বেজি খেয়ে ফেলেছে। মানুষও কাছিমের ডিম চুরি করে নিয়ে যায়। গত দুই মাসে পরিবেশকর্মীরা সোনাদিয়া, প্যাঁচারদ্বীপ, শীলখালী সৈকত থেকে ৭০টির মতো মৃত কাছিম উদ্ধার করেন।
আবদুল কাইয়ুম বলেন, গভীর সাগর থেকে ডিম পাড়তে মা কাছিমগুলো সৈকতের দিকে ছুটে আসে। এ সময় ট্রলিং জাহাজ, কাঠের ট্রলার ও নিষিদ্ধ বিহিন্দি জালে আটকা পড়ে মা কাছিম। জেলেরা কাছিমগুলো ছেড়ে না দিয়ে লাঠি দিয়ে আঘাত করে মেরে ফেলেন, তারপর সাগরে নিক্ষেপ করেন।
থামছে না মৃত্যু
চার বছর ধরে সোনারপাড়া সৈকতে কাছিমের ডিম সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছেন স্থানীয় পরিবেশকর্মী নবী হোসেন। তিনি বলেন, গত ৭ দিনে তিনি সোনারপাড়া সৈকত থেকে ২০টি মৃত কাছিম উদ্ধার করেন। প্যাঁচারদ্বীপ সৈকত থেকে আবদুল লতিফ নামের আরেক পরিবেশকর্মী উদ্ধার করেন ২১টি মরা কাছিম। তাঁরা জানান, অধিকাংশ কাছিমের পেটে ৪০ থেকে ৯০টি করে ডিম ছিল, শরীরেও আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে।
কাছিমের ডিম পাড়ার নিরাপদ জায়গা ছিল মহেশখালী সোনাদিয়া সৈকত। আগে কাছিমের ডিম সংগ্রহ করার জন্য সেখানে ১০ জনের স্বেচ্ছাসেবী ছিল। এখন আছেন মাত্র একজন। ফলে কাছিমের পাড়া ডিমগুলো শিয়াল–কুকুর খেয়ে ফেলছে।
সোনাদিয়াতে ১২ বছর ধরে কাছিমের ডিম সংগ্রহের কাজ করছেন স্থানীয় যুবক গিয়াস উদ্দিন। তিনি সোনাদিয়া পশ্চিমপাড়া গ্রাম সংরক্ষণ দলের (ভিসিজি) সভাপতি। গিয়াস উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে সোনাদিয়াতে কাছিমের ডিম সংরক্ষণের হ্যাচারি আছে দুটি। তাতে ৩০টি কাছিমের পাড়া ৩ হাজার ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু তদারকির অভাবে আরও ৩০টি কাছিমের পাড়া ৩ হাজারের বেশি ডিম কুকুর খেয়ে ফেলেছে।
কাছিমসহ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কুতুবদিয়া থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পর্যন্ত সৈকত-উপকূলের বিভিন্ন পয়েন্টে মৃত কাছিম ভেসে আসছে। উপকূলে মাছ ধরে ৬৫ হাজারের বেশি ট্রলার, সবাই ফাঁস জাল ব্যবহার করে। বাংলাদেশে প্রায় আড়াই শ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলার (ট্রলিং জাহাজ) আছে, যারা গভীর সাগরে ট্রল নেট (টানা জাল) দিয়ে মাছ ধরে। গভীর সমুদ্র থেকে উপকূলের দিকে ডিম দিতে আসার সময় ফাঁস জাল কিংবা ট্রল নেটে আটকা পড়ে মা কাছিমের মৃত্যু হচ্ছে। এ ছাড়া জাহাজ বা ট্রলারের আনাগোনা বাড়ার কারণে প্রপেলার কিংবা অন্য কিছুর ধাক্কায় আঘাত পায় কাছিম। এর পাশাপাশি অন্য প্রজাতি, বিশেষ করে হাঙরের মতো জলজ প্রাণীর আক্রমণ কিংবা দূষণের কারণেও কাছিম মারা যেতে পারে। এ নিয়ে গবেষণা দরকার।
কক্সবাজার সৈকতে ভেসে আসা সব কটি অলভি রিডলে (জলপাই রং) প্রজাতির কাছিম। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত পাঁচ মাস তাদের প্রজনন মৌসুম। কাছিমের মৃত্যু রোধ এবং প্রজনন বাড়াতে সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে জানিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, জালে আটকা পড়লে যেন কাছিমকে জীবিত অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হয় এ বিষয়ে জেলেদের সচেতন করতে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন হচ্ছে। নিষিদ্ধ ও ফাঁদ জাল উচ্ছেদে মৎস্য বিভাগ, কোস্টগার্ডসহ যৌথ অভিযানও চলছে। কিন্তু কাছিমের মৃত্যু রোধ করা যাচ্ছে না।
আসছে না দুই প্রজাতির কাছিম
মৎস্য ও সামুদ্রিক প্রাণীবিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১০ সালের দিকে কক্সবাজার সৈকতের ৫৩টি পয়েন্টে দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০টি কাছিম ডিম পাড়তে আসত। এখন ১৪টি পয়েন্টে আসছে ১২ থেকে ১৫টি।
গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ চৌধুরী বলেন, পৃথিবীতে সাত প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিম আছে। তার মধ্যে পাঁচ প্রজাতির কাছিম বাংলাদেশে পাওয়া যায়। এর মধ্যে হক্সবিল, গ্রিন টার্টল ও অলিভ রিডলে—এই তিন প্রজাতির কাছিম কক্সবাজার উপকূলে ডিম পাড়তে আসে। নানা কারণে এখন অলিভ রিডলে ছাড়া অন্য দুই প্রজাতির কাছিমের উপস্থিতি নেই বললে চলে।
১০ থেকে ১২ বছর আগেও গভীর সমুদ্র থেকে দল বেঁধে সেন্ট মার্টিন ও টেকনাফ সৈকতে এসে ডিম পাড়ত হক্সবিল, গ্রিন টার্টল ও অলিভ রিডলে—এই তিন প্রজাতির কাছিম। কয়েক বছর ধরে হক্সবিল ও গ্রিন টার্টল আর ডিম পাড়তে আসছে না। দুই বছর ধরে অলিভ রিডলের ডিম পড়তে আসার সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।
মেরিন বায়োলজিস্ট আবদুল কাইয়ুম বলেন, নির্জন সৈকতে কাছিম ডিম পাড়তে আসে। নানা কারণে ডিম দেওয়ার স্থানগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি সৈকতে আলোকায়ন, সমুদ্রে পরিত্যক্ত জাল ফেলে দেওয়া, ডিম ছাড়ার মৌসুমে বিচ ডাইভিং, খেলাধুলা, সৈকতে হাঁটা ইত্যাদি কাছিমের ডিম পাড়ার পরিবেশ সংকুচিত করছে।