
ঘরের একটি সোফায় নির্বাক হয়ে বসে রয়েছেন আমীরুল হোসাইন (৩৮)। কিছুক্ষণ পরপর স্বজনেরা এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন, দিচ্ছেন সান্ত্বনা। ঘরের ভেতর থেকেও স্বজনদের বিলাপের শব্দ ভেসে আসছে। এর মধ্যেই ডাক আসে—‘জানাজার সময় হয়েছে’। এরপর জানাজা শেষে লাশ দাফনের মাধ্যমে স্ত্রীকে শেষবিদায় জানান আমীরুল।
গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার বাউরিয়া ইউনিয়নে দোস্ত মোহাম্মদের বাড়িতে দেখা যায় এই দৃশ্য। এর আগে সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চট্টগ্রাম নগরের একটি হাসপাতালে মৃত্যু হয় ওই এলাকার বাসিন্দা আমীরুলের স্ত্রী রাশেদা বেগমের (২৯)। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।
আমীরুল-রাশেদা দম্পতির দুটি শিশুসন্তান রয়েছে। দুই সন্তানকে চট্টগ্রাম নগরে এক আত্মীয়ের বাসায় রেখে স্ত্রীর লাশ দাফনের জন্য সন্দ্বীপ নিয়ে যান আমীরুল।
নগরের চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রাশেদা বেগম। তিনি সন্দ্বীপের বাউরিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। রাশেদার দুই সন্তানের মধ্যে আতেফ আমীরুল বয়স সাড়ে চার বছর। দ্বিতীয় সন্তানের নাম আদিয়ান আমীরুল। এক মাস আগে শিশুটির জন্ম হয়।
নগরের চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রাশেদা বেগম। তিনি সন্দ্বীপের বাউরিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। রাশেদার দুই সন্তানের মধ্যে আতেফ আমীরুল বয়স সাড়ে চার বছর। দ্বিতীয় সন্তানের নাম আদিয়ান আমীরুল। এক মাস আগে শিশুটির জন্ম হয়।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাশেদা বেগমের ডেঙ্গু শনাক্তের পর গত শনিবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়েছিল তাঁকে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে গুরুতর ডেঙ্গুর কারণে হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন চিকিৎসকেরা।
গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে স্ত্রী রাশেদা বেগমের (২৯) লাশ নিয়ে সন্দ্বীপের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন আমীরুল। বেলা তিনটার দিকে রাশেদার লাশ পৌঁছায় তাঁর শ্বশুরবাড়িতে। সেখানে তখন স্বজন-প্রতিবেশীদের ভিড়। রাশেদার মা-বাবাসহ স্বজনেরাও ছুটে আসেন সেখানে।
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় পারিবারিক কবরস্থানে রাশেদাকে দাফন করা হয়। দাফনের আগে স্বজনেরা বারবার রাশেদার দুই সন্তানের কথা বলে বিলাপ করছিলেন। বিশেষ করে ছোট সন্তানটি মাকে ছাড়া কীভাবে বেড়ে উঠবে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায় স্বজনদের।
আমীরুল জানান, স্ত্রী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার আগে তিনি ও তাঁর মা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁরা সুস্থ হয়ে উঠলেও রাশেদার অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়। আমীরুল বলেন, ‘গত ৫ আগস্ট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আমাদের দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়। প্রসবকালীন অস্ত্রোপচারের পর শারীরিকভাবে দুর্বল ছিলেন রাশেদা। হয়তো তাই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই করার সক্ষমতা কমে গিয়েছিল তাঁর।’
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এমন মৃত্যু আর কারও না হোক। আমার চাওয়া, ডেঙ্গুতে মৃত্যু ঠেকাতে সরকার যথাযথ কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।-আমীরুল হোসাইন, রাশেদার স্বামী।
রাশেদার স্বজন ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি দুধের বাচ্চা রেখে রাশেদার এমন বিদায় মেনে নেওয়ার মতো নয়। তাঁর শিশুসন্তান দুটিকে সঙ্গে আনাও সম্ভব হয়নি। তারা এত ছোট যে জানেও না তাদের মা আর বেঁচে নেই।’
আমীরুল হোসাইন চট্টগ্রাম নগরের উত্তর কাট্টলী আলহাজ মোস্তফা হাকিম ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশেদার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
আমীরুল জানান, কর্মসূত্রে তিনি চট্টগ্রাম নগরে থাকেন। তাঁর স্ত্রী চাকরির কারণে বেশির ভাগ সময় সন্দ্বীপে থাকলেও সাপ্তাহিক বন্ধে নগরে আসেন। নগরের দক্ষিণ কাট্টলি সধু চৌধুরী লেনে একটি ভাড়া বাসা রয়েছে তাঁদের। নগরের ওই এলাকাটিতে মশার উপদ্রব বেশি। তাঁর ধারণা, নগরেই রাশেদা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
শোকে ভেঙে পড়া আমীরুল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এমন মৃত্যু আর কারও না হোক। আমার চাওয়া, ডেঙ্গুতে মৃত্যু ঠেকাতে সরকার যথাযথ কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।’
২০২৪ সালে রাশেদা স্বাস্থ্য সহকারী পদে নিয়োগ পান। তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়। সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ‘রাশেদা বেগমের আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। একজন সহকর্মীকে এভাবে হারানো বেদনাদায়ক। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।’
চট্টগ্রামে চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৬৫৩ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ৪ জন। গত বুধবার নগরের বেসরকারি হাসপাতালে রুজাইনা মাজিদ নামের ৪ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুজাইনা মাজিদ ঢাকার তেজগাঁওয়ের মণিপুরিপাড়ার বাসিন্দা। গত ৬ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু নিয়ে তাকে নগরের এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বুধবার তার মৃত্যু হয়। চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৬৮৯ জন।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সবাইকে সচেতন হতে হবে। ডেঙ্গুর মৌসুমে দিনের বেলাতেও মশারি ব্যবহার করা এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। জ্বর বা ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।