
পাঁচ ভাই-বোনসহ সাতজনের সংসার। বাবা কৃষিকাজ করতেন। তবে কয়েক বছর ধরে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ। বড় ভাই ঢাকায় বেসরকারি ছোট্ট একটি চাকরি নিয়ে সংসারের হাল ধরেন। সংসারে টানাটানি সত্ত্বেও মা ও বড় ভাইয়ের একটাই কথা ছিল—যেভাবেই হোক পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্যও ছিল না। তখন এক চাচাতো ভাই বিনা পারিশ্রমিকে আমাকে পড়িয়েছেন। মা, ভাই ও চাচাতো ভাইয়ের সহযোগিতায় প্রত্যন্ত গ্রামে থেকেও শেষ পর্যন্ত আমি সফল হয়েছি। আমি জিপিএ–৫ পেয়েছি।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে জামালপুরে অনুষ্ঠিত শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এভাবেই নিজের অনুভূতির কথা তুলে ধরে কৃতী শিক্ষার্থী নৈশিন জাহান। এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় দেওয়ানগঞ্জ বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ–৫ পেয়েছে সে।
প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হচ্ছে জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে।
আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ঘিরে সকাল থেকে কৃতী শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে ‘শহীদ সাফওয়ান সদ্য মাল্টিপারপাস অডিটরিয়াম’ চত্বর। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনুষ্ঠানে আসেন অনেক অভিভাবকও। এ সময় শিক্ষার্থীদের অনেকেই ফটো ফ্রেমে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে। অনেকে প্রথম আলো এক্সপেরিয়েন্স জোনে নানা প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। সেখানে পুরস্কার জিতে অনেক শিক্ষার্থীকে উচ্ছ্বস প্রকাশ করতে দেখা যায়।
আজ কলেজগুলোতে নবীনবরণ অনুষ্ঠায় থাকায় জামালপুরের অনুষ্ঠানটি একটু দেরিতে শুরু করতে হয়। বেলা ১১টার দিকে জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলো জামালপুরের প্রতিনিধি আবদুল আজিজ।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সরকারি জাহেদা সফির মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো.আবদুল হাই আলহাদী বলেন, ‘আমরা ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঝিনাই, জিঞ্জিরাম আর কর্ণঝোড়ার পাড়ের সন্তান। এই নদীগুলোর মতোই আমাদের চরিত্র হওয়া উচিত—কখনো বাধা পেলে থেমে না গিয়ে নতুন পথ খুঁজে নেওয়া, আর নিজের মাটিকে উর্বর করে যাওয়া।’ এ সময় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মনে রেখো, দিন শেষে সমাজ তোমাকে বিচার করবে দুটি জিনিসে—তোমার দক্ষতা আর তোমার ভেতরের মানুষটা কতটা সৎ ও হৃদয়বান।
প্রথম আলোর উপবার্তা সম্পাদক কাজী আলিম-উজ-জামান শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার নিয়ে সচেতন থাকার আহবান জানান। তিনি বলেন, তোমরা এআইয়ের সহযোগিতা নেবে; কিন্তু কোনোভাবেই এআইয়ের দাসত্ব বা বশ্যতা স্বীকার করা যাবে না।
জামালপুরের মানবাধিকারকর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’ বলতে শপথ পাঠ করান। তিনি বলেন, মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসনে আজ আমাদের যুবসমাজ হুমকির মুখে। এই ভয়াবহতা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে হবে।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. মোজাহিদুর রহমান ও মো. রাশেদুল ইসলাম, জামালপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক হিশাম আল মহান্নাভ, জামালপুর জিলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক মো. মিনজাহুল আবেদীন প্রমুখ।
প্রথম আলো বন্ধুসভার মো. তৌহিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছয়শোর বেশি কৃতী শিক্ষার্থী অংশ নেয়। অনুষ্ঠানে আলোচনার ফাঁকে চলে বন্ধুসভার বন্ধুদের অংশগ্রহণে আবৃত্তি, নৃত্য ও গান পরিবেশনা। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী সাদিকুর রহমান (শাওন)। অনুষ্ঠান চলাকালে অনলাইন কুইজে অংশগ্রহণকারী ১০ শিক্ষার্থীর মধ্যে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা।