খুলনার পশ্চিম শিরোমনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। শিরোমনি, খুলনা, ১২ ফেব্রুয়ারি
খুলনার পশ্চিম শিরোমনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। শিরোমনি, খুলনা, ১২ ফেব্রুয়ারি

ভোট গ্রহণ শুরু: খুলনা বিভাগে লড়ছেন ৭ নারীসহ ২০২ প্রার্থী, ভোটার প্রায় দেড় কোটি

মাঘের শেষ সময়ে ভোরের দিকে বেশ শীত। সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে খুলনা-২ আসনের নূরনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষা করছেন বেশ কয়েকজন ভোটার। হাতে ভোটার স্লিপ, চোখে কৌতূহল—ভোট দেওয়ার অপেক্ষা।

ভেতরে প্রস্তুত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং এজেন্টরা। বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা। কেন্দ্রটিতে ভোট দেবেন ১ হাজার ৫৮১ ভোটার। এই কেন্দ্রসহ খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনে ৫ হাজার ১৩৩টি ভোটকেন্দ্রে আজ বৃহস্পতিবার ভোট দেবেন ১ কোটি ৪২ লাখের বেশি ভোটার।

খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ৩৬টি সংসদীয় আসনে মোট ২০২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাগেরহাটের এম এ এইচ সেলিম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বাগেরহাট-১, ২ ও ৩ আসনে লড়ছেন। বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী খুলনা-১ আসনে—১২ জন। এর মধ্যে আটজনই হিন্দু সম্প্রদায়ের। দেশের আর কোনো আসনে এত বেশি হিন্দু প্রার্থী নেই।

বিভাগের মধ্যে খুলনা-২, মেহেরপুর-২, চুয়াডাঙ্গা-১ ও ২ আসনের প্রতিটিতে মাত্র তিনজন করে প্রার্থী লড়ছেন। সবচেয়ে বেশি ছয়টি করে আসন খুলনা ও যশোরে; সবচেয়ে কম দুটি করে নড়াইল, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে। বিভাগে মোট ৭ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা তুমুল প্রচার-প্রচারণায় ছিলেন। দুই দলই নির্বাচনী জনসভায় ভোটারদের বিপুল উপস্থিতি দেখানোর চেষ্টা করেছে। বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতের পক্ষ থেকে নারীদের মিছিলের আয়োজন করা হয়। এবার অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে নারীদের উপস্থিতি বেশি ছিল। আওয়ামী লীগের ভোট টানতে বিএনপি ও জামাতের প্রার্থীরা বেশি তৎপর ছিল।

সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের কেন্দ্রের নারী ভোটারদের সারি। বৃহস্পতিবার সকালে

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান খুলনা বিভাগে একাধিক নির্বাচনী জনসভা করেছেন। বিভাগের প্রার্থীদের সঙ্গে নিয়ে ভোটারদের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিভাগের বেশ কয়েকটি আসনের জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে হিন্দু ভোটাররা। প্রচারণার সময়ে ও  ভোটের আগের দিনও বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা ভোটারদের সকাল সকাল গিয়ে ভোট দিতে বলেছেন।

নারী-পুরুষ ভোটার প্রায় সমান

বিভাগের ১০টি জেলার ৬২টি উপজেলায় ৩৬টি সংসদীয় আসন। মোট ৫ হাজার ১৩৩টি ভোটকেন্দ্র এবং ২৭ হাজার ৩৭৫টি স্থায়ী ও ৮২৯টি অস্থায়ী ভোটকক্ষ আছে। মোট ভোটার ১ কোটি ৪২ লাখ ৩৫ হাজার ৩৮৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৭১ লাখ ২৩ হাজার ১৪০ জন ও নারী ভোটার ৭১ লাখ ১২ হাজার ১০৬ জন। হিজড়া ভোটার আছেন ১৪২ জন।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে এবার ভোটার বেড়েছে ৭ লাখ ৮৮ হাজার ৮০১ জন। নারী ভোটার বেড়েছে ৪ লাখ ১১ হাজার ৯৮৬ জন এবং পুরুষ ভোটার বেড়েছে ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৭৫৮ জন। আগের নির্বাচনের চেয়ে ভোটকেন্দ্র বেড়েছে ১৪৯টি।

৩৬টিতে বিএনপি, জামায়াত ৩৫টিতে লড়ছে

বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি ও গণ অধিকার পরিষদ সীমিতসংখ্যক আসনে অংশ নিলেও অধিকাংশ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলই নির্বাচনের বাইরে। বিএনপি ৩৬টি আসনেই প্রার্থী দিয়েছে। বিপরীতে জামায়াত ৩৫টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। বিভাগের মধ্যে শুধু খুলনা-৪ (রূপসা-তেরখাদা-দিঘলিয়া) আসনটি খেলাফত মজলিসের কাছে ছেড়েছে জামায়াত। দেশের মধ্যে একমাত্র হিন্দু প্রার্থী হিসেবে খুলনা-১ আসনে কৃষ্ণ নন্দীকে প্রার্থী করেছে জামায়াত। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার লড়ছেন খুলনা-৫ আসনে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৩১টি, জাতীয় পার্টি ২৫টি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি ৭টি ও গণ অধিকার পরিষদ ৬টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ৫টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ৪টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ৪টি এবং বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) ৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এর বাইরে গণফোরাম, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ কংগ্রেস ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ২টি করে আসনে প্রার্থী দিয়েছে।

সকাল থেকেই নারী ভোটারদের দীর্ঘ সারি। ১২ ফেব্রুয়ারি, আল আমীন ট্রাস্ট মাদ্রাসা, মাগুরা পৌরসভা

বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী), বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিপি), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)—প্রতিটি দলই মাত্র একটি করে আসনে প্রার্থী দিয়েছে। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ২৬ জন।

প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৭ নারী

বিভাগের ৩৬ আসনে মাত্র সাতজন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গড় হার ৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ। নারী প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপি একজন, জাতীয় পার্টি দুজন, গণফোরাম একজন, বাসদ একজন এবং বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি) একজন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন একজন।

বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় কোনো নারী প্রার্থী নেই। নারী প্রার্থী হয়েছেন ঝিনাইদহে দুজন, যশোরে একজন, মাগুরায় একজন, খুলনায় একজন, নড়াইলে একজন এবং কুষ্টিয়ায় একজন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ছয়টি আসনে ১০টি দল মনোনীত ও স্বতন্ত্রসহ ৩৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যার মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র দুজন।

সকালে ভোট গ্রহণ শুরুর আগেই লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েছেন ভোটাররা। পশ্চিম শিরোমনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, খুলনা, ১২ ফেব্রুয়ারি

খুলনা-৫ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শামিম আরা পারভীন ইয়াসমীন, যশোর-২ আসনে বিএনপির সাবিরা সুলতানা, ঝিনাইদহ-১ আসনে জাতীয় পার্টির মনিকা আলম, ঝিনাইদহ-৪ আসনে গণফোরামের প্রার্থী খনিয়া খানম, মাগুরা-১ আসনে বাসদের শম্পা বসু, নড়াইল-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোছা. ফরিদা ইয়াসমিন ও কুষ্টিয়া-৩ আসনে বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মোছা. রুমপা খাতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

যাদের দিকে দৃষ্টি থাকবে

ঝিনাইদহ-১ আসনে বিএনপি থেকে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, ঝিনাইদহ-৪ আসনে গণ অধিকার পরিষদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খান, মাগুরা-২ আসনে বিএনপির নিতাই রায় চৌধুরী, বাগেরহাট-১, ২ ও ৩ আসনে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী এম এ এইচ সেলিম, খুলনা-১ আসনে জামায়াতের কৃষ্ণ নন্দী।

খুলনা-৫ আসনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ও বিএনপির মোহাম্মদ আলি আসগার লবি, খুলনা-৩ আসনে বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-৪ আসনে বিএনপির তথ্যবিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, যশোর-৩ আসনে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, কুষ্টিয়া-৩ আসনে জামায়াতের মো. আমির হামজা।