
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার অন্তত তিনটি এলাকায় মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে ‘মব সৃষ্টি করে’ বাড়িঘর ভাঙচুর ও বেধড়ক পিটুনি দিয়ে এলাকাছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে। গত শুক্রবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভাঙ্গা পৌর সদরের চণ্ডীদাসদী মহল্লা, হামিরদী ইউনিয়নের হামিরদী গ্রাম ও পাশের মানিকদহ ইউনিয়নের ব্রাহ্মণপাড়া গ্রামে এসব ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের কারও বাড়িঘর ভাঙচুর করে আসবাব পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, কাউকে সালিস বৈঠক করে কিংবা মারধর করে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এলাকার ‘সচেতন যুবসমাজের’ নামে হওয়া এসব ঘটনা প্রতিরোধে থানা-পুলিশকে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি। কথিত ‘সচেতন যুবসমাজ’ মাদক ব্যবসায়ী সন্দেহে কাউকে পুলিশেও সোপর্দ করেনি।
‘মাদক ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদে’ নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য, যাঁদের বাড়িতে হামলা হয়েছে কিংবা যাঁদের মারধর করে এলাকা ছাড়তে বলা হয়েছে, তাঁরা এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের গ্রেপ্তার করলেও জামিনে বেরিয়ে তাঁরা আবার মাদকের কারবার চালান। তাঁদের কারণে এলাকার যুবসমাজ মাদকাসক্ত হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে এসব ঘটনা ঘটিয়েছে।
অন্যদিকে ঘটনার পর ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারকে এলাকায় পাওয়া যায়নি। তাঁদের বাড়িতে গিয়ে ঘর তালাবদ্ধ দেখা গেছে। এ ব্যাপারে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, বিভিন্ন গ্রামে মাদক ব্যবসায়ীদের দমনের নামে মারধর ও বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ব্যাপারে থানায় কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। এলাকাবাসীও মাদক ব্যবসার অভিযোগে কাউকে থানায় সোপর্দ করেনি। তিনি বলেন, ‘এই মব সৃষ্টি যাতে আর না হয় এবং ভবিষ্যতে যাতে কেউ আইন হাতে তুলে নিতে না পারে, সে জন্য পুলিশের একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। কোনো ঘটনা শোনার ১৫ মিনিটের মধ্যেই এই টিম ঘটনাস্থলে চলে যাবে।’
বাড়িঘর ভাঙচুর করে উচ্ছেদ
গত শুক্রবার সকাল আটটার দিকে ভাঙ্গা পৌরসভার চণ্ডীদাসদি মহল্লায় আইয়ুব শেখ (৫১) নামের এক ব্যক্তির মালিকানাধীন দুটি ভবনে (একটি নির্মাণাধীন) হামলা চালিয়ে শাবল, লোহার বড় ও হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়। এ সময় ভবনের ভেতরে থাকা বিভিন্ন আসবাব তছনছ করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মাদক ব্যবসার অভিযোগ তুলে দেড় ঘণ্টা ধরে বাড়িটিতে তাণ্ডব চললেও থানা-পুলিশকে ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি। অথচ ঘটনাস্থল থেকে মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যে থানা।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেন, চণ্ডীদাসদি মহল্লার পশ্চিম পাশে ভাঙ্গার আলগী ইউনিয়নের সোনাখোলা গ্রামের বাসিন্দারা এই হামলা চালান। এতে নেতৃত্ব দেন ওই গ্রামের বাসিন্দা ও সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, বিগত ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নজরুল শিকারী, আইনজীবী মো. মাসুদ হোসেন ও একই এলাকার কামরুজ্জামান।
অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তাঁদের কারণে এলাকার যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আইয়ুব শেখ এলাকায় মাদকের ডিলার ও তাঁর স্ত্রী ময়না বেগম মাদকসম্রাজ্ঞী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। এলাকাবাসীকে বাঁচাতে এই দম্পতির ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না।
আইনজীবী মো. মাসুদ মুন্সী বলেন, ‘আমরা তাঁদের ভালো হয়ে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু তাঁরা ভালো হননি। তাই এলাকাবাসীর সম্মিলিত সিদ্ধান্তে মাদক ব্যবসায়ী দম্পতির দুটি ভবন গুঁড়িয়ে দিয়ে তাঁদের উচ্ছেদ করা হয়েছে।’ আইন হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘এই কথা ঠিক, এতে প্রচলিত আইনের বরখেলাপ করা হয়েছে। তবে গ্রামবাসী অতিষ্ঠ ও ত্যক্তবিরক্ত হয়ে এই কাজ করেছে।’
বাড়িঘরে হামলা করে ভেঙে দেওয়ায় পর আত্মগোপনে থাকায় ময়না বেগম ও তাঁর স্বামী আইয়ুব শেখের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বেধড়ক মারধর করে এলাকাছাড়া
চণ্ডীদাসদির ওই ঘটনার পর শুক্রবার বিকেলে ফরিদুপর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল আলগি ইউনিয়নের বালিয়াচর খেলার মাঠে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আরেকটি কথা আমি শুনতে পেরেছি, এই আলগি ইউনিয়ন থেকে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। এই মাদক ঘরে ঘরে চলে গেছে। অভিভাবকদের এ ব্যাপারে সচেতন থাকবেন। যারা মাদক কারবারি করে, আমি একা পারব না, আপনারা ধরে ধরে পুলিশে দেবেন। যারা মাদক কারবারি করে আপনারা এলাকাবাসী এক হয়ে এলাকা থেকে তাদের বিতাড়িত করে দিন। তা না হলে এই মাদক আমাদের যুবসমাজকে ধংস করে দেবে।’
এই বক্তব্যের পর বিকেল পাঁচটার দিকে ভাঙ্গার মানিকদহ ইউনিয়নের ব্রাহ্মণপাড়া গ্রামে মাদক ব্যবসার অভিযোগে সালেহ আহমেদ (৪৫) নামের এক ব্যক্তিকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করা হয়। এ–সংক্রান্ত একটি ভিডিও শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
আড়াই মিনিটের সেই ভিডিওতে দেখা যায়, সালেহকে মাদক ব্যবসায়ী বলে একজন ঘুষি মারছেন। আরেকজন বাঁশের লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছেন। পরে ওই ব্যক্তিকে মাটিতে শুইয়ে কেউ লাথি মারেন, কেউ লাঠি দিয়ে পেটান। এরপর জিনসের প্যান্ট ও বেগুনি রঙের শার্ট পরা এক ব্যক্তি তাঁকে ইট দিয়ে আঘাত করতে থাকেন। এ সময় একজন নারী ও শিশু তাঁদের নিবৃত্ত করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়।
রোববার সকাল ১০টার দিকে ব্রাহ্মণপাড়া গ্রামে গিয়ে সালেহ আহমেদের বাড়িটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। শুক্রবার বিকেলের ঘটনার পর তাঁর পুরো পরিবার এলাকাছাড়া। তাঁরা কোথায় গেছেন, কেউ বলতে পারছেন না।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সালেহ আহমেদ মাদক মামলার পাশাপাশি হত্যা মামলারও আসামি। তিনি ২৫ মে জামিনে বেরিয়ে এলাকায় এসে আবার মাদক ব্যবসা শুরু করেন। এ জন্য এলাকাবাসী তাঁকে মারধর করে এলাকা থেকে বের করে দিয়েছেন। সালেহকে কেন পুলিশে দেওয়া হলো না, জানতে চাইলে গ্রামের বাসিন্দা কৃষক মো. ইব্রাহিম বলেন, ‘আমাদের পুলিশের ওপর কোনো আস্থা নেই। পুলিশ ধরলেও দুই দিন পর তিনি বের হয়ে আসেন।’
সালিসে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ
একই দিন সন্ধ্যায় মাদক ব্যবসার অভিযোগে হামিরদী ইউনিয়নের হামিরদী গ্রামের বিষা মুন্সীকে (৩০) মারধর করা হয়। পরে মাগরিবের নামাজের পর তাঁকে হামিরদী ক্লাবে নিয়ে সালিস ডাকা হয় এবং ১২ ঘণ্টার মধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মো. আলম খান তাঁকে এ নির্দেশ দেন। আলম খান বলেন, ‘বিষা তাঁর বোনকে কক্সবাজারে বিয়ে দিয়েছেন। সেখান থেকে তিনি ইয়াবা এনে আমাদের এলাকাকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন। এ জন্য আমরা বলেছি, তিনি এখানে থাকতে পারবেন না।’
শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিষার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের বাড়িটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এলাকাবাসী জানান, পাঁচ-ছয় মাস আগে বিষা এই বাড়ি তৈরি করেন। তিনি বিবাহিত এবং তাঁর এক ছেলে ও দুই মেয়ে আছে।
এই দুটি ঘটনার পর সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম শুক্রবার দিবাগত রাতে নিজের ফেসবুকে ‘সতর্কতা’ শিরোনামে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘সম্প্রতি আমাদের নির্বাচনী এলাকায় মাদকবিরোধী কর্মসূচির নামে বাড়ি ভাঙচুর বা অভিযুক্তদের ধরে মারধরের মতো ২-১টি ঘটনা ঘটেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।…কেউ দয়া করে আইন হাতে তুলে নেবেন না।’
এ বিষয়ে ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন বলেন, আইন হাতে তুলে নেওয়ার ব্যাপারে প্রশাসনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কাউকে আইন হাতে তুলে নিতে দেওয়া হবে না। নতুন করে যাতে এ–জাতীয় ঘটনা আর না ঘটে, সে ব্যাপারে তাঁরা সতর্ক আছেন।
টিআইবির অনুপ্রেরণায় গঠিত ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি শিপ্রা রায় বলেন, কারও বিরুদ্ধে মাদকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। একটি সভ্য দেশে এটাই প্রচলিত নিয়ম। কিন্তু জনগণকে উসকানি দিয়ে ‘আপনারা ভূমিকা রাখুন’ এ কথা বলে মব সৃষ্টি করা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে মবকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং ভিন্ন অর্থেও ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ–জাতীয় সন্ত্রাস কোনো সভ্য দেশে কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না।