চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও হাজিরপুল এলাকায় নিজের নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনের পর বক্তব্য দেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মো. আবু নাছের। গত বুধবার বিকেলে
চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও হাজিরপুল এলাকায় নিজের নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনের পর বক্তব্য দেন  দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মো. আবু নাছের। গত বুধবার বিকেলে

চট্টগ্রাম-৮ আসন

এনসিপিকে ছেড়ে দেওয়া আসনে দাঁড়িপাল্লার প্রচারণায় জামায়াত প্রার্থী

চট্টগ্রাম নগরের পাঁচটি ওয়ার্ড ও বোয়ালখালী উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম–৮ আসন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য-সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মো. জুবাইরুল হাসান আরিফের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তবে আসনটি শরিক দল এনসিপিকে ছেড়ে দেওয়ার পরও একই আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. আবু নাছের নিজ প্রতীক নিয়ে প্রচারণায় নামায় ১১–দলীয় ঐক্যের প্রকৃত প্রার্থী আসলে কে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

জামায়াত ও এনসিপির স্থানীয় নেতা–কর্মীরা জানান, চট্টগ্রাম–৮ আসনে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে এনসিপির মো. জুবাইরুল হাসান আরিফকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান দলটির বোয়ালখালী উপজেলা শাখার নায়েবে আমির মো. আবু নাছের। তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় নিয়ম অনুযায়ী দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা বরাদ্দ পান। গত বুধবার থেকে তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রচারণায় নেমেছেন।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলে আইনগতভাবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকে না। ফলে এই আসনে এনসিপির শাপলা কলি প্রতীকের পাশাপাশি জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকও থাকছে। যদিও চট্টগ্রাম–৮ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক না রাখতে ২৩ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তবে নির্বাচন কমিশন সেই আবেদন গ্রহণ করেনি।

দুই দলের স্থানীয় নেতা–কর্মীরা জানান, তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই জামায়াতের প্রার্থী ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। প্রতীক বরাদ্দের পর শরিক দলের প্রার্থীর সমর্থনে তিনি আর মাঠে ছিলেন না। বিপরীতে এনসিপির প্রার্থী প্রচারণা শুরুর দিন থেকেই মাঠে রয়েছেন। এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারাও বোয়ালখালীতে এসে প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। তবে গত বুধবার থেকে জামায়াতের প্রার্থী আবার প্রচারণা শুরু করায় ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

সরে গিয়ে আবার প্রচারণায়

তফসিল অনুযায়ী, গত ২১ জানুয়ারি ছিল মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় নিয়ম অনুযায়ী মো. আবু নাছের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বরাদ্দ পান। তাঁর প্রতিনিধি ওই দিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রতীক গ্রহণ করেন। তবে দুই ঘণ্টা পর এনসিপির প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে জামায়াতের প্রার্থী সরে দাঁড়িয়েছেন বলে জানান নগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী।

এই ঘোষণার পর কিছুদিন মাঠে দেখা যায়নি আবু নাছের কিংবা তাঁর দলীয় নেতা–কর্মীদের। তবে তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে বিভিন্ন পোস্ট দেখা যায়। গত ৩১ জানুয়ারি তাঁর পক্ষে বোয়ালখালীতে মিছিল করেন মহিলা জামায়াতের নেতা–কর্মীরা। এরপর গত বুধবার থেকে আবার নিজেই প্রচারণায় নামেন আবু নাছের। নগরের চান্দগাঁও এলাকায় নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধন করেন তিনি। পাশাপাশি নগর ও উপজেলার বিভিন্ন সড়কে তাঁর ব্যানার–বিলবোর্ডও দেখা গেছে।

চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ ওয়ার্ডের মোহাম্মদ নগর এলাকায় জনসংযোগ করেছেন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য-সমর্থিত প্রার্থী এনসিপির মো. জুবাইরুল হাসান আরিফ। গতকাল দুপুরে

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বুধবার চান্দগাঁও হাজিরপুল এলাকায় নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধন করেন আবু নাছের। গতকাল বৃহস্পতিবার নগরের কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকা ও বোয়ালখালী উপজেলার মসজিদ প্রাঙ্গণে নির্বাচনী ক্যারাভ্যান উদ্বোধন করেন তিনি। গত দুই দিনে নগরের তিনটি ওয়ার্ড ও বোয়ালখালী উপজেলার কয়েকটি এলাকায় তিনি গণসংযোগ করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. আবু নাছের প্রথম আলোকে বলেন, ‘শরিক দলের প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি সরে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু স্থানীয় ভোটার ও নেতা–কর্মীরা আমাকে নির্বাচনে থাকতে জোর করেছেন। তাঁদের ধারণা, আমি মাঠে থাকলে ১১–দলীয় ঐক্যের লক্ষ্য পূরণ সহজ হবে। তাঁদের অনুরোধেই আবার প্রচারণায় নেমেছি।’

জামায়াতের সমর্থন এনসিপিকেই

জামায়াতের কেন্দ্রীয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে চট্টগ্রাম–৫ (হাটহাজারী), চট্টগ্রাম–৮ (চান্দগাঁও–বোয়ালখালী), চট্টগ্রাম–১২ (পটিয়া) ও চট্টগ্রাম–১৪ (চন্দনাইশ) আসন শরিক দলগুলোর জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম–১২ আসনে এলডিপির প্রার্থী সরে যাওয়ায় সেখানে জামায়াতের প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। চট্টগ্রাম–৫ ও চট্টগ্রাম–১৪ আসনে শরিক দলের প্রার্থীরা নিয়মিত প্রচারণা চালাচ্ছেন। দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে কেবল চট্টগ্রাম–৮ আসন ঘিরে।

২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম নগরের বন্দর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে নগর জামায়াতের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। জনসভা শেষে নগরের চারটি আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে তাঁদের হাতে প্রতীক তুলে দেন তিনি। ওই দিন এনসিপির প্রার্থী জুবাইরুল হাসান আরিফের হাতে শাপলা কলি প্রতীক তুলে দেন জামায়াতের আমির।

এনসিপির প্রার্থীকে প্রতীক তুলে দেওয়ার পরও জামায়াতের প্রার্থী প্রচারণায় নামায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জুবাইরুল হাসান আরিফ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জোটের পক্ষে স্থানীয় পর্যায়ে যে ধরনের সহযোগিতা পাওয়ার কথা, সেটি পাচ্ছি না। উল্টো তিনি (আবু নাছের) নিজে প্রচারণায় নেমেছেন। এতে ভোটারদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি আমরা জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের জানিয়েছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি (মো. আবু নাছের) দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সক্রিয় থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর কিছু সমর্থন থাকতে পারে। তবে সমঝোতা অনুযায়ী আসনটি এনসিপিকে দেওয়া হয়েছে। সেখানে এনসিপির প্রার্থীই নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বিষয়টি আবু নাছেরকেও জানানো হয়েছে।